সন্ত্রাসীদের দলে প্রশিক্ষিত শুটার, দুশ্চিন্তায় পুলিশ

· Prothom Alo

শত মানুষের ভিড়ে নির্দিষ্ট কাউকে গুলি চালিয়ে হত্যা, পুলিশ পাহারায় থাকা বাসায় গুলি, চলন্ত গাড়িতে যাত্রীকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ—এমন নানা ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে চট্টগ্রামে। এসব ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে এসএমজিসহ (সাবমেশিনগান) অত্যাধুনিক নানা অস্ত্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, সন্ত্রাসী দলের কিছু প্রশিক্ষিত শুটার এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে চলছে।

Visit likesport.biz for more information.

চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উঠে এসেছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নাম। পুলিশের দাবি, কেবল সাজ্জাদের দলেই রয়েছে অন্তত ৫০ জন প্রশিক্ষিত শুটার। এর বাইরেও চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও রাউজানের বিভিন্ন ঘটনায় প্রশিক্ষিত শুটারদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেখা গেছে। তবে নগর ও জেলার সন্ত্রাসী দলগুলোয় কী পরিমাণ প্রশিক্ষিত শুটার রয়েছে, তা পুলিশ নিশ্চিত হতে পারেনি। প্রশিক্ষিত শুটারদের হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকা এবং তাদের ধরতে না পারার বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পুলিশ।

চট্টগ্রামের রাউজানের বিএনপি কর্মী আব্দুল হাকিমকে গাড়িতে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর গাড়িতে ২২টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এই ঘটনা ঘটে। গত বছরের অক্টোবরে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মদুনাঘাট এলাকায়

গত শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় পুলিশ পাহারায় থাকা এক ব্যবসায়ীর বাসায় গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসী দলের চার সদস্য। সিসিটিভি ফুটেজে, সন্ত্রাসীদের একজনকে দুই হাতে দুটি পিস্তল থেকে গুলি করতে দেখা যায়। বাকি তিনজনের মধ্যে একজনের হাতে একটি এসএমজি, একজনের কাছে চায়নিজ রাইফেল ও আরেকজনের কাছে শটগান ছিল। অস্ত্র চালানোর ধরন দেখে পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে, ওই চার সন্ত্রাসীই প্রশিক্ষিত শুটার। কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে সন্ত্রাসীরা গুলি ছুড়েছে বলে দাবি ওই ব্যবসায়ীর।

সাজ্জাদ আলীবিদেশে ব্যবসা করি, দেশে ভাড়া ঘর থেকেও আয় আছে। আমাদের পরিবার বিত্তশালী। আমি কেন বাহিনী তৈরি করব? উল্টো আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।

এর আগে গত নভেম্বরে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি–মনোনীত প্রার্থীর জনসংযোগে গুলি করে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা নামের একজনকে খুন করা হয়। নিহত সরোয়ারের বিরুদ্ধে হত্যা-চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৫টি মামলা ছিল। জনসংযোগে থাকা নেতা-কর্মীদের ভিড়ের মধ্যে খুব কাছ থেকে গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় প্রশিক্ষিত কোনো শুটার জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তবে বাঁহাতি সেই শুটার কে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানের পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়াহাট বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আবদুল মজিদ (৫০) নামের এক যুবদল কর্মীকে। মুখোশ পরা একদল অস্ত্রধারী যুবক মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত সরে পড়ে। ঘটনাস্থলটি পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে। একই কায়দায় সম্প্রতি রাউজানে আরও অন্তত চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় গত শনিবার সকালে গুলি ছোড়ে সন্ত্রাসীরা। এতে তাঁর ভবনের দুই ও তিন তলার বেশ কিছু জানালার কাচ ভেঙে যায়। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৪টায় চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায়

গত বছরের অক্টোবরে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মদুনাঘাট এলাকায় চলন্ত প্রাইভেট কারে থাকা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম নামের এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। তাঁর গাড়িতে ২২টি গুলির চিহ্ন পায় পুলিশ। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রাইভেট কারে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়ছে হেলমেট পরা একজন। একই বছরের ২৯ মার্চ বাকলিয়া এক্সেস রোডে গুলি করে দুজনকে হত্যা করা হয়।

বিদেশে বড় সাজ্জাদ এবং দেশে রায়হান ও মোবারকের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁদের দলের শুটাররা খুনসহ সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে বা কারও সঙ্গে বিরোধে জড়ালেই মূলত এসব শুটারকে ব্যবহার করা হয়।

