একটানা গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে এলাকাবাসীর
· Prothom Alo

‘সাহ্রির খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ করে একের পর এক গুলির শব্দে ভয়ে ঘুম ভেঙে যায়। দুই-তিন মিনিট ধরে চলে একটানা গুলি। তারপর থামে। এরপর আর ঘুম হয়নি।’
Visit forestarrow.help for more information.
মাদ্রাসার ছাত্র দারাজ হোসেনের চোখে-মুখে ভয়। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টায় চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরার যে ভবন লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটেছে, তার পাশেই দারাজদের বাসা। স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের প্রতিবেশী এই ছাত্র গতকাল বিকেলে তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে প্রথম আলোর কাছে। সে বলে, এ ঘটনার পর থেকেই সবার মধ্যে আতঙ্ক আর ভয় কাজ করছে।
ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসভবনের কাছে একটি আবাসিক মাদ্রাসাও রয়েছে। ওই মাদ্রাসার আবাসিক ছাত্র মোহাম্মদ রাফি। অন্য সবার মতো সে–ও সাহ্রির খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। এলাকার অন্য বাসিন্দার মতো তারও ঘুম ভাঙে গুলির শব্দে। গতকাল বিকেলে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে প্রথম আলোকে সে বলে, হঠাৎ করে গুলির শব্দ শুনতে পায় তারা। একটানা ৮ থেকে ১০টি গুলির শব্দ শোনা যায়। মাত্র দুই-থেকে তিন মিনিটের মধ্যে এসব গুলি করা হয়। এরপর আবার সব নীরব। কিন্তু তাদের মনে ভয় ঢুকে গেছে।
এর আগে গত ২ জানুয়ারি মোস্তাফিজুর রহমানের বাসভবন লক্ষ্য করে গুলি করেছিল সন্ত্রাসীরা। গুলিতে বাসার জানালার কাচ ভেঙে গিয়েছিল। বাসার দরজায়ও গুলি লাগে। এর পর থেকে বাসাটি পুলিশের পাহারায় ছিল। পুলিশের পাহারার মধ্যেই ভবনটিতে আবারও গুলির ঘটনায় আশপাশের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মোস্তাফিজুর রহমানের এক ভাই মুজিবুর রহমান ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১০ তলা ভবনের পেছনে চাক্তাই খালের ওপর চলছে সেতুর নির্মাণকাজ। নির্মাণকাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তারক্ষী মোহাম্মদ জসিম বলেন, সন্ত্রাসীরা সকালে প্রাইভেট কার নিয়ে এখানে এসেছিল। তবে গাড়ি দূরে রেখে হেঁটে খালের ওপর বিকল্প সেতু পার হয়ে ভবনটির পেছনে আসে। এসেই গুলি করতে থাকে। এরপর যে পথ দিয়ে এসেছে সে পথ দিয়ে চলে গেছে।
পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, চাঁদার জন্য বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ তাঁর লোকজন দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চারজন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর বাসার কাছে আসেন। তাঁরা পেছনের রাস্তা দিয়ে মোস্তাফিজুর রহমানের বাসার পেছনে আসেন। সীমানাপ্রাচীরের বাইরে অবস্থান নিয়ে ভবন লক্ষ্য করে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে থাকেন। সিসিটিভি বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানায়, চার সন্ত্রাসীর মধ্যে একজনের দুই হাতে দুটি পিস্তল ছিল। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন সাব মেশিনগান (এসএমজি), একজন চায়নিজ রাইফেল এবং অন্যজন শটগান থেকে গুলি ছোড়েন।
এ ঘটনার পর নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন কবির ভূঁইয়ার নেতৃত্বে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশের একটি দল। পরিদর্শন শেষে হোসাইন কবির ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চাঁদার জন্য বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ তাঁর লোকজন দিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। অস্ত্রধারীরা মুখোশ পরে আসায় তাদের সহজে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। তবে সাজ্জাদের সহযোগী সন্ত্রাসী মো. রায়হান ও বোরহান এ ঘটনায় জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে।
সন্ত্রাসীদের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর বাড়ির জানালা। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায়গুলিতে বিচূর্ণ জানালা
চট্টগ্রাম নগরের সিরাজদ্দৌলা সড়ক থেকে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ মিটার ভেতরে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের পারিবারিক বাসা। ১০ তলা ভবনে বসবাস করেন তাঁদের সাত ভাইয়ের পরিবার। ১০ তলা ভবনের সামনের গলির দুই পাশে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভবন রয়েছে। তবে পেছনে কোনো ভবন নেই। ১০ তলা ভবনের পেছনে নির্মাণাধীন সড়ক ও চাক্তাই খাল।
শনিবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের সামনে মূল সড়ক থেকে গলিতে প্রবেশমুখে পুলিশের প্রহরা। দুজন সদস্য ছিলেন দায়িত্বে। ভবনের ভেতরে গিয়ে দেখা যায় দোতলা ও তৃতীয় তলার পেছনের অংশে গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। গুলিতে দোতলা ও তৃতীয় তলার জানালা ভেঙে গেছে। জানালার ভাঙা কাচের টুকরা ঘরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
দোতলার একটি কক্ষে ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা গানম্যানরা থাকেন। গুলিবর্ষণের সময় চার গানম্যানের সবাই কক্ষে ছিলেন। তৃতীয় তলায় মোস্তাফিজুর রহমানের এক ভাইয়ের পরিবারের সদস্যরা থাকেন।
ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি করার পর অস্ত্র হাতে দুই সন্ত্রাসী। গতকাল সকালে চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায়এই ভবনের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আশেক প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসীরা ২-৩ মিনিটের মধ্যে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি গুলি করেছে। চারটি গুলির খোসা ভেতরে ঢুকেছে। এগুলো পুলিশ নিয়ে গেছে। বাকিগুলো বাইরের নালায় পড়েছে।
১০ তলা ভবনের পেছনে চাক্তাই খালের ওপর চলছে সেতুর নির্মাণকাজ। নির্মাণকাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তারক্ষী মোহাম্মদ জসিম বলেন, সন্ত্রাসীরা সকালে প্রাইভেট কার নিয়ে এখানে এসেছিল। তবে গাড়ি দূরে রেখে হেঁটে খালের ওপর বিকল্প সেতু পার হয়ে ভবনটির পেছনে আসে। এসেই গুলি করতে থাকে। এরপর যে পথ দিয়ে এসেছে, সে পথ দিয়ে চলে গেছে। সন্ত্রাসীরা যখন এসেছিল, তখন এলাকার প্রায় সবাই ঘুমে ছিলেন। কিন্তু গুলির শব্দে মানুষের ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু ভয়ে-আতঙ্কে কেউ ঘর থেকে বের হননি।
কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে পুলিশ পাহারায় থাকা ব্যবসায়ীর বাসায় মুহুর্মুহু গুলি