গণিতের রাজপুত্র কার্ল ফ্রেডরিখ গাউস এবং তাঁর রাজকীয় সংখ্যার জগৎ
· Prothom Alo

১৮৫৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। জার্মানির গ্যোটিঙ্গেন শহরে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন এক বৃদ্ধ। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। এই দীর্ঘ জীবনে তিনি মানবজাতিকে দিয়ে গেছেন এমন সব গাণিতিক জ্ঞান, যা আজও আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দুনিয়াকে পথ দেখাচ্ছে। গবেষকেরা ভালোবেসে তাঁকে ডাকেন প্রিন্স অব ম্যাথমেটিশিয়ানস—গণিতের রাজপুত্র। নাম তাঁর কার্ল ফ্রেডরিখ গাউস। আজ এই প্রতিভাবান গণিতবিদের প্রয়াণ দিবস। চলুন, ফিরে তাকাই তাঁর সেই অবিশ্বাস্য জীবনের দিকে।
১৭৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল জার্মানির ব্রাউনশোয়াইগ শহরের এক হতদরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারে গাউসের জন্ম। তাঁর প্রতিভা নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। বলা হয়, মাত্র তিন বছর বয়সেই তিনি নাকি তাঁর বাবার হিসাবের খাতায় চোখ বুলিয়ে ভুল ধরেছিলেন!
Visit livefromquarantine.club for more information.
তবে সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পটি তাঁর আট বছর বয়সের। প্রাইমারি স্কুলে একদিন শিক্ষক ভাবলেন, ক্লাসের ছেলেদের এমন একটা কাজ দেবেন, যাতে তারা দীর্ঘক্ষণ ব্যস্ত থাকে। ততক্ষণে যাতে তিনি নিজের দাপ্তরিক কাজ সেরে নিতে পারেন। তাই তিনি ছেলেদের বললেন, ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত সবগুলো সংখ্যা যোগ করতে।
কার্ল ফ্রেডরিক গাউসের জন্মস্থান জার্মানির ব্রাউনশোয়াইগ শহরওই শিক্ষক আশা করেছিলেন, এই বিশাল যোগফল বের করতে তাদের অন্তত ঘণ্টাখানেক লাগবে। কিন্তু নির্দেশ দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছোট্ট গাউস তাঁর স্লেট জমা দিয়ে দিলেন! শিক্ষক পাত্তাই দিলেন না। তিনি চাইলেন বাকিরা কাজ শেষ করুক। আধা ঘণ্টা পর যখন সবাই স্লেট জমা দিলে দেখা গেল, পুরো ক্লাসে শুধু গাউসের উত্তরটিই সঠিক!
কিন্তু গাউস তো এক মিনিটের মধ্যেই স্লেট জমা দিয়েছিলেন। কীভাবে এত দ্রুত যোগ করলেন তিনি?
আসলে গাউস গতানুগতিকভাবে ১ + ২ + ৩ + ৪... এভাবে যোগ করেননি। তিনি খেয়াল করলেন, প্রথম ও শেষ সংখ্যা যোগ করলে হয় ১০১। অর্থাৎ, ১ + ১০০ = ১০১। একইভাবে দ্বিতীয় ও শেষ দিক থেকে দ্বিতীয় সংখ্যা যোগ করলেও একই হয়। অর্থাৎ, ২ + ৯৯ = ১০১। এভাবে প্যাটার্ন মিলিয়ে তিনি দেখলেন, এখানে ঠিক ৫০ জোড়া ১০১ পাওয়া যায়। তাই তিনি শুধু ৫০-কে ১০১ দিয়ে গুণ করে দিলেন। সমাধান পেলেন ৫০ × ১০১ = ৫০৫০। চমৎকার এই গল্পটি আজও ক্লাসরুমে সমান্তর ধারার যোগফল শেখানোর সময় শিক্ষকরা বলেন।
তরমুজ বিক্রির ২৫০ টাকা গেল কোথায়১৭৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল জার্মানির ব্রাউনশোয়াইগ শহরের এক হতদরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারে গাউসের জন্ম। তিনি নাকি মাত্র তিন বছর বয়সেই তাঁর বাবার হিসাবের খাতায় চোখ বুলিয়ে ভুল ধরেছিলেন!
