অস্কারে পাঁচ বিদেশি সিনেমা: আপনার ও আমার পছন্দ কোনটি

· Prothom Alo

৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা অস্কার পুরস্কারের আসর বসছে এক দিন পরেই। ধারণা করা হচ্ছে জোর লড়াই হবে ‘সিনার্স’, ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার এনাদার’ ও ‘হ্যামনেট’–এর সঙ্গে। কিন্তু আমার আগ্রহ বেশি বিদেশি ভাষার সেরা চলচ্চিত্রের দিকে। বিশ্ব চলচ্চিত্র কোন অবস্থায় আছে, তার একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় মনোনয়নের তালিকা দেখলেই। মূল বিভাগের পুরস্কারগুলো নিয়ে এমনিতেই অনেক চর্চা হয়। সেখানে হলিউডের সিনোমারই আধিপত্য বেশি। মাঝেমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার প্যারাসাইটের মতো সিনেমা চমকে দেয় ঠিকই, তবে তা খুবই কম। আর তাই প্রতিবারই চেষ্টা থাকে আগে বিদেশি ভাষার সেরা চলচ্চিত্রগুলো দেখে ফেলা, তা ছাড়া এখন হলিউডের বাইরেই ভালো সিনেমা বেশি হয়।
 
এবার মনোনয়ন পেয়েছে পাঁচ দেশের পাঁচ চলচ্চিত্র। সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এবার মনোনয়ন পাওয়া চলচ্চিত্রগুলোই সেরা এবং ব্যতিক্রমী। এক সঙ্গে এত ভালো পাঁচ সিনেমা একসঙ্গে অনেক দিন দেখা হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত পুরস্কার কার ভাগ্যে আছে, সেটি জানার আগ্রহ তো থাকবেই।

‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

১. ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’: নরওয়ে
নরওয়ের পরিচালক ইয়োয়াকিম ত্রিয়েরের সিনেমার সঙ্গে অনেকেরই খুব ভালো পরিচয় আছে। বিশেষ করে ‘দ্য ওয়ার্স্ট পারসন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ সিনেমা যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা এই পরিচালককে আগ্রহ নিয়েই হয়তো অনুসরণ করেন। ইয়োয়াকিম ত্রিয়েরেরই নতুন সিনেমা ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’। চমৎকার এই সিনেমাটি দেখার পর প্রথম অনুভূতি হচ্ছে, এটি ঠিক যেন একটা কবিতা।

Visit zeppelin.cool for more information.

সিনেমার গল্প মূলত একটি ভাঙা পরিবার, বহু প্রজন্মের স্মৃতি আর শিল্পচর্চার ভেতর দিয়ে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টাকে ঘিরে। একজন বিখ্যাত কিন্তু বিতর্কিত চলচ্চিত্র পরিচালক বহু বছর আগে সংসার ছেড়ে নিজের ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটেছিলেন। ফলে তাঁর দুই মেয়ের সঙ্গে দূরত্ব ও ক্ষোভ তৈরি হয়। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি আবার দেশে ও পারিবারিক পুরোনো বাড়িতে ফিরে আসেন। ফিরে এসে দেখেন, সময় পেরিয়ে গেলেও সম্পর্কের ভাঙন সহজে জোড়া লাগে না। এক মেয়ে তুলনামূলক শান্ত, আরেক মেয়ে একজন অভিনেত্রী, যিনি নিজের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবন, দুই দিকেই টানাপোড়েনে আছেন।

সেই পরিচালক তাঁর নতুন চলচ্চিত্রের জন্য অনুপ্রেরণা খুঁজে পান নিজের পারিবারিক ইতিহাসে, বিশেষ করে তাঁর নিজের মায়ের জীবনে ঘটা এক বেদনাময় স্মৃতি থেকে। তিনি চান সেই গল্পকে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে এবং বাস্তব পারিবারিক বাড়িকেই শুটিং লোকেশন হিসেবে ব্যবহার করতে। এই সিদ্ধান্ত পরিবারে নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি করে। কে অভিনয় করবেন, প্রযোজনা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক—সব দিক থেকেই জটিলতা বাড়তে থাকে।

