শুধু ভর্তি পরীক্ষা, নাকি সুশিক্ষার পথ অন্য কোথাও
· Prothom Alo
সুইডেন বা ইউরোপের দেশগুলোর জীবনব্যবস্থা ও সামাজিক পরিকাঠামো যে বাস্তবতায় গড়ে উঠেছে, তা সরাসরি বাংলাদেশের সমাজে প্রয়োগ করা সব সময় সহজ বা প্রাসঙ্গিক নয়। তাই দুই ভিন্ন বাস্তবতাকে হুবহু তুলনা করাও অনেক ক্ষেত্রে সঠিক নয়। তবে শিক্ষা বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রশ্নে যদি কোনো এক সময় আমাদেরও বিশ্বমানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হয়, তাহলে সেই পথচলা শুরু করতে হবে আজ অথবা কাল। সেই ভাবনা থেকেই আমি সুইডেনসহ ইউরোপের অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থার কিছু দিক তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
ইউরোপের শিশুশিক্ষার ধরন আমাকে প্রথমে করেছে অবাক, পরে মুগ্ধ। জন্মের প্রথম বছর শিশু তার মায়ের সঙ্গে সময় কাটায়। পরে তাকে সুইডিশ ডাগিসে অর্থাৎ কিন্ডারগার্টেন বা ডে–কেয়ার শিক্ষা প্রশিক্ষণে ভর্তি করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে মায়েরা শিশুর সঙ্গে থাকেন। আস্তে আস্তে কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক ও শিশুদের একটি সমন্বয় ঘটতে থাকে এবং মায়েদের উপস্থিতি কমতে থাকে এবং শেষে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সময় শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয়।
ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীরা পছন্দসই একটি বিদেশি ভাষা পড়তে পারে। ফ্রেঞ্চ, জার্মান আর স্প্যানিশ ভাষার মধ্যে যেকোনো দুটি ভাষা স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের পড়ার জন্য অফার করে থাকে। সময়ানুবর্তিতাকে এখানে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই ব্যাপার কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়।
সুইডেন, ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের অধিকাংশ দেশে প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক স্তরে, অর্থাৎ বাংলাদেশের ১ম থেকে ৯ম শ্রেণির সমতুল্য পর্যায়ে, স্কুলে ভর্তির জন্য কোনো ভর্তি পরীক্ষার প্রচলন নেই। সাধারণত শিশুর বয়স, বসবাসের এলাকা এবং অভিভাবকের পছন্দের ভিত্তিতে স্কুল নির্ধারিত হয়। স্থানীয় সরকার বা পৌরসভা প্রতিটি শিশুর জন্য একটি স্কুলে পড়ার সুযোগ নিশ্চিত করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাড়ির কাছের স্কুলে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিছু স্বাধীন বা বেসরকারি স্কুলে আগে আবেদন করা বা অপেক্ষমাণ তালিকার ভিত্তিতে আসন দেওয়া হয়, তবে সেখানেও সাধারণত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয় না। খুব সীমিত ক্ষেত্রে বিশেষায়িত স্কুল, যেমন সংগীত বা বিশেষ প্রতিভাভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আলাদা পরীক্ষা থাকতে পারে, কিন্তু তা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ম নয়। ইউরোপের শিক্ষা দর্শন মূলত প্রতিটি শিশুর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতামূলক চাপ কমিয়ে শেখার স্বাভাবিক ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেয়। আমার অভিজ্ঞতায়, সুইডেনে শিশুর স্কুলে ভর্তির প্রক্রিয়াটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল নয় বরং পরিকল্পিত শিক্ষা কাঠামো, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় এবং অভিভাবকের পছন্দের সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
শিশুর বয়স ছয় বছর হওয়া পর্যন্ত তাদের নানা বিষয়ের ওপর নানাভাবে হাতেনাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হয়। ছয় বছর তারা শেখে বিভিন্ন বিষয়, যেমন শেয়ার ভ্যালু, মনুষ্যত্ববোধ, ভ্রাতৃত্ববোধ, একতা ও সামাজিকতা। এককথায় বলা যেতে পারে এখান থেকে জীবন গড়ার শুরুটাকে মজবুত করে তৈরি করতে সাহায্য করা হয়।
সুইডিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মূলত অটাম এবং স্প্রিং সেমিস্টারে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়একজন শিশুর মধ্যে সচেতনতার ছাপ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি বারবার। দেখেছি যখন আমার ছেলেমেয়ে ডাগিস থেকে বাড়িতে এসেছে। আমি যদি কোথাও কোনো ভুল করেছি সঙ্গে সঙ্গে তারা বলেছে বাবা তুমি এটা এভাবে না করে এইভাবে কর।
আমাদের ডাগিসের শিক্ষকেরা এটা এভাবে করতে বলেছেন। আমি অবাক হয়েছি আর তাদের থেকে নতুন নতুন বিষয় শিখেছি। শেখার সঙ্গে সঙ্গে তারাও বুঝেছে বাড়ি ও সমাজে তাদের ভ্যালু কত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদার বিরাট পরিবর্তন দেখা দেয় ছয় বছর বয়সে। যা না দেখলে বিশ্বাস হওয়ার কথা নয়।
ছয় বছর বয়সে কোনো রকম চাপ প্রয়োগ ছাড়া একজন শিশুকে গড়ে তোলা, যেখানে তার শিশুকাল হারিয়ে যায়নি, যেখানে সে খেলাধুলার মধ্য দিয়ে জীবনের পরিকাঠামো তৈরিতে যা যা দরকার, তার সব পেয়েছে। যার কারণে জীবনে চলার পথে দ্বন্দ্ব নয়, প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে সে নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে শুরু করে।
এবার স্কুলের জীবন শুরু। জীবনের নতুন অধ্যায়। জানা, দেখা, নিজের হাতে সবকিছু তৈরি করা। নিজের চেষ্টায় কিছু করা। দেশের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা। নতুন ও পুরোনোর সংমিশ্রণে চিন্তার উন্নয়ন করা। প্রকৃতিকে নিজের মতো করে উপলব্ধি করা। অজানা ও অচেনাকে চেনা। সবকিছুর সঙ্গে লতার মতো জড়িয়ে পড়া, যা তাদের জীবনকে পরিপূর্ণতা দিতে সাহায্য করে।
৬ থেকে ১৫ বছর বয়সে তারা শিক্ষার বেসিকের সঙ্গে সুন্দরভাবে জড়িয়ে পড়ে। এ সময়ের শিক্ষায় জীবনের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে একটি পরিপূর্ণ ছবি দেয় বিধায় তারা বেশ সচেতন হয়ে ওঠে। তারা কী হতে চায় তাদের কর্মজীবনে।
সুইডেনে বাধ্যতামূলক শিক্ষা সাধারণত ছয় বছর বয়স থেকে শুরু হয়। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা তিনটি স্তরে বিভক্ত। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত নিম্নস্তর, চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত মধ্যম স্তর এবং সপ্তম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ স্তর। প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের শিক্ষা ও উন্নয়নের জন্য স্কুল ও অভিভাবকের দায়িত্ব সমান। শিশুর উন্নতির ধারা এবং পছন্দ সম্পর্কে স্কুলগুলো নিয়মিতভাবে অভিভাবককে জানায়। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যেন তারা স্কুল ও স্কুলের বাইরের জীবন থেকে ভবিষ্যৎ শিক্ষার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। তারা যেন ভবিষ্যতে লিঙ্গ, সংস্কৃতি কিংবা সামাজিক কারণে পেশা বাছাইয়ের সময় কোনোরূপ সমস্যায় না পড়ে, সে ব্যাপারে দৃষ্টি রাখা হয়। প্রাথমিক শিক্ষার তিনটি স্তরে শিশুদের সুইডিশ ভাষা, গণিত, শারীরিক শিক্ষা, ইংরেজি, কারুকলা, সংগীত, ভিজ্যুয়াল আর্টস, প্রযুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিদ্যা, ইতিহাস, সামাজিক বিজ্ঞান, ধর্ম, ভূগোল ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি মোট ১৬ বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হয়।
ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীরা পছন্দসই একটি বিদেশি ভাষা পড়তে পারে। ফ্রেঞ্চ, জার্মান আর স্প্যানিশ ভাষার মধ্যে যেকোনো দুটি ভাষা স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের পড়ার জন্য অফার করে থাকে। সময়ানুবর্তিতাকে এখানে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই ব্যাপার কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়।