দুই
১৭৯১ সাল। গাউসের বয়স তখন ১৪। ব্রাউনশোয়াইগের ডিউক কার্ল ভিলহেল্ম ফার্ডিনান্ড এই অসামান্য প্রতিভার খোঁজ পান। তিনি নিজ খরচে গাউসকে বর্তমানের ব্রাউনশোয়াইগ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে পড়ার সুযোগ করে দেন। সেখান থেকে পাস করার পর ডিউকের খরচেই গাউস ভর্তি হন জার্মানির গ্যোটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৭৯৫ থেকে ১৭৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে পড়েন। সেবার তিনি কোনো ডিগ্রি ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়েন, কিন্তু এই সময়েই তিনি লিখে ফেলেন তাঁর মাস্টারপিসটি! বইটির নাম ডিসকুইজিশনস অ্যারিথমেটিকা।
বইটি মূলত সংখ্যাতত্ত্বের ওপর লেখা এক অমর কীর্তি। ১৭৯৮ সালে লেখা শেষ হলেও প্রকাশকের ঝামেলার কারণে এটি ১৮০১ সালে প্রকাশিত হয়। বইটিতে মোট ৭টি খণ্ড আছে। প্রথম তিন খণ্ডে আলোচনা করেছেন আধুনিক মডুলার অ্যারিথমেটিক১। চতুর্থ খণ্ডে আছে কোয়াড্রেটিক রেসিডিউ২। এই অধ্যায়ের সমাধান দেখেই সেকালের বাঘা বাঘা গণিতবিদেরা চমকে গিয়েছিলেন।
কার্ল ফ্রেডরিখ গাউসের লেখা ডিসকুইজিশনস অ্যারিথমেটিকা বইয়ের প্রথম সংস্করণের শিরোনাম পৃষ্ঠাতবে বইটির সবচেয়ে বড় চমক ছিল সপ্তম খণ্ডে। এখানে তিনি পাটিগণিত, বীজগণিত ও জ্যামিতিকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। xn = 1 সমীকরণের ওপর ভিত্তি করে তিনি দেখান, কীভাবে শুধু স্কেল ও কম্পাস ব্যবহার করে সুষম বহুভুজ আঁকা যায়। প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদদের পর জ্যামিতির জগতে এটি ছিল সবচেয়ে বড় অগ্রগতি। গাউস প্রমাণ করেছিলেন, রুলার ও কম্পাস দিয়ে ১৭ বাহুবিশিষ্ট একটি সুষম বহুভুজ আঁকা সম্ভব! গাউস তাঁর এই আবিষ্কার নিয়ে এতই গর্বিত ছিলেন যে, তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সমাধিতে যেন এই ১৭ বাহুর বহুভুজটি খোদাই করা থাকে। কিন্তু মিস্ত্রি তাতে রাজি হননি। কারণ ১৭ বাহুর বহুভুজ দেখতে প্রায় বৃত্তের মতোই মনে হতো।