গল্প এগোয় বাবা–মেয়ের দূরত্ব, না–বলা অভিমান, শিল্পের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ, এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা মানসিক ক্ষতের অনুসন্ধান নিয়ে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় যে এই চলচ্চিত্র প্রকল্পটি শুধু একটি সিনেমা বানানোর চেষ্টা নয়, বরং সম্পর্ক বোঝা ও মেরামতেরও একটি পথ।

‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’র বাড়তি পাওনা হচ্ছে মূল চারটি চরিত্রেরই দুর্দান্ত অভিনয়। ৯৮তম অস্কারে ছবিটি মোট ৯টি বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে। এর মধ্যে আছে, সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেত্রী (রেইনসভে), সেরা পার্শ্ব অভিনেতা (স্কার্সগার্ড), এবং সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী (ফ্যানিং ও লিলিয়াস)।

‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

২. ‘ইট ওয়াজ জাস্ট এন অ্যাক্সিডেন্ট’: ফ্রান্স
এখন কো ইরানই সব আলোচনার কেন্দ্রে। জাফর পানাহি ইরানেরই একজন বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক। তিনি সমকালীন ইরানি সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা নিয়ে সাহসী ও মানবিক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য পরিচিত। ২০১০ সালে ইরান সরকার তাঁকে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিদেশভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তবু তিনি গোপনে চলচ্চিত্র বানিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় থাকেন। সে রকমই এক সিনেমা ‘ইট ওয়াজ জাস্ট এন অ্যাক্সিডেন্ট’।
চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনার জন্য বিখ্যাত রজার ইভার্ট (১৯৪২–২১৩) ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী চলচ্চিত্র সমালোচকদের একজন। ১৯৭৫ সালে চলচ্চিত্র সমালোচনায় প্রথম পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী সমালোচক তিনিই। রজার ইভার্ট মারা গেলেও তাঁর ওয়েবসাইট বন্ধ হয়নি। এটি এখন তাঁর স্ত্রী চাজ ইভার্টের তত্ত্বাবধানে একটি সম্পাদকীয় টিম চালায়।

‘ইট ওয়াজ জাস্ট এন অ্যাক্সিডেন্ট’ সিনেমাটি নিয়ে রজার ইভার্ট ডটকমের সমালোচনা থেকে একটি অংশ এখানে বলা যায়। যেমন, ‘শিরোনাম দেখে মনে হতে পারে ছবিটি ঢিলেঢালা বা হঠাৎ ঘটনার গল্প, কিন্তু বাস্তবে জাফর পানাহির ‘ইট ওয়াজ জাস্ট এন অ্যাক্সিডেন্ট’ খুবই নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত একটি সিনেমা। প্রথম দৃশ্যেই আমরা দেখি যে রাতে একটি মাটির রাস্তায় এক দম্পতি গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। স্বামী, গর্ভবতী স্ত্রী আর তাদের ছোট মেয়ে। রেডিওতে গান বাজছে, মেয়েটি পেছনের সিটে আনন্দে দুলছে, একটি শান্ত পারিবারিক মুহূর্ত। হঠাৎ বাবা ভুল করে একটি কুকুরকে চাপা দেন। মেয়েটি কষ্ট পায়, কিন্তু মা বিষয়টিকে ভাগ্য আর রাস্তার অন্ধকারের দোষ দিয়ে বলেন, ‘এটা শুধু একটা দুর্ঘটনা।’ আসলে একটি দুর্ঘটনায় প্রাণীর জীবন যেমন বদলে যায়, তেমনি মানুষের জীবনও হঠাৎ মোড় নিতে পারে।’

কিছু দূর যাওয়ার পর গাড়িটি নষ্ট হয়ে যায় একটি ছোট কারখানার কাছে। সেখানে এক কর্মচারী গাড়ি ঠিক করতে এগিয়ে আসে। এদিকে ভেতরের ঘরে থাকা ভাহিদ নামের আরেক কর্মচারী আগে শুনতে পান কৃত্রিম পায়ের কড় কড় শব্দ। তিনি লোকটিকে দেখার আগেই শব্দ শুনে চমকে ওঠেন। লুকিয়ে থেকে কণ্ঠ বদলে কথা বলেন। তাঁর সন্দেহ, এই লোকটি সেই ব্যক্তি, যিনি বহু বছর আগে কারাগারে তাকে নির্যাতন করেছিলেন। এরপরেই ঘটনা এগিয়ে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে জড়ো হয় নির্যাতিত আরও কয়েকজন।
পানাহির এই সিনেমা শুধু বাস্তব কারাগার নয়, সময় ও স্মৃতির তৈরি মানসিক কারাগার নিয়েও।

‘সিরাত’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

৩. ‘সিরাত’: স্পেন
আমরা যাকে বলি পুলসিরাত। অর্থাৎ এমন একটি সেতু, যা জাহান্নামের ওপর দিয়ে জান্নাতের দিকে যায়। এই সেতুটি অত্যন্ত সরু ও কঠিন, মানুষকে সেখানে নিজের কাজের বিচার অনুযায়ী পার হতে হয়। ন্যায়পরায়ণ মানুষ সহজে পার হয়ে যায়, আর পাপীরা নিচে পড়ে যায়।

‘সিরাত’ সিনেমায়ও শুরুর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যে ‘সিরাত সেতু স্বর্গ আর নরককে যুক্ত করে—এর পথ চুলের চেয়েও সরু, তলোয়ারের ধার থেকেও ধারালো।’ তবে সিনেমায় এই ধারণাটি সরাসরি ধর্মীয় গল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। বরং পরিচালক এটিকে একটি রূপক হিসেবে নিয়েছেন। সিনেমার কাহিনিতে মরুভূমির মধ্য দিয়ে একদল মানুষের কঠিন ও অনিশ্চিত যাত্রা দেখানো হয়। এই যাত্রাপথে তারা নানা বিপদ, ভয় এবং মানসিক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়।

অলিভার লাক্সের এই সিনেমা মরক্কোর সাহারা মরুভূমিকে পটভূমি করে তৈরি, যেখানে একদল রেভার (নাচ–গানে মেতে থাকা তরুণ দল) এবং আরও কয়েকজন পথযাত্রীকে কঠিন ও নির্দয় প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়। পথে তারা একের পর এক বিপদের মুখে পড়ে, কিছু বিপদ আবার তাদের নিজেদের অসাবধানতার কারণেও আসে। ছবিটি একেবারেই প্রচলিত ধারার বাইরে।

গল্পটি ঢিলেঢালা কিন্তু সহজভাবে এগোয়। শুরুতে দেখা যায় স্পেন থেকে আসা এক ব্যক্তি লুইস এবং তার প্রায় ১২ বছর বয়সী ছেলে এস্তেবানকে। তারা মরুভূমির ভিড়ের মধ্যে ঘুরে ঘুরে নিখোঁজ ব্যক্তির পোস্টার বিলি করছে। জায়গাটি মরুভূমির সমতল বিস্তার, পাশে উঁচু লাল পাথরের পাহাড়ি দেয়াল। লুইস তাঁর মেয়েকে খুঁজছেন, যার কোনো খোঁজ বহু মাস ধরে নেই। অন্যদিকে সেখানে জড়ো হওয়া তরুণরা এসেছে নাচতে, গান শুনতে, একসঙ্গে সময় কাটাতে। তারা তাঁবু আর ভাঙাচোরা গাড়ি দিয়ে অস্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছে। বড় বড় স্পিকার সাজিয়ে আলাদা এক দেয়ালও বানিয়েছে, যেখান থেকে জোরে বাজতে থাকা সুর শরীর আর মনে একটানা দোলা দিয়ে যায়। তবে সিনেমাটি যে ভাবে আগায়, তা দেখাটাও মুশকিল। মনে রাখতে হবে সিনেমার নাম ‘সিরাত’।

এই সিনেমার সংগীতের সঙ্গে যুক্ত আছেন ফরাসি ইলেকট্রনিক সংগীতশিল্পী ডেভিড লেতেলিয়ের। তিনি ইলেকট্রনিক, টেকনো ও পরীক্ষামূলক সাউন্ড ডিজাইনের জন্য পরিচিত এবং ইউরোপের সমসাময়িক ইলেকট্রনিক সংগীত জগতে গুরুত্বপূর্ণ একজন শিল্পী। ‘সিরাত’ সিনেমায় ডেভিড লেতেলিয়েরের সংগীত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার তৈরি ইলেকট্রনিক সাউন্ড ও তীব্র বিট মরুভূমির রহস্যময়তা, বিপদ এবং চরিত্রদের মানসিক অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তোলে। আমি নিশ্চিত যে বা যাঁরাই সিনোমাটি দেখেছেন, তাঁরাই কানে ইয়ারবাড গুঁজে সংক্রামক, সম্মোহনী বিটগুলো নিয়মিত শুনছেন।

‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডবিি

৪. ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’: ব্রাজিল
রজার ইভার্ট থেকেই ধার করে বলি—‘মাঝেমধ্যে এমন কিছু সিনেমা দেখা যায়, যেগুলো মনে হয় বানানো নয়, বরং যেন কোনো স্বপ্ন দেখা মনের ভেতর থেকে তুলে আনা। ছবিটির নিজস্ব শক্তিশালী ভঙ্গি আর আলাদা ভিজ্যুয়াল স্টাইল থাকে, এবং এটি নিজের রহস্যময় ছন্দে এগোয়। এই ধরনের সিনেমা দর্শকের হাতে সহজ করে সব অর্থ তুলে দেয় না, বরং দর্শককেই তার কাছে গিয়ে অর্থ খুঁজে নিতে হয়। তেমনই একটি ছবি হলো ‘দ্য সিক্রেট এজন্টে’, যার লেখক ও পরিচালক ক্লেবার মেনডোঁসা ফিলহো।’
১৯৭৭ সালের ব্রাজিলকে পটভূমি করে তৈরি এই সিনেমা। যখন দেশটি ২১ বছরের সামরিক শাসনের মাঝামাঝি সময়ে। এখানে মার্সেলো চরিত্রে অভিনয় করেছেন ওয়াগনার মৌরা, লম্বা, দাড়িওয়ালা, শান্ত স্বভাবের কিন্তু চোখে এক ধরনের বিষণ্নতা আছে। তিনি উজ্জ্বল হলুদ রঙের ফক্সভাগেন বিটল গাড়ি চালিয়ে রেসিফে শহরে আসেন, যা ব্রাজিলের পারনামবুকো প্রদেশের রাজধানী। কেন তিনি সেখানে এসেছেন, তা প্রথমে জানা যায় না, এবং অনেকক্ষণ পর্যন্ত রহস্যই থেকে যায়। ছবির কিছু কথোপকথনের অর্থ বুঝতে হলে ইঙ্গিত ও আভাস ধরতে হয়। মার্সেলো ও তার আশপাশের মানুষেরা সরাসরি কথা বলতে এড়িয়ে চলে; কারণ, তারা ভয় পায়, কেউ হয়তো আড়ি পেতে শুনছে।

খুন এই গল্পের জগতে খুব সাধারণ ঘটনা। কিছু হত্যাকাণ্ড করা হয় শাসকগোষ্ঠীর বিরোধীদের শাস্তি দিতে, আবার কিছু ঘটে সাধারণ অপরাধ হিসেবে। অনেক সময় এই দুইয়ের সীমা মিশে যায়। ভাড়াটে খুনিরা টাকার বিনিময়ে যে কাউকে মেরে লাশ গায়েব করে দিতে পারে। কাজ শেষ করে তারা স্বাভাবিক জীবনেই ফিরে যায়। ছবিটি দেখায় যে মানুষ কীভাবে এমন নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তার ভেতরেই বাঁচতে শেখে।
রজার ইভার্টের ভাষায়, ‘সব মিলিয়ে, এটি বছরের অন্যতম সেরা ও আলাদা ধরনের সিনেমা। বারবার দেখলে নতুন নতুন স্তর খুলে যায়। শেষ দৃশ্যটি গভীরভাবে নাড়া দেয়। গল্পের ছন্দের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারলে, এই ছবি আপনাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবে—যেখানে সাধারণ সিনেমা খুব কমই যায়।’

‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’ সিনেমার পোস্টার থেকে। আইএমডিবি

৫. ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’: তিউনেশিয়া
এ সময়ের সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলা সিনেমা অবশ্যই তিউনিসীয় নির্মাতা কাওথার বেন হানিয়ার ছবি ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’। সিনেমাটি পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাবের মর্মান্তিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ২০২৪ সালে গাজায় তার চাচার গাড়িতে থাকা অবস্থায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে তিনি, তাঁর পরিবারের ছয় সদস্য এবং তাঁকে উদ্ধার করতে যাওয়া দুই প্যারামেডিক নিহত হন।
প্রথম হামলায় আশপাশের সবাই মারা গেলেও হিন্দ বেঁচে ছিল। সে বহু ঘণ্টা ধরে প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সঙ্গে ফোনে কথা বলে সাহায্য চাইতে থাকে, বাঁচানোর আবেদন জানায়।

খুব সাহসী একটি নির্মাণভঙ্গিতে পরিচালক বেন হানিয়া ছবিতে হিন্দের আসল ফোনকলের অডিও ব্যবহার করেছেন, এতে তার বাস্তব, হৃদয়বিদারক কণ্ঠ সরাসরি শোনা যায়। আর সেই সঙ্গে জরুরি সহায়তা কেন্দ্রের অফিসে কীভাবে উদ্ধারকর্মীরা চেষ্টা করছিলেন, সেটি কল্পিতভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এটি আসলে একটি ডকুড্রামা।

অস্কার ২০২৬, কোন সিনেমা কোথায় দেখবেন

২৯ জানুয়ারি ২০২৪ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা উপত্যকার তেল আল–হাওয়া এলাকা খালি করার নির্দেশ দেয়। সেদিন হামাদেহ পরিবারের ছয় সদস্য ও তাঁদের ছয় বছরের ভাতিজি হিন্দ রাজাব একটি গাড়ির ভেতরে আটকে পড়েন। সেনাবাহিনীর গুলিতে গাড়ির পাঁচজন সঙ্গে সঙ্গে মারা যান। অলৌকিকভাবে ১৫ বছরের লায়ান ফোন করে প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কাছে সাহায্য চাইতে পেরেছিল, কিন্তু সেও পরে মারা যায়। ফলে ছোট্ট হিন্দ একা পড়ে থাকে গাড়িতে, চারপাশে পরিবারের লাশ, আর হাতে ছিল দুর্বল নেটওয়ার্কের একটি মুঠোফোন।
স্পয়লার হয়ে গেল। কারণ, ঘটনাটি যেমন সবার জানা, পরিণতিও সবাই জানেন। তারপরও রাজাবের বাস্তব কণ্ঠ শোনাটা খুবই কঠিন কাজ, সহ্য করা একেবারেই সহজ নয়।  

আপনার ও আমার পছন্দ কোনটি
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে কোন সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত অস্কার ঘরে তুলবে। বলা কঠিন। তবে বেশির ভাগ পূর্বাভাস হচ্ছে সেন্টিমেন্টাল ভ্যালুই সেরা হবে। সন্দেহ নেই সিনেমা হিসেবে এটাই সেরা। সেরা চলচ্চিত্রের মূল তালিকায়ও এই সিনেমাটি রয়েছে।
কিন্তু সব সময়েই কি সব কিছু নিয়ম মেনে চলে? যেমন এখন ইরান যুদ্ধ সবচেয়ে বাস্তব ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে ইরানের ওপর। তারপরও ‘রেজিম বদল’ করতে পারেনি। এখন ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চোখ দিয়ে বিচারকেরা সিনেমাটি দেখলে এবং কিছুদিন আগে ইরানের ভেতরে থেকে যারা রেজিম বদলের আন্দোলন করেছে, তাদের প্রতি সহানুভূতি জানাতে পুরস্কার ইট ওয়াজ জাস্ট এন এক্সিডেন্ট পেয়েও যেতে পারে। যদিও সিনেমাটি এসেছে ফ্রান্সের মনোনয়ন পেয়ে।
 
আবার ইসরায়েলের নৃশংসতা সামনে আনতে চাইলে পুরস্কার যাবে ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব’–এর কাছে। এই সম্ভাবনা সম্ভবত কম। তারপরও শেষ কথা বলা যায় না। তবে পুরস্কার পেলে আমার মতো অনেকেরই হয়তো সবচেয়ে বেশি ভালো লাগবে।
সিরাতের পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে ডার্ক হর্স হওয়ার অধিকার আছে দ্য সিক্রেট এজেন্টেরও।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ সব দিক থেকে এগিয়ে, কিন্তু ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব পাবে’—এটা চাওয়া।
আপনার?

সূত্র: রজারইবার্ট ডটকম, দ্য গার্ডিয়ান ও নিউইয়র্ক টাইমস

Read full story at source