গত বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডারত অবস্থায় ঢাকাইয়া আকবর নামের এক ‘সন্ত্রাসীকে’ গুলি করে হত্যা করা হয়। ২২ এপ্রিল রাউজানের গাজীপাড়ায় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী ইব্রাহিমকে। ২৯ আগস্ট অক্সিজেন-পশ্চিম কুয়াইশে মো. মাসুদ ও মো. আনিছকে খুন করা হয়েছে। এর এক মাস পর চান্দগাঁওয়ে চায়ের দোকানে বসে ইট-বালু ব্যবসায়ী তাহসীনকে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা ঘটে। প্রতিটি ঘটনাতেই প্রশিক্ষিত শুটারের অংশগ্রহণ রয়েছে বলে দাবি পুলিশের।

যেসব শুটারের নাম জানা গেল

সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে দেশে দীর্ঘদিন তাঁর সন্ত্রাসী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। গত বছরের ১৫ মার্চ কারাগারে যাওয়ার পর দলের নেতৃত্ব আসেন ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমন। চট্টগ্রাম নগরে সম্প্রতি অনেক খুন, হুমকি ও চাঁদাবাজির ঘটনায় দুজনের নাম এসেছে। তবে পুলিশ তাঁদের ধরতে পারছে না।

পুলিশ জানায়, বিদেশে বড় সাজ্জাদ এবং দেশে রায়হান ও মোবারকের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁদের দলের শুটাররা খুনসহ সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে বা কারও সঙ্গে বিরোধে জড়ালেই মূলত এসব শুটারকে ব্যবহার করা হয়। আগে রায়হান ও মোবারকও সরাসরি মাঠে গিয়ে এ ধরনের ঘটনায় অংশ নিতেন। তবে সম্প্রতি তাঁদের নাম খুব বেশি আলোচনায় আসায় অন্যদের মাঠে পাঠানো হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রায়হান-মোবারক এখন নিজেরা গুলি চালান না। সাজ্জাদের নির্দেশে তাঁরা আলাদা জায়গায় বসে পরিকল্পনা করেন। তাঁরা দলে বর্তমানে ‘এ’ ক্যাটাগরির শুটার হিসেবে পরিচিত। খুন ও বড় হামলার ক্ষেত্রে এখন ‘বি’ ক্যাটাগরির শুটাররা অংশ নেন। এর মধ্যে রয়েছেন কাদের, নাজিম, বোরহান। আর আশপাশ পাহারা দেওয়া ও পালিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেন ‘সি’ ক্যাটাগরির সদস্যরা। দলের সদস্যদের প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহার করা হয় রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে। এই দলে প্রশিক্ষিত শুটারদের মধ্যে রয়েছেন রাশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদ।

সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্যদের হাতে বিভিন্ন সময় অত্যাধুনিক অস্ত্রের দেখা মিললেও পুলিশ তা উদ্ধার করতে পারছে না। ছোট সাজ্জাদকে বিভিন্ন মামলায় ৬২ দিনের বেশি রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে একটি অস্ত্রও পুলিশ উদ্ধার করতে পারেনি। ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে এক ব্যবসায়ীর বাসায় গুলিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ইফতেখার ইবনে ইসহাক নামের এক সন্ত্রাসীকে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে তিনি জানান, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন।

বিদেশে বসে খুন-চাঁদাবাজির অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে সাজ্জাদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদেশে ব্যবসা করি, দেশে ভাড়া ঘর থেকেও আয় আছে। আমাদের পরিবার বিত্তশালী। আমি কেন বাহিনী তৈরি করব? উল্টো আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।’ তিনি দাবি করেন, ছোট সাজ্জাদ বা রায়হানের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, বিদেশে পলাতক সাজ্জাদের গড়ে তোলা এই বাহিনীই নগর ও জেলায় খুন, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজির ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে।

ব্যবসায়ীর বাসায় গুলি করা শুটাররা ধরা পড়েনি

গত শনিবার সকালে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসায় অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করা সন্ত্রাসীদের কাউকে ধরতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলাও হয়নি। তবে পুলিশ বলছে, অস্ত্রধারী শুটারদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশ পরা চারজন ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর বাসার কাছে আসেন। এরপর বাসাটি লক্ষ্য করে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে থাকেন।

সন্ত্রাসীদের অস্ত্র চালনার ধরন দেখে নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রশিক্ষিত শুটার ছাড়া এভাবে প্রকাশ্যে এসে গুলি করা সম্ভব নয়। তাদের যেভাবে গুলি করতে দেখা গেছে, তাতে তাদের প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী ও প্রশিক্ষিত মনে হয়েছে।

জানতে চাইলে নগরের চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। এর আগে জানুয়ারিতে ওই ব্যবসায়ীর বাসায় গুলির ঘটনায় জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। ঘটনায় ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটিও জব্দ করেছে পুলিশ।

Read full story at source