এখন আমরা জানি, একটি n বাহুর সুষম বহুভুজ রুলার ও কম্পাস দিয়ে কেবল তখনই আঁকা সম্ভব যখন n নিচের সংখ্যাগুলোর কোনো একটি হয়। অর্থাৎ ৩, ৪, ৫, ৬, ৮, ১০, ১২, ১৫, ১৬, ১৭, ২০, ২৪, ৩০, ৩২, ৩৪, ৪০... ইত্যাদি। এর গাণিতিক শর্ত হলো, n = 2kp1p2…pt, যেখানে p হলো আলাদা আলাদা ফার্মা প্রাইম৩। এখন পর্যন্ত জানা পাঁচটি ফার্মা প্রাইম হলো ৩, ৫, ১৭, ২৫৭ এবং ৬৫৫৩৭।
গড়ের গোলকধাঁধা: লটারি, কয়েন ও মহাকাশে হারিয়ে যাওয়া১৭৯৮ সালে লেখা শেষ হলেও প্রকাশকের ঝামেলার কারণে ডিসকুইজিশনস অ্যারিথমেটিকা বইটি ১৮০১ সালে প্রকাশিত হয়। বইটিতে মোট ৭টি খণ্ড আছে।
তিন
গ্যোটিঙ্গেনে ফিরে ১৭৯৯ সালে গাউস তাঁর প্রথম ডিগ্রি পান। পরে ডিউকের অনুরোধে হেলমস্টেড বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট থিসিস জমা দিয়ে পিএইচডি লাভ করেন। এরপর গ্যোটিঙ্গেনে একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করার জন্য তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে মন দেন। ১৮০৫ সালের ৯ অক্টোবর জোহানা অস্টহফকে বিয়ে করেন গাউস। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে হয়। কিন্তু ১৮০৯ সালে জোহানা মারা যান এবং এর পরপরই তাদের দ্বিতীয় সন্তানটিও মারা যায়। পরের বছর গাউস মিন্না ওয়ালডেককে বিয়ে করেন। এই সংসারে তিন সন্তান হয়। দুঃখজনকভাবে, ১৮৩১ সালে মিন্নাও মারা যান।
১৮০৭ সালে গাউস মানমন্দিরের ডিরেক্টর হিসেবে গ্যোটিঙ্গেনে আসেন। পরের বছর তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। স্ত্রী ও বাবার মৃত্যুতে তিনি মারাত্মক বিষণ্ণতায় ভুগেছিলেন। কিন্তু তাঁর গবেষণা থামেনি। ১৮০৯ সালে তিনি মহাজাগতিক বস্তুর গতিবিধির ওপর দুই খণ্ডের একটি বিশাল বই প্রকাশ করেন। সেই বইয়ে ডিফারেনশিয়াল ইকুয়েশন, কনিক সেকশন এবং গ্রহের কক্ষপথ নির্ণয়ের কথা ছিল।
১৮১৬ সালের গ্যোটিঙ্গেনে নতুন মানমন্দিরঠিক এই সময়ের একটি দারুণ ঘটনা হলো সেরেস গ্রহাণুর অবস্থান নির্ণয়। ১৮০১ সালে ইতালীয় জ্যোতির্বিদ পিয়াজ্জি বামন গ্রহ সেরেস আবিষ্কার করে তা আবার হারিয়ে ফেলেন। বিজ্ঞানীরা যখন এর অবস্থান বের করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন গাউস তাঁর নিজস্ব গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে সেরেসের অবস্থান বলে দেন। ঠিক সেই জায়গায় পরে সেরেস গ্রহাণুটি খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা!