ভবিষ্যতের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে কিছু পূর্বশর্ত মেনে এর সংস্কার প্রয়োজনসুইডিশ শিক্ষাব্যবস্থায় গ্রেডিং মূলত তিন প্রকার। ফেল, পাস ও পাস উইথ ডিস্টিংশন। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এ, বি, সি, ডি, ই এবং এফ—এই ছয়ভাবে গ্রেড করা হয়। তবে বি ও ডি গ্রেডকে বলা হয় ফিলিং গ্রেড। পরীক্ষা হয় ২০ পয়েন্টের ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুরা অপশনাল বিষয়সহ মোট ১৭টি বিষয়ে সর্বোচ্চ ৩৪০ পয়েন্ট অর্জন করতে পারে। শিশুদের তৃতীয়, ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণিতে জাতীয়ভাবে মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়। সব শিশুকে সমানভাবে মূল্যায়ন করাই এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য, তবে ষষ্ঠ শ্রেণির আগপর্যন্ত শিশুদের গ্রেড করা হয় না। তৃতীয় শ্রেণিতে শুধু গণিত ও সুইডিশ ভাষার ওপর পরীক্ষা নেওয়া হয়। অন্যদিকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে গণিত, সুইডিশ ভাষা এবং ইংরেজির ওপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা হয়। পাশাপাশি নবম শ্রেণিতে পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও জীববিদ্যার মধ্য থেকে যেকোনো একটি এবং সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয় থেকে একটি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়।
সুইডেনে দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিক স্তরকে বলা হয় জিমনেসিয়াম বা হাইস্কুল। হাইস্কুলে লেখাপড়া করা সুইডেনের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে শতকরা ৯৮ ভাগ সুইডিশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায় শেষ করে হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে থাকে। এখানে হাইস্কুল স্তরে দুটি শাখা রয়েছে। প্রথম শাখাটি কারিগরি শিক্ষার ওপর নজর দেয় এবং অন্যটি উচ্চশিক্ষার ওপর, তবে উভয় শাখার শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পায়। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একই ধারার বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে।
সুইডেনে দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিক স্তরকে বলা হয় জিমনেসিয়াম বা হাইস্কুল। হাইস্কুলে লেখাপড়া করা সুইডেনের শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে শতকরা ৯৮ ভাগ সুইডিশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায় শেষ করে হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে থাকে। এখানে হাইস্কুল স্তরে দুটি শাখা রয়েছে। প্রথম শাখাটি কারিগরি শিক্ষার ওপর নজর দেয় এবং অন্যটি উচ্চশিক্ষার ওপর।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে এ দেশে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও ডক্টরাল লেভেল রয়েছে। সব ক্ষেত্রেই লেখাপড়ার জন্য এ দেশে বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউনিভার্সিটেট এবং বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এই দুটি শাখা রয়েছে। ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রিসার্চ ওরিয়েন্টেড বিশ্ববিদ্যালয় কলেজও রয়েছে এ দেশে। সুইডেনে তিন বছরের স্নাতক, এক বা দুই বছরের স্নাতকোত্তর এবং দুই থেকে চার বছরের ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে। শিক্ষা ও গবেষণা খাতে সুইডিশ সরকারের বিশেষ দৃষ্টি ও অর্থায়ন উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সুইডেনকে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আকর্ষণ হিসেবে গড়ে তুলেছে। বিশেষত ডক্টরাল পর্যায়ের গবেষণার জন্য সুইডিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আলাদা সুনাম রয়েছে।
এতক্ষণে জানলাম নরডিক দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার কথা এখন বলি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কীভাবে নতুন প্রজন্ম উদ্ভাসিত হবে নতুন জ্ঞানের আলোকে!
আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭ সাল) থেকে বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে ওপরের সব শ্রেণিগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা হবেস্বাধীন দেশ হিসেবে সোনার বাংলা গড়ার যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সেই স্বপ্ন অধরাই রইল। দেশের প্রতিটি উন্নয়ন-রূপকল্পের ভিতিমূলেই রয়েছে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের প্রতিফলন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে সময় ও প্রয়োজনের সীমারেখা। অগ্রণী চিন্তায় বাংলাদেশও উদ্ভাসিত হবে নতুন জ্ঞানের আলোকে! এই শিক্ষা হবে নতুন প্রজন্মের উপার্জনের হাতিয়ার। সারা বিশ্বের মানুষের প্রথম চাওয়া এখন সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা আর শিক্ষা বললেই বুঝি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বললেই সর্বাগ্রে ভাবতে হয়, প্রতিষ্ঠান যাদের ঘিরে আবর্তিত হয় সেই শিক্ষকদের।
যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা–সম্পর্কিত সব উদ্যোগ, সব প্রক্রিয়া শ্রেণিকক্ষে সম্প্রসারণ করার অধিকারী স্বভাবত হচ্ছেন শিক্ষক, সেহেতু শ্রেণিকক্ষে যুগোপযোগী শিক্ষা সম্প্রসারণ করার জন্য শিক্ষককে নিতে হয় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রশিক্ষণ। বর্তমান বিশ্বে চলছে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এবং গোটা বিশ্বের শিল্পকারখানা, প্রযুক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। পৃথিবীর উন্নত দেশে এখন আজীবন চাকরি বলে কিছু নেই, চাকরি আছে তত দিন, যত দিন কাজ আছে এবং কাজ আছে তত দিন, যত দিন ডিমান্ড আছে। শেয়ার মার্কেট নিয়ন্ত্রণ করছে বর্তমান কর্মসংস্থান। শেয়ারহোল্ডার, রাজনীতি, ক্লাইমেট পরিস্থিতি, এসব বিশাল আকারে প্রভাব বিস্তার করছে শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডে। শিক্ষা ও শিক্ষার মানদণ্ড করেছে গ্লোবাল চাহিদার ওপর এবং তা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট লেভেলে।
লটারি বাদ, ফিরছে ভর্তি যুদ্ধ, শিশুদের ওপর চাপ ও কোচিং বাড়ার শঙ্কাশেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ করছে চাকরি থাকবে কী থাকবে না। সে ক্ষেত্রে নিশ্চিত বলা কঠিন কী পড়লে সারা জীবন চাকরির গ্যারান্টি মিলবে। তবে সারা জীবন টেকসই ইন্ডিভিজ্যুয়াল প্রোডিউসার এবং যোগ্য নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে দরকার সময়োপযোগী সুশিক্ষা। বাংলাদেশ উন্নয়নের সড়কে ঊর্ধ্বমুখী এক দেশ। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ও সময়ের স্রোতে এ দেশের সব সেক্টরেই লেগেছে আজ ডিজিটালাইজেশনের হাওয়া। কিন্তু আমাদের ধ্যানজ্ঞান এ হাওয়া আজও লাগেনি। চাহিদা বলছে কী পড়তে হবে এবং কেন পড়তে হবে। এ সময়ে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এবং প্রত্যেক শিক্ষককে জানতে হবে চাহিদাগুলো কী এবং তার জন্য কী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সব শ্রেণির শিক্ষকদের সুশিক্ষার আওতায় আনতে এবং তা বাস্তবায়ন করতে হলে বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প নেই। দেশের সব শিশু