আপনার ফ্রিজ হয়তো পরিবেশের ক্ষতি করছে, বিজ্ঞানীরা নিয়ে এলেন নতুন সমাধান
· Prothom Alo

তীব্র গরমের দিনে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি বা আইসক্রিমের জন্য ফ্রিজের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার ঘরের কোণে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই অতি প্রয়োজনীয় যন্ত্রটি পরিবেশের কতটা ক্ষতি করে চলেছে?
Visit chickenroad-game.rodeo for more information.
বর্তমান রেফ্রিজারেটরগুলোর এই পরিবেশ দূষণের চিরস্থায়ী সমাধান করতে বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রযুক্তি নিয়ে হাজির হয়েছেন। এর নাম দেওয়া হয়েছে আয়নোক্যালোরিক কুলিং। এটি এমন এক জাদুকরী পদ্ধতি, যা শুধু চারপাশকে ঠান্ডাই করবে না, বরং আমাদের এই গ্রহটিকেও বাঁচাবে। বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা করি।
পুরোনো ফ্রিজের সমস্যা কোথায়
আপনার বাসার সাধারণ রেফ্রিজারেটর বা এসি সাধারণত ভেপার কমপ্রেশনপদ্ধতিতে কাজ করে। এই পদ্ধতিতে একটি বিশেষ তরল পদার্থ চারপাশ থেকে তাপ শোষণ করে গ্যাসে পরিণত হয়। এরপর সেই গ্যাসকে একটি বদ্ধ নলের ভেতর দিয়ে চালনা করে আবার তরলে রূপান্তর করা হয়। এই চক্র বারবার চলতে থাকে। পদ্ধতিটি খুব কার্যকর হলেও এর সবচেয়ে বড় সমস্যা ওই বিশেষ তরলটি। ফ্রিজ ঠান্ডা করতে আমরা সাধারণত হাইড্রোফ্লুরোকার্বনের মতো যেসব রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস ব্যবহার করি, সেগুলো পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এগুলো গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম বড় কারণ।
ফ্রিজ খুলেই কেন ভুলে যাই কী নিতে এসেছিলামআপনার বাসার সাধারণ রেফ্রিজারেটর বা এসি সাধারণত ভেপার কমপ্রেশনপদ্ধতিতে কাজ করে। এই পদ্ধতিতে একটি বিশেষ তরল পদার্থ চারপাশ থেকে তাপ শোষণ করে গ্যাসে পরিণত হয়।
আয়নোক্যালোরিক কুলিং কী
যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের একদল গবেষক ২০২৩ সালে এই নতুন পদ্ধতির ধারণা দেন। এটি মূলত পদার্থের দশা পরিবর্তন প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।
ধরুন, আপনার কাছে এক খণ্ড বরফ আছে। বরফটিকে গলাতে চাইলে আপনাকে এর তাপমাত্রা বাড়াতে হবে। কিন্তু আমরা অনেকেই হয়তো খেয়াল করি না যে, বরফ গলার সময় এটি তার চারপাশ থেকে তাপ শোষণ করে নেয় এবং এর ফলে চারপাশটা ঠান্ডা হয়ে যায়!
আয়নোক্যালোরিক কুলিং পদ্ধতির ছবিএখন ভাবুন তো, তাপমাত্রা না বাড়িয়েই যদি কোনোভাবে জোর করে বরফ গলানো যায়, তবে কেমন হয়? শীতপ্রধান দেশে রাস্তায় বরফ জমা ঠেকাতে এর ওপর লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। লবণ হলো একধরনের আয়ন বা চার্জযুক্ত কণা, যা বরফের গলনাঙ্ক কমিয়ে দেয় এবং তাপ না বাড়িয়েই বরফ গলাতে সাহায্য করে। আয়নোক্যালোরিক কুলিং পদ্ধতি ঠিক এই নীতিতেই কাজ করে!
