৩০ বছর আগের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে শফিকুল ইসলামের
· Prothom Alo

কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে নামাজ আদায়ের জন্য প্রতিবছর দেশ–বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লির সমাগম ঘটে। অনেকে জীবনে একবার হলেও শোলাকিয়ায় নামাজ পড়ার স্বপ্নও দেখেন। তেমনি একজন সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দা মাদ্রাসা শিক্ষক শেখ শফিকুল ইসলাম (৫৬)। গত বুধবার ইফতারের পর সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ থেকে শোলাকিয়ার উদ্দেশে বাসে রওনা হয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কিশোরগঞ্জ শহরে এসে পৌঁছান।
কিশোরগঞ্জে পৌঁছেই শফিকুল ইসলাম প্রথমে তাঁর স্বপ্নের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ ঘুরে দেখেন। এরপর বিকেলে মাঠের কাছে চর শোলাকিয়া বাগে জান্নাত মসজিদে আসেন। সেখানেই রাত যাপন করেন। দূরদূরান্ত থেকে যাঁরা শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ পড়তে আসেন, তাঁদের রাতযাপনের জন্য বাগে জান্নাত মসজিদকে মাঠ কমিটির পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে।
Visit iwanktv.club for more information.
শেখ শফিকুল ইসলাম৩০ বছর আগে ছাত্র অবস্থায় পত্রপত্রিকায়, রেডিও আর বিটিভিতে যখন শোলাকিয়ায় দেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামায়াতের কথা শুনতাম, সেই থেকে স্বপ্ন ছিল জীবনে একবার হলেও শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করব।সেখানে গতকাল বিকেলে কথা হয় শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘৩০ বছর আগে ছাত্র অবস্থায় পত্রপত্রিকায়, রেডিও আর বিটিভিতে যখন শোলাকিয়ায় দেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামায়াতের কথা শুনতাম, সেই থেকে স্বপ্ন ছিল জীবনে একবার হলেও শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করব। বেশ কয়েকবার চেষ্টাও করেছি। কিন্তু আসা হয়নি। দীর্ঘদিন পরে হলেও এবার আমার আশা পূরণ হতে যাচ্ছে। সে জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি।’
কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে এবার ১৯৯তম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবেকিশোরগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর মো. সুলতান উদ্দিন জানালেন, শুধু শফিকুল ইসলাম নন, এ রকম অনেকের স্বপ্ন থাকে বৃহত্তম ঐতিহাসিক ঈদগাহ শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করার। যে জন্য দেশের দূরদূরান্তসহ বিদেশ থেকেও অনেকে দুই-তিন দিন আগেই শোলাকিয়ায় নামাজ পড়তে চলে আসেন। একসময় দূর থেকে আসা মুসল্লিরা সবাই শোলাকিয়া মাঠের মিম্বরেই অবস্থান করতেন। কিন্তু ২০১৬ সালে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন শোলাকিয়া মাঠের অদূরে জঙ্গি হামলার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে এখন আর কাউকে মাঠের ভেতর থাকতে দেওয়া হয় না। প্রশাসন থেকে শোলাকিয়া বাগে জান্নাত গোরস্তান মসজিদ, পার্শ্ববর্তী আজিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়সহ কয়েকটি জায়গায় দূরের মুসল্লিদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
সুলতান উদ্দিন বলেন, ‘অনেকে মাঠের আশপাশের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ওঠেন। যেগুলো আমরা জানি না। তবে যাঁরা বাগে জান্নাত মসজিদে আসেন, তাঁদের ব্যাপারে আমরা খোঁজখবর রাখি। এভাবেই শোলাকিয়ায় দিন দিন মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
কথা হয় কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের সাঁতারপুর এলাকার বাসিন্দা বৃদ্ধ আবদুর রহিমের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ৭০ বছর ধরে নিয়মিত শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে নামাজ আদায় করে আসছেন। ছোটবেলায় দাদা ও বাবার সঙ্গে নামাজ পড়তে আসতেন। আর এখন তিনি নিজ সন্তান ও নাতিদের সঙ্গে নিয়ে নামাজে আসেন।
আবদুল জলিল নামের একজন বললেন, ‘শোলাকিয়ায় নামাজ আদায় করতে না পারলে অতৃপ্তি থেকে যায়, যেটা আমরা ছয় বছর আগে করোনা মহামারির সময় টের পেয়েছি। কারণ, সেই বছর সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমরা নামাজ আদায় করতে পারিনি। তবে এর আগে ও পরে নিয়মিত নামাজ আদায় করেছি।’
আবদুল জলিলের মতো পুরোনো মুসল্লিদের আক্ষেপ, এই শোলাকিয়ায় দিন দিন মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও দৃশ্যত তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। মাঠের দক্ষিণ পাশের সীমানাপ্রাচীর। মাঝখানে মাইকের জন্য কয়েকটি কংক্রিটের পিলার ছাড়া আর তেমন কিছু হয়নি। মাঠের জন্য এক ইঞ্চি জায়গাও বাড়ানো হয়নি। অথচ দিন দিন মুসল্লির সংখ্যা বেড়েই চলছে। গতবার মনে হয় পাঁচ থেকে ছয় লাখ মুসল্লি হয়েছে। এবার আরও বাড়তে পারে। মাঠের জায়গা বাড়ানোটা এখন সময়ের দাবি।
প্রায় তিন লাখ মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। কিন্তু প্রতি ঈদের সময় মুসল্লির সংখ্যা এত বেশি থাকে, যা ঈদগাহে ধরে না। মাঠ পরিপূর্ণ হয়ে চারপাশের রাস্তা এবং আশপাশের খোলা জায়গা, নদীর পাড়, বাড়ির ছাদ, উঠানেও অনেকে ঈদের নামাজ আদায় করেন। এভাবেই জনস্রোতে রূপ নেয় শোলাকিয়া। এতে ধারণা করা হয়, প্রতিবছর ঈদুল ফিতরে ঐতিহাসিক এ মাঠে পাঁচ থেকে ছয় লাখ মুসল্লির সমাগম ঘটে।
ঈদুল ফিতরের জামাতের জন্য প্রস্তুত কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানবরাবরের মতো এবারও ঈদুল ফিতরের জামাতের জন্য শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এবার সেখানে ১৯৯তম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। মুসল্লিদের জন্য এ বছর পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা দেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে জামাত আদায়ের সুবিধার্থে পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে মাঠ। সারির দাগ কাটা