যুক্তরাষ্ট্রকে ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্র’ বানাতে কেন মরিয়া ট্রাম্প

· Prothom Alo

৫ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্রকে খ্রিষ্টান জাতি হিসেবে ধরে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।

Visit milkshakeslot.online for more information.

ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও ঈশ্বরের অধীনে এক জাতি হিসেবে উৎসর্গ করব।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমেরিকানদের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার সরকার দেয় না, এই অধিকার এসেছে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছ থেকে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, একজন বিশ্বাসী মানুষ কীভাবে ডেমোক্র্যাট পার্টিকে ভোট দিতে পারেন, তা তিনি বুঝতে পারেন না। শীতল যুদ্ধের সময় কমিউনিস্টদের যেমন যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টধর্ম ও গণতন্ত্রের শত্রু হিসেবে দেখানো হতো, আজ সেই জায়গায় ডেমোক্র্যাট ও উদারপন্থীদের দাঁড় করানো হচ্ছে।

হেগসেথ তাঁর বক্তব্য শুরু করেন বাইবেল থেকে মার্কের সুসমাচার থেকে পাঠ করে। তিনি বলেন, নাগরিকদের অধিকার এসেছে এক দয়ালু ও মমতাময় ঈশ্বরের কাছ থেকে, সরকারের কাছ থেকে নয়।

হেগসেথ স্পষ্টভাবে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটি খ্রিষ্টান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এখনো রক্তে আমরা সেই পরিচয় বহন করি। সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ঈশ্বরকে মহিমান্বিত করা।’

ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের অনেকেই এই অনুষ্ঠানকে কার্যত কংগ্রেসের অনুমোদিত এক ধর্মীয় সমাবেশ বলে সমালোচনা করেন। তাঁদের দাবি, সংবিধান প্রণেতারা এমন উদ্যোগে হতাশ হতেন। উদারপন্থী সংগঠনগুলোও ট্রাম্পের বক্তব্যকে খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদ বলে আখ্যা দেয় এবং ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ তোলে।

ট্রাম্প ও হেগসেথ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো এক খ্রিষ্টান ঐতিহ্যই ধরে রেখেছেন, যা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট কখনো পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খ্রিষ্টধর্মের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। ট্রাম্প তাঁর প্রথম নির্বাচনী প্রচারণা থেকেই ভোটারদের কাছে নিজেকে খ্রিষ্টান মূল্যবোধের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি এমনও বলেছেন, তিনি স্বর্গে যেতে পারবেন কি না জানেন না, তবে ধর্মের জন্য তিনি অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি কাজ করেছেন।

যেভাবে একের পর এক পরাজয় আড়াল করছেন ট্রাম্প

ট্রাম্প বারবার দেশের মূলমন্ত্র ‘ইন গড উই ট্রাস্ট’ বা ‘ঈশ্বরেই আমাদের বিশ্বাস’-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই স্লোগান এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ধর্মের অংশ। গৃহযুদ্ধের সময় আব্রাহাম লিংকনের প্রশাসনে মুদ্রায় ইন গড উই ট্রাস্ট লেখার প্রস্তাব ওঠে। ১৮৬৪ সালে এটি চালু হয়। তখন রাজনীতির সব পক্ষই বিশ্বাস করত ঈশ্বর তাদের পক্ষেই আছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শীতল যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উসকানি ব্যবহার করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্যের শপথবাক্যে ‘আন্ডার গড’ বা ঈশ্বরের অধীনে শব্দ দুটি ১৯৫৪ সালে যোগ করা হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার কংগ্রেসে পাস হওয়া যৌথ প্রস্তাবে স্বাক্ষর করে এই পরিবর্তন কার্যকর করেন। এর আগে শপথবাক্যটি ছিল:

‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার প্রতি এবং যে প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছি, যা একটি অবিভাজ্য জাতি, সবার জন্য স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।’

১৯৫৪ সালের সংশোধনের পর বাক্যটি হয়: ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার প্রতি এবং যে প্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছি, যা ঈশ্বরের অধীনে এক অবিভাজ্য জাতি, সবার জন্য স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।’

এই পরিবর্তনটি শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল। তখন সোভিয়েত ইউনিয়নকে নাস্তিক কমিউনিস্ট শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হতো। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে ধর্মবিশ্বাসী জাতি হিসেবে আলাদা করে দেখাতে চেয়েছিল।

ফলে ‘আন্ডার গড’ বা ‘ঈশ্বরের অধীনে’ সংযোজনটি শুধু ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের ঘোষণাও। ১৯৫৬ সালে কংগ্রেস ইন গড উই ট্রাস্টকে জাতীয় মূলমন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন খুব নম্রভাবে এতে আপত্তি জানিয়েছিল। ২০১১ সালেও কংগ্রেস আবারও এই মূলমন্ত্রের পুনঃসমর্থন জানায়। আইসেনহাওয়ার প্রশাসন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এর ফলে ১৯৪০ সালে যেখানে ৪৯ শতাংশ আমেরিকান নিজেকে ধর্মে বিশ্বাসী বলতেন, ১৯৬০ সালে তা বেড়ে হয় ৬৯ শতাংশ।

ট্রাম্প দাবি করেন, ২০২৫ সালে গত ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাইবেল বিক্রি হয়েছে। অনেক গির্জায় উপস্থিতি বেড়েছে। তিনি ২০২৬ সালের ১৭ মে ন্যাশনাল মলে জাতীয় প্রার্থনার আহ্বান জানান। ট্রাম্পের খ্রিষ্টান পরিচয়ের জোরালো ঘোষণায় বিভিন্ন আন্তধর্মীয় সংগঠন আপত্তি জানায়। তিনি গত বছর বিচার বিভাগে রিলিজিয়াস লিবার্টি কমিশন গঠন করেন। বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন অভিযোগ তোলে যে এই কমিশন খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদকে উৎসাহ দিচ্ছে।

ট্রাম্প যেভাবে আমেরিকাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন

ওই কমিশনের সহসভাপতি জেডি ভ্যান্স দাবি করেন, ধর্মীয় সহনশীলতাও খ্রিষ্টান ধারণা। অন্যদিকে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় ইহুদি ভোটারদের নিয়ে মন্তব্যও বিতর্ক সৃষ্টি করে।

হেগসেথ নিজেকে আরও প্রকাশ্যভাবে খ্রিষ্টান হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর শরীরে ক্রুসেডের প্রতীকী ট্যাটু রয়েছে। তিনি ট্রাম্পকে ক্রুসেডার ইন চিফ বলেছেন। তবে এটি নতুন কিছু নয়। বাইডেন প্রশাসনও খ্রিষ্টান জায়নবাদে সমর্থন দিয়েছে।

হেগসেথের নিয়োগে মুসলিম সংগঠনগুলো আপত্তি জানালেও ইসরায়েলপন্থী ইহুদি গোষ্ঠীগুলো তাকে সমর্থন করে। ইতিহাসে ক্রুসেডের সময় মুসলিম, ইহুদি ও অর্থোডক্স খ্রিষ্টান সবাই হামলার শিকার হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টান প্রজাতন্ত্রের ধারণা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। বড়দিন উপলক্ষে ট্রাম্প নাইজেরিয়ায় বোমা হামলা করেছেন। একদিকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার কথা বলেন, অথচ যুদ্ধবিরতির পরও শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা তার অনুভূতি স্পর্শ করে না। এসব মৃত্যু যেন যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টান ঈশ্বরের বেদিতে উৎসর্গ করা বিষয়।

  • জোসেফ মাসাদ নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অধ্যাপক।
    মিডিল ইস্ট মিরর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

Read full story at source