১৮১৮ সালে হ্যানোভার রাজ্যের ভূমি জরিপের দায়িত্ব পান তিনি। এই কাজে তাঁর অবিশ্বাস্য গাণিতিক দক্ষতা দারুণ কাজে দিয়েছিল।
তোমার অর্ধেক আমার অর্ধেকের চেয়ে বড়!১৮০৭ সালে গাউস মানমন্দিরের ডিরেক্টর হিসেবে গ্যোটিঙ্গেনে আসেন। পরের বছর তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। স্ত্রী ও বাবার মৃত্যুতে তিনি মারাত্মক বিষণ্ণতায় ভুগেছিলেন। কিন্তু তাঁর গবেষণা থামেনি।
চার
ডিসকুইজিশনস অ্যারিথমেটিকা বইয়ে প্রকাশিত আরেকটি অসামান্য আবিষ্কার হলো গাউসের ইউরেকা থিওরেম। তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন ‘EYPHKA! num = △ + △ + △)’। অর্থাৎ, যেকোনো ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যাকে সর্বোচ্চ তিনটি ত্রিভুজ সংখ্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা যায়। ত্রিভুজ সংখ্যাগুলো হলো ০, ১, ৩, ৬, ১০, ১৫...যাদেরকে n(n+1)/2 আকারে প্রকাশ করা যায়। যেমন, ১৮ = ১৫ + ৩, অথবা ২৮ = ১৫ + ১০ + ৩।
বীজগণিতের মৌলিক উপপাদ্যটিও তাঁর প্রমাণ করা। সহজ কথায়, এক চলকবিশিষ্ট যেকোনো বীজগণিতীয় সমীকরণের অন্তত একটি মূল বা সমাধান থাকবেই। এই মূলগুলো বাস্তব বা জটিল সংখ্যা হতে পারে। গাউস জটিল সংখ্যাকে a + bi আকারে প্রকাশ করেন। এখানে i = √-1। তিনিই প্রথম কার্তেসীয় সমতলে বিন্দু হিসেবে জটিল সংখ্যার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেন।
১৮১৬ সালে প্যারিস একাডেমি ফার্মার লাস্ট থিওরেম প্রমাণের জন্য বড় অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করে। অনেকেই গাউসকে এতে অংশ নিতে বলেন। কিন্তু গাউস তাঁর এক বন্ধুকে চিঠিতে লেখেন, ‘একটি বিচ্ছিন্ন উপপাদ্য হিসেবে ফার্মার লাস্ট থিওরেম নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। কারণ আমি নিজেই এমন হাজারটা উপপাদ্য বানিয়ে দিতে পারি, যা কেউ প্রমাণ করতেও পারবে না, আবার ভুলও বলতে পারবে না!’
উল্লেখ্য, ফার্মার শেষ উপপাদ্য হলো an + bn = cn-এ n-এর মান ২ এর চেয়ে বড় হলে তা সিদ্ধ হয় না। এটাই ফার্মার লাস্ট থিওরেম। ৩৫৮ বছর পর ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যান্ড্রু ওয়াইলস এটি প্রমাণ করেন।
সুডোকুর ভেতরে লুকিয়ে আছে যে জাদুকরী প্যাটার্নএক চলকবিশিষ্ট যেকোনো বীজগণিতীয় সমীকরণের অন্তত একটি মূল বা সমাধান থাকবেই। এই মূলগুলো বাস্তব বা জটিল সংখ্যা হতে পারে। গাউস জটিল সংখ্যাকে a + bi আকারে প্রকাশ করেন।
১৮৩২ সালে গাউস সেকালের অন্যতম সেরা পদার্থবিদ ভিলহেল্ম ওয়েবারের সঙ্গে জুটি বাঁধেন। ১৮৩৩ সালে তাঁরা পৃথিবীর প্রথম তড়িৎচুম্বকীয় টেলিগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এটি গাউসের মানমন্দির থেকে গ্যোটিঙ্গেনের পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট পর্যন্ত যুক্ত ছিল। প্রুশিয়ান বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফন হুমবোল্টের উৎসাহে তাঁরা পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র মাপার কাজ শুরু করেন। গাউস হুমবোল্টের পদ্ধতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন, যা হুমবোল্টের পছন্দ না হলেও গাউসের পদ্ধতিটিই ছিল অনেক বেশি কার্যকর ও নিখুঁত।
