দিনাজপুরের বিরলে চার উদ্যোক্তার স্ট্রবেরি চাষ ও সাফল্যের গল্প
· Prothom Alo

সারি সারি ঝোপালো সবুজ গাছ। গাছের পাতাগুলো প্রায় গোলাকৃতির। চওড়া ও খাঁজকাটা। সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে সাদা ফুল। মাঝখানে হলুদ রেণু, চারপাশে সাদা পাপড়ি। গাছের গোড়ায় লতার সঙ্গে লাল–খয়েরি-সবুজ স্ট্রবেরি। স্ট্রবেরির এই খেত দেখতে প্রতিদিন স্থানীয় চাষিদের পাশাপাশি ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ।
Visit truewildslot.com for more information.
দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামে স্থানীয় চাষি শাহরিয়ার হোসেন (৪৮), আরিফ হোসেন (৪৪), মনিরুজ্জামান (৪০) ও ছামিউল ইসলাম (৩৩) যৌথ উদ্যোগে ৮৭ শতাংশ জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করছেন। শুধু স্ট্রবেরিই নয়, যৌথ উদ্যোগে শসা, টমেটো, বেগুন, পেয়ারা ও লিচুর বাগান ইজারা নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেছেন এই চার উদ্যোক্তা।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, সারিসারি বেডে মালচিং পদ্ধতিতে করা হয়েছে স্ট্রবেরির খেত। সবুজ গাছের ফাঁক দিয়ে মালচিং পেপারে নুয়ে আছে সবুজ (কাঁচা অবস্থায়) ও লাল–খয়েরি রঙের স্ট্রবেরি। ১২ জন শ্রমিকের মধ্যে কেউ ফল সংগ্রহ করছেন, কেউ আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছেন। খেতের কোনায় টংঘর বানানো হয়েছে। দিনরাত খেতের নিরাপত্তায় পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্ট্রবেরির খেতে গাছের পরিচর্যা করছেন একজন কৃষিশ্রমিক। মঙ্গলবার দুপুরে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামেউদ্যোক্তারা জানান, মোট ৮৭ শতাংশ জমির মধ্যে ২০ শতাংশ জমিতে পলিনেট হাউস করে কন্দ থেকে চারা প্রস্তুত করা হচ্ছে। অবশিষ্ট ৬৭ শতাংশ জমিতে উইন্টারডন, ফেস্টিভ্যাল, আমেরিকান ফেস্টিভ্যালসহ চার জাতের স্ট্রবেরির ১৫ হাজার গাছ লাগিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি গাছে ফল ধরেছে। সাধারণত অক্টোবর মাসের শেষে চারা লাগানোর উপযুক্ত সময় হলেও তাঁরা জমিতে চারা রোপণ করেছেন নভেম্বরের শেষে। ৭৫ দিনের মাথায় ফল সংগ্রহ শুরু করেছেন। এরই মধ্যে সাড়ে আট মণ ফল সংগ্রহ করেছেন। গড়ে দাম পেয়েছেন প্রতি কেজি ৪০০ টাকা দরে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবার প্রায় ১৫০ মণ স্ট্রবেরি পাবেন বলে তাঁরা আশা করছেন। জমি ভাড়া, সার-বীজ-কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বাদে এ মৌসুমে সাত থেকে আট লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তাঁরা।
চার উদ্যোক্তার শুরুর গল্প
পড়ালেখার পাশাপাশি কৃষিকাজ করতেন ছামিউল। ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ রাখতেন উচ্চমূল্যের ফসলসহ নতুন কৃষির। ২০২৩ সালে রংপুরের এক বন্ধুর কাছ থেকে স্ট্রবেরির চারা সংগ্রহ করে চাষ শুরু করেন। সেবার খুব বেশি লাভ করতে পারেননি। পরের বছর এক বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি লাগান। চারা সংগ্রহ করেছিলেন জয়পুরহাট থেকে। লাভ পেয়েছেন সামান্য। কৃষির প্রতি ছামিউলের এমন আগ্রহ দেখে এগিয়ে আসেন প্রতিবেশী শাহরিয়ার হোসেন, আরিফ ও মনিরুজ্জামান। জমি ইজারা নিয়ে শুরু করেন স্ট্রবেরিসহ অন্যান্য ফসলের চাষাবাদ।
শাহরিয়ার বলেন, ‘কৃষির প্রতি ছামিউলের আগ্রহ দেখতাম। আর্থিক সংকট থাকায় এগোতে পারছিলেন না। তাঁর সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগে। এরপর আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করি। বর্তমানে ১২ একর জমিতে আমরা বিভিন্ন ফসল আবাদ করছি যৌথ উদ্যোগে। এবার কৃষি বিভাগেরও সহযোগিতা পেয়েছি। স্ট্রবেরিতে লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। খুবই ভালো লাগছে। শসা ও টমেটোতেও লাভ পেয়েছি।’
সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লাল স্ট্রবেরি। মঙ্গলবার দুপুরে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামেছামিউল বলেন, ‘খুবই ভালো লাগছে। স্ট্রবেরির খেত দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন। অনেকে আগাম চারার জন্য বলে যাচ্ছেন। অনেকেই চাষাবাদে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। কয়েক দিনের মধ্যে কন্দ থেকে চারা সংগ্রহের কাজ শুরু করব আমরা। তারপর সেই চারা রাখা হবে পলিনেট হাউসে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছর অন্য কোথাও থেকে চারা সংগ্রহ করতে হবে না বরং চারা বিক্রি করতে পারব। এর মধ্যে ফেসবুকে “বিরল অ্যাগ্রো হাব” নামে একটি পেজ খুলেছি। সেখানে আমাদের বিভিন্ন চাষের ছবি ও ভিডিও আপলোড করছি।’
গতকাল ছামিউলদের খেত দেখতে আসেন কাহারোল উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রুহুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, ‘স্ট্রবেরি চাষের কথা শুনে দেখতে আসছি। খুবই ভালো লাগছে। নিয়ত করছি, আগামীবার আবাদ করব। এরই মধ্যে চারার বিষয়ে ভাইদের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁরা চারা দিতে চাইলেন।’
কৃষি বিভাগ জানায়, স্ট্রবেরি একটি শীতকালীন (রবি মৌসুম) লতানো গুল্ম–জাতীয় উদ্ভিদ। উর্বর দোআঁশ থেকে বেলে দোআঁশ মাটি এই ফল চাষের জন্য উপযোগী। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত এটির চাষ হয়। বেড পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে হয়। একটি গাছে গড়ে ২৫-৩০টি ফল ধরে, যার গড় ওজন ৪০০-৪৫০ গ্রাম পর্যন্ত।
বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার বলেন, ‘দিনাজপুর যেহেতু শীতপ্রধান এলাকা, এখানে স্ট্রবেরি চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগ এসএসিপি অ্যান্ড রেইনস প্রকল্পের আওতায় এই উদ্যোক্তাদের সার ও কৃষি উপকরণ, পরামর্শ সহায়তা দিয়েছে। এরই মধ্যে অন্যান্য ফল-ফসলের পাশাপাশি স্ট্রবেরি চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে আমরা কাজ করছি।’