শিক্ষা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তরের শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রদান ও গ্রহণের একটি সমন্বিত কার্যক্রম থাকবে। যেখানে দেশ-বিদেশের বড় বড় কোম্পানি বা সংস্থার মালিক বা সিইও, কর্মকর্তা, গবেষক, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকেরা একত্র হয়ে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষকদের পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধি ও যুগোপযোগীকরণে সহায়তা দান করা।
এ ছাড়া শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব, উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি এবং নেতৃত্বের গুণাবলি জাগ্রত করা, নতুন নতুন শিক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষতা ও কৌশল বৃদ্ধি করা হবে এই বিশেষায়িত শিক্ষা প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য। এটি একটি নতুন চিন্তাধারাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা, যা সব শিক্ষকের জন্য একটি মিলনকেন্দ্র হতে পারে। তাই শিক্ষাদানে শিক্ষার পরিবর্তন আনতে না পারলে বদলে থাকবে নতুন প্রজন্ম আর দিনে দিনে নিভে যাবে সব আশার আলো।
এমন অবস্থায় শিশুশিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ে কড়া নজর দিতে হবে, কী শিক্ষা, কেন শিক্ষা, শিক্ষার উদ্দেশ্য কী এবং তা কীভাবে মনিটরিং করতে হবে ইত্যাদি। শিশু বিদ্যালয়, শিশুদের জন্য অনুকূল এবং অনুসন্ধানের জায়গা, সে ক্ষেত্রে এই শিক্ষালয়ে থাকতে হবে শিশু মনোবৈজ্ঞানিক, সমাজকর্মী, দূরদর্শী, বিজ্ঞানমনস্ক ও বিজ্ঞানমুখী শিক্ষা প্রশিক্ষক যেখানে চর্চা ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে শিশুদের জীবন এবং জীবনের শুরুতে। পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধি ও যুগোপযোগীকরণে সহায়তা দান করা, শিক্ষকদের ব্যক্তিত্ব, উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি এবং নেতৃত্বের গুণাবলি জাগ্রত করা। নতুন নতুন শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষতা ও কৌশল বৃদ্ধি করা, দায়িত্ব ও কর্তব্য সচেতন থেকে কার্যসম্পাদনের জন্য শিক্ষকদের উৎসাহিত করা হবে। Value of teaching is learning from learners—অর্থাৎ শিক্ষাদানের প্রকৃত মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও শেখেন। আর সেই প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে প্রশিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক মাধ্যম।
আছে কি বাংলাদেশের শিশু বিদ্যালয়ে এমন কোনো শিক্ষক বা শিক্ষাপদ্ধতি চালু, যেখানে চর্চা হচ্ছে এমন মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা? আছে কি? বা সেভাবে তৈরি হচ্ছে কি তেমন শিক্ষক, যিনি পারবেন মোকাবিলা করতে ভবিষ্যতের এই শিক্ষাব্যবস্থাকে? তাহলে কি আমরা যেভাবে আছি ঠিক সেভাবেই থাকব? নাকি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন প্রজন্মকে শুধু বাংলাদেশি নয় গোটা বিশ্বের নাগরিক করে গড়ে তুলব সুশিক্ষার মাধ্যমে? প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ধারার একমাত্র বাহক শিক্ষক সমাজই যদি মজবুত না হয়, শিক্ষার্থী নামক বাহনের আরোহীরা কি নির্ভয়ে শিক্ষা নামক বৈতরণী পারি দিতে পারবেন?