এই পদ্ধতিতে তরলের দশা পরিবর্তন করে আশপাশ ঠান্ডা করার জন্য লবণের সাহায্য নেওয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ড্রু লিলি বলেন, ‘রেফ্রিজারেন্টের দুনিয়ায় এটি একটি বড় সমাধান। এমন কোনো বিকল্প ছিল না যা একই সঙ্গে জিনিসপত্র ঠান্ডা করবে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে, নিরাপদ হবে এবং পরিবেশের কোনো ক্ষতি করবে না। আয়নোক্যালোরিক সাইকেল এই সব কটি শর্ত পূরণ করতে পারে।’
ফ্রিজ কীভাবে কাজ করেলবণ হলো একধরনের আয়ন বা চার্জযুক্ত কণা, যা বরফের গলনাঙ্ক কমিয়ে দেয় এবং তাপ না বাড়িয়েই বরফ গলাতে সাহায্য করে। আয়নোক্যালোরিক কুলিং পদ্ধতি ঠিক এই নীতিতেই কাজ করে!
গবেষণাগারের চমকপ্রদ ফলাফল
বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বটি প্রমাণ করার জন্য আয়োডিন এবং সোডিয়াম দিয়ে তৈরি একধরনের লবণের সঙ্গে ইথিলিন কার্বনেট নামে একটি সাধারণ অর্গানিক সলভেন্ট মিশিয়ে পরীক্ষা চালান। ইথিলিন কার্বনেট লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতেও ব্যবহৃত হয় এবং এটি তৈরি করতে কার্বন ডাই-অক্সাইড লাগে। মানে এই নতুন ফ্রিজটি পরিবেশের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে তৈরি উপাদানে চলবে!
আয়নোক্যালোরিক কুলিংসবচেয়ে বড় চমকটি হলো, বিজ্ঞানীরা পরীক্ষায় ১ ভোল্টের চেয়েও কম মাত্রার বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তাপমাত্রা প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম হন! এর আগে অন্য কোনো ক্যালোরিক প্রযুক্তি এত কম বিদ্যুতে এত বেশি তাপমাত্রা কমাতে পারেনি।
লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির গবেষক রবি প্রাশার বলেন, ‘আমরা তিনটি জিনিসের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছি। রেফ্রিজারেন্টের গ্লোবাল ওয়ার্মিং পটেনশিয়াল, শক্তির কার্যকারিতা এবং যন্ত্রপাতির খরচ। আমাদের প্রথম পরীক্ষাতেই এই তিন দিক থেকে দারুণ প্রতিশ্রুতিশীল ফলাফল পাওয়া গেছে।’
রাতে ফোন চার্জে দিয়ে ঘুমানো কি ক্ষতিকরসবচেয়ে বড় চমকটি হলো, বিজ্ঞানীরা পরীক্ষায় ১ ভোল্টের চেয়েও কম মাত্রার বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তাপমাত্রা প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম হন!
আন্তর্জাতিক কিগালি সংশোধনী চুক্তির অধীনে বিশ্বের অনেক দেশ আগামী ২৫ বছরের মধ্যে ক্ষতিকর এইচএফসি গ্যাসের ব্যবহার অন্তত ৮০ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে আয়নোক্যালোরিক কুলিং হতে পারে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
বিজ্ঞানীরা বসে নেই। ২০২৫ সালে গবেষকদের একটি আন্তর্জাতিক দল এই প্রযুক্তির আরও উন্নত একটি সংস্করণের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। নতুন এই মডেলে তারা নাইট্রেট-ভিত্তিক লবণ ব্যবহার করেছেন, যা ইলেকট্রিক ফিল্ড এবং মেমব্রেন ব্যবহার করে সহজেই রিসাইকেল করা যায়।
ল্যাবরেটরির এই যুগান্তকারী আবিষ্কার এখন শুধু বাণিজ্যিক পরিসরে বাজারে আসার অপেক্ষায়। হয়তো আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই আপনার বাসার পুরোনো ফ্রিজটির জায়গা দখল করে নেবে পরিবেশবান্ধব এই আয়নোক্যালোরিক রেফ্রিজারেটর!
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকাসূত্র: সায়েন্স অ্যালার্টএআই দিয়ে লেখা চেনার উপায় কী