গাউস ও পদার্থবিদ ভিলহেল্ম ওয়েবারের আবিষ্কৃত প্রথম তড়িৎচুম্বকীয় টেলিগ্রাফ যন্ত্রগাউস পড়াতে একদমই পছন্দ করতেন না। তবে মাঝেমধ্যে বিশেষ লেকচার দিতেন। যেমন ১৮৩১ সালের ২৮ অক্টোবর শুরু হওয়া এক লেকচার সিরিজে তিনি ফলিত গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে সম্ভাব্যতা তত্ত্বের ব্যবহার শিখিয়েছিলেন। বিজ্ঞান ও গণিতের যোগাযোগের জন্য ল্যাটিন ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ভাষা।
গণিতের নিয়ম ভেঙে আবিষ্কৃত হলো ইনফিনিটির দুটি নতুন রূপগাউস হুমবোল্টের পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র মাপার পদ্ধতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন, যা হুমবোল্টের পছন্দ না হলেও গাউসের পদ্ধতিটিই ছিল অনেক বেশি কার্যকর ও নিখুঁত।
রাজনৈতিক কারণে ১৮৩৭ সালে ওয়েবার গ্যোটিঙ্গেন ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর গাউসের গবেষণার পরিমাণ কিছুটা কমে এলেও তিনি সবসময় অন্য বিজ্ঞানীদের সাহায্য করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। গাউস অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতি নিয়েও অনেক কাজ করেছিলেন, কিন্তু মানুষের সমালোচনার ভয়ে তা কখনো প্রকাশ করেননি। মজার ব্যাপার হলো, মৃত্যুর পর তাঁর মস্তিষ্ক সংরক্ষণ করা হয়েছিল, যা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা পরে বিস্তর গবেষণা করেছেন।
১৮৫৫ সালে মৃত্যুশয্যায় কার্ল ফ্রেডরিক গাউস১৮৫৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গ্যোটিঙ্গেনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। তাঁকে গ্যোটিঙ্গেনের আলবানি গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। তাঁর রেখে যাওয়া সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তিটি দিয়েই শেষ করা যাক এই মহান গাণিতিক জাদুকরের গল্প: ‘গণিত হলো সমস্ত বিজ্ঞানের রানি, আর পাটিগণিত হলো গণিতের রানি।’
সূত্র: ম্যাথ মেকারস: দ্য লাইভস অ্যান্ড ওয়ার্কস অব ফিফটি ফেমাস ম্যাথেমেটিশিয়ান অবলম্বনেযুক্তি দিয়ে মুক্তি দিন ৪ বন্দিকেটীকা
১. মডুলার অ্যারিথমেটিকে সংখ্যাগুলো একটি নির্দিষ্ট সীমার পর আবার প্রথম থেকে শুরু হয়। যেমন ঘড়ির কাটা। ১২টার পর ১৩টা না হয়ে আবার ১টা হয়। বিষয়টা বুঝতে হলে মডুলাস ও অ্যারিথমেটিকা শব্দ দুটি আলাদাভাবে বুঝতে হবে। মডুলাস মানে যে সংখ্যাটি দিয়ে ভাগ করা হয়। কোনো সংখ্যাকে ভাগ করার পর যে ভাগশেষ থাকে, সেটিই হলো মডুলার অ্যারিথমেটিকের উত্তর। একটি ঘড়িতে মডুলাস হলো ১২। এখন যদি ঘড়িতে ৯টা বাজে এবং আপনি ৪ ঘণ্টা যোগ করেন, তবে উত্তর হবে ১। কিন্তু ৯ ও ৪ যোগ করলে ১৩ হওয়ার কথা। ১৩-কে ১২ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ থাকে ১। ঘড়ির কাটায় এটাই দেখা যায়। গাণিতিক ভাষায় একে প্রকাশ করা হয় এভাবে: ১৩ = ১ (মড ১২)। ইন্টারনেটে পাসওয়ার্ড বা তথ্যের সুরক্ষায় এটি অপরিহার্য। প্রোগ্রামিং এবং ডেটা স্ট্রাকচারেও এটি ব্যবহৃত হয়।
২. গাউসের ঘড়ির কাটার ভাগশেষের আরেক ধাপ ওপরে ধারণা হলো কোয়াড্রেটিক রেসিডিউ। কোয়াড্রেটিক মানে বর্গ এবং রেসিডিউ মানে ভাগশেষ। অর্থাৎ কোয়াড্রেটিক রেসিডিউ মানে বর্গসংখ্যার ভাগশেষ! বিষয়টা সহজে বোঝার জন্য একটা মৌলিক সংখ্যা ধরলাম ৭। এবার আমরা ১ থেকে ৬ পর্যন্ত সংখ্যাগুলোকে বর্গ করব এবং সেই ফলকে ৭ দিয়ে ভাগ করে দেখব ভাগশেষ কত থাকে। ১ এর বর্গ = ১। একে ৭ দিয়ে ভাগ করা যায় না, তাই ভাগশেষ ১। ২ এর বর্গ ৪। একে ৭ দিয়ে ভাগ করা যায় না, তাই ভাগশেষ ৪। ৩ এর বর্গ ৯। ৯-কে ৭ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ থাকে ২। আবার ৪ এর বর্গ ১৬ এবং একে ৭ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ থাকে ২। ৫-এর বর্গ ২৫-কে ৭ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ থাকে ৪। একইভাবে ৩৬ কে ৭ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ থাকে ১। খেয়াল করে দেখুন, আমরা যখন ৭ দিয়ে ভাগ করলাম, তখন ভাগশেষ হিসেবে মাত্র তিনটি সংখ্যা ঘুরেফিরে এল—১, ২ এবং ৪। ৭ এর চেয়ে ছোট বাকি সংখ্যাগুলো, অর্থাৎ ৩, ৫ ও ৬ কখনোই ভাগশেষ হিসেবে এল না! গণিতের ভাষায় এই ১, ২ এবং ৪-কে বলা হয় ৭ এর কোয়াড্রেটিক রেসিডিউ। আর যে সংখ্যাগুলো একবারও ভাগশেষ হিসেবে আসেনি, সেগুলোকে বলা হয় নন-রেসিডিউ। এই ভাগশেষ বের করে লাভ কী?
৩. ফার্মা প্রাইম হলো মৌলিক সংখ্যার এক বিশেষ পরিবার। সপ্তদশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ পিয়েরে দ্য ফার্মা মৌলিক সংখ্যা বের করার জন্য একটি চমৎকার সূত্র তৈরি করেন। সূত্রটি হলো:
এখানে n-এর মান ০, ১, ২, ৩ ইত্যাদি যেকোনো পূর্ণসংখ্যা হতে পারে। এবার সূত্রে মান বসিয়ে দেখি, কী জাদুকরী সংখ্যা বেরিয়ে আসে। n = ০ বসালে, ২১ + ১ = ৩, n = ১ বসালে ২২ + ১ = ৫, n = ২ বসালে ২৪ + ১ = ১৭, n = ৩ বসালে ২৮ + ১ = ২৫৭, n = ৪ বসালে, ২১৬ + ১ = ৬৫৫৩৭। খেয়াল করে দেখুন, ৩, ৫, ১৭, ২৫৭ এবং ৬৫৫৩৭ সংখ্যাগুলো মৌলিক সংখ্যা। ফার্মার সূত্র থেকে পাওয়া এই বিশেষ মৌলিক সংখ্যাগুলোকেই বলা হয় ফার্মা প্রাইম। মজার ব্যাপার হলো, টানা পাঁচটি মৌলিক সংখ্যা পাওয়ার পর ফার্মা ভীষণ রোমাঞ্চিত হয়ে ভেবেছিলেন, এই সূত্রে n-এর মান যাই বসানো হোক না কেন, সব সময় মৌলিক সংখ্যাই বের হবে! কিন্তু প্রায় ১০০ বছর পর আরেক বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ লিওনার্ড অয়লার প্রমাণ করে দেখান, n = 5 বসালে যে বিশাল সংখ্যাটি পাওয়া যায়, তা ৬৪১ দিয়ে বিভাজ্য! সেই সংখ্যাটি হলো ৪,২৯,৪৯,৬৭,২৯৭। অর্থাৎ এটি মৌলিক সংখ্যা নয়। বিস্ময়কর হলেও সত্যি, আজ পর্যন্ত আধুনিক সুপারকম্পিউটার দিয়েও ওই প্রথম পাঁচটি ছাড়া নতুন আর কোনো ফার্মা প্রাইমের খোঁজ পাননি বিজ্ঞানীরা!