সে প্রশ্ন সব নাগরিকের, সব অভিভাবকের। আমরা জানি, শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য দরকার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। গতানুগতিক, অসম্পূর্ণ, সনদসর্বস্ব, তৃতীয় বিভাগপ্রাপ্ত, ব্যবহারিক শিক্ষা অপূর্ণ, মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল এবং পুরোনো পরীক্ষার পদ্ধতি অনুসারী, তাই আশানুরূপ ফল লাভ হচ্ছে না। শিক্ষক-শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের শিখন-শেখানো কলাকৌশল সম্পর্কে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা। শিক্ষকদের পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধি করা এবং সময়ের সঙ্গে যুগোপযোগীকরণে সহায়তা দান করা, শিক্ষকদের মধ্যে ব্যক্তিত্ব, উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি এবং নেতৃত্বের গুণাবলি জাগ্রত করা। নতুন নতুন শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে দক্ষতা ও কৌশল বৃদ্ধি করা, দায়িত্ব ও কর্তব্য সচেতন থেকে কার্যসম্পাদনের জন্য শিক্ষকদের উৎসাহিত করা ইত্যাদি।
উল্লিখিত আলোচনার মাধ্যমে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার যে বাংলাদেশে সুশিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, নিয়ত প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ফলাফল খুবই জরুরি। দেশে তার জন্য পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে আলাদা আলাদাভাবে কিছু শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও সেগুলো দেশে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। আবার শিশু বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরের শিক্ষকদের জন্যও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ফলে দিনে দিনে শিক্ষকদের হাত বাঁধা পড়ছে না শিক্ষার মান। তাই দেশের জনসংখ্যাকে দ্রুত জনসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষা ও উন্নয়ন নামে একটি করে প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা দেখাশোনার জন্য জেলা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাফিলিয়েট কর্তৃপক্ষ হিসেবে আছে শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বিদ্যমান শিক্ষা কাঠামোগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের তেমন ব্যবস্থা নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হয় না। ফলে প্রশিক্ষণ যতটুকু দেওয়া হচ্ছে তারও প্রয়োগ তেমন হচ্ছে না।
শিশুদের প্রথম ১ থেকে ১৫ বছরের মধ্যের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মানবতার ফসল আনতে হলে শিক্ষার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে এবং একই সঙ্গে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরে এবং পর্যায়ক্রমে গড়ে তুলতে হবে। সুপ্রশিক্ষণ যেখানে থাকতে হবে earning by learning process, follows by rules and regulation without corruption or interruption।
আমরা বাংলাদেশিরা ধ্যানজ্ঞান কোনো অংশেই খারাপ নয় অন্য জাতির থেকে, আমরা সব পারি। দুঃখের বিষয় দায়বদ্ধ ও কর্তব্যশীল ম্যানেজমেন্টের অভাবে আজ শিক্ষা এই অবস্থানে এসেছে কিন্তু একই সঙ্গে আমরা এই অবস্থানকে শনাক্ত করতে পেরেছি। অতএব, এখন সমাধানের সময়। তাই আর দেরি না করে এই বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে তৈরি করতে হবে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক। বর্তমান যেসব বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারা জানে না কী ধরনের শিক্ষা দেওয়া দরকার একজন শিশু বিদ্যালয়ের শিক্ষকের। পুরো শিক্ষাচক্র খুঁজলে পাওয়া যাবে না উপযুক্ত শিক্ষক, শিশু প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি।
অতএব, সময় এসেছে ভেবে দেখার মানুষ গড়ার কারিগর হতে হলে নিজেকে আগে পূর্ণ মানুষ হিসেবে তৈরি করতে বা হতে হবে। মানুষের মতো দেখতে হলেই মানুষ গড়ার কারিগর হওয়া যায় না। তার জন্য দরকার mission, vision, policy সঙ্গে devotion, passion, motivation, goals, objectives and action। এবং এর জন্য দরকার learning from learners and learning by doing tools।
জানি না কত শত হাজার শিক্ষক বর্তমানে রয়েছেন সারা বাংলাদেশে, যাঁদের এ ব্যাপারে কোনো ধারণাই নেই আমি যা ভাবছি, সে বিষয়ে। তবে তাদের দ্রুত এই বিশেষায়িত শিক্ষা প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় এনে কাজের মাধ্যমে চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ করে মানুষ গড়ার কারিগর করতে হবে এবং তবেই সম্ভব দেশে সুশিক্ষা ফিরিয়ে আনা। আমি এর আগে লিখেছি ডিজিটালাইজেশন, management by objectives, hire and fire concept প্রয়োগ করতে হবে এই মুহূর্তে এবং তা করতে হবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রদবদল করতে হবে প্রথমে এবং জনগণের মনোনীত প্রার্থী স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে এ কাজ শুরু করতে হবে।
চাহিদাভিত্তিক ও যুগোপযোগী সুশিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন একটি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র এবং সুশিক্ষিত কারিগর, যারা শিশুশিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পুরো শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনে সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সক্ষম। এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশ, তুমি কি প্রস্তুত?
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন