তালা

· Prothom Alo

অফিস থেকে বেরিয়ে মেট্রোর দিকে হাঁটছি।

Visit amunra.qpon for more information.

পায়ে ক্লান্তি। মাথায় অফিসের হিসাবের জট। বাসায় আম্মা একা। হার্টের রোগী। মোবাইলে তিনবার কথা হয়েছে আজ। তবু বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি থাকেই।

ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে আছি।

‘বাসায় ঠিকমতো তালা মেরেছ তো?’ স্টেশনেই কে যেন কাউকে জিজ্ঞেস করল।

তালা!

শব্দটা মাথায় ক্লিক করল।

আম্মা আজ সকালেই তালার কথা বলেছিলেন।

‘গেটের চাবিগুলো হারিয়ে গেছে। নতুন তালা লাগবে। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে তালা নিয়ে আসিস।’ বলতে বলতে আম্মা প্রসঙ্গ পাল্টেছিলেন, ‘তুই কবে বিয়ে করবি? কত দিন আমি এই সব হারানো জিনিসের কথা তোকে বলব?’

আম্মা প্রায়ই তালা–চাবি হারান। তালা হারানোর কথা শুরু করলেই বিয়ের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। সকালে একবার। রাতে একবার। এটা তাঁর নিত্যদিনের রুটিন।

আমি শুনি। কিছু বলি না।

তাহমিনার কথা মনে পড়ে।

সাত বছর।

টানা সাত বছরের প্রেম ছিল আমাদের। এর মধ্যে আমার বেকার জীবন ছিল ছয় বছরের।

কত মান-অভিমান।

কত বেড়ানো।

কত নাটক।

কত সিনেমাই–না একসাথে দেখেছি।

একসাথে হেঁটেছি।

কখনো রোদে।

কখনো বৃষ্টিতে।

‘বিয়ের পর রাতের পর রাত জেগে আমরা গল্প করব। আমি চা বানিয়ে আনব। তারপর চা খেতে খেতে দুজনে জোছনা দেখব। মনভরে।’

হয়তো তাহমিনা ঠিকই জোছনা দেখছে।

বাবা-মায়ের পছন্দের ছেলের সাথে। কানাডায়।

আর আমি? দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম জোরে।

আমি পড়ে আছি ঢাকায়।

একা!

সেই থেকে মনের দরজায় একটা তালা ঝুলছে। মরচে পড়া। ভারী।

কেউ খুলতে পারেনি।

খুলতে পারবে বলে মনেও হয় না।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে পরিচিত হার্ডওয়ারের দোকানে ঢুকলাম। আগেও এসেছি।

কর্মচারী তালা দেখাল। নানা ধরনের। ছোট-বড়।

তামার-স্টিলের।

একটা পছন্দ করলাম। দাম শুনে থমকে গেলাম। বেশি মনে হলো।

‘দোকানের মালিক কোথায়?’ জানতে চাইলাম।

‘ভেতরে আছেন।’ কর্মচারী জবাব দিল। ভেতরে গেলাম।

থমকে দাঁড়ালাম।

মালিকের চেয়ারে চেনা চাচার পরিবর্তে অপূর্ব সুন্দর একটা মেয়ে বসে আছে। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ।

চোখে ক্লান্তি। তবু চেহারায় কী যেন একটা স্থিরতা আছে। ঝড়ের পরেও যেভাবে গাছ দাঁড়িয়ে থাকে।

‘আগের মালিক...উনি কোথায়?’

‘গত সপ্তাহে মারা গেছেন। আমার আব্বা।’ নির্লিপ্তভাবে বলল মেয়েটি।

‘আপনি দোকানে! আপনার কোনো ভাই নেই?’ জিজ্ঞেস করার পর মনে হলো প্রশ্নটা করা ঠিক হয়নি।

‘ আমার কোনো ভাই নেই। তাই আমিই সামলাচ্ছি। ব্যবসা তো আর বন্ধ রাখতে পারি না।’

‘আমি এই দোকান থেকে নিয়মিত তালা কিনি। আজ তালার দাম এক শ টাকা বেশি চাইল মনে হচ্ছে।’

‘আচ্ছা। আপনি এক শ টাকা কমই দিন।’

কথা বাড়ালাম না। তালার দাম মিটিয়ে বেরিয়ে এলাম।

‘আসবেন আবার।’ মেয়েটি চোখ তুলে বলল।

শক খেলাম যেন। এত সুন্দর চোখ!

রাস্তায় পা ফেলতে গিয়ে টের পেলাম তালা নিয়ে এসেছি। কিন্তু কিছু একটা ফেলে এসেছি দোকানে।

মনের ঘরের চাবিটা।

পরদিন আবার গেলাম ওই দোকানে, সিরিশ কাগজ কেনার অজুহাতে।

এর পর থেকে নিয়মিত যেতে শুরু করলাম।

টিনের তার।

স্ক্রু।

দেয়ালের হুক।

প্রতিদিনই কিছু না কিছু কিনলাম। প্রতিবার তাকে একটু একটু করে দেখলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে।

আম্মা একদিন বললেন, ‘তোর চোখ দেখে মনে হচ্ছে কোনো কিছু নিয়ে খুব অস্থির হয়ে আছিস।’

‘না আম্মা। তেমন কিছু না।’ আমি হাসলাম।

‘যে পুকুরে চাবি হারায়, সেই পুকুরেই খুঁজতে হয়।’

চুপ করে রইলাম। কিন্তু কথাটা একেবারে মনের ভেতরে নাড়া দিয়ে গেল।

পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা কিনলাম।

দোকানে ঢুকলাম। মেয়েটি চেয়ারে বসে হিসাবের খাতা দেখছিল। আমাকে দেখে মিষ্টি হাসল।

‘আজ কী নিতে এসেছেন?’

‘আজ কিছু নিতে আসিনি। দিতে এসেছি।’ ফুলগুলো এগিয়ে দিলাম।

‘ফুল কিসের জন্য?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল সে।

কী বলব বুঝতে পারছি না। শেষ পর্যন্ত মুখ দিয়ে বের হলো, ‘আপনাকে দাওয়াত দিতে এসেছি।’

‘কিসের দাওয়াত?’

চুপ করে রইলাম।

‘আপনার বিয়ের?’ মুচকি হাসল সে।

‘ধরে নিন সে রকমই কিছু।’

মেয়েটি একটু চুপ রইল। তারপর ড্রয়ার থেকে একটা কার্ড বের করল।

‘আচ্ছা, যাব আপনার বিয়েতে। তার আগে আপনি আসবেন। এই নিন।’

কার্ডটা নিলাম।

‘কিসের কার্ড?’

মেয়েটি লাজুক হেসে বলল, ‘আমার বিয়ের।’

হাত থেকে রজনীগন্ধা পড়ে যাওয়ার আগেই সামলে নিলাম।

বাইরে বেরিয়ে এলাম।

রাস্তায় সন্ধ্যা নামছে। মেট্রোর দিকে হাঁটছি। হাতে সেই কার্ড।

মনের ঘরে আবার তালা পড়ল।

চাবিও হারিয়েছে।

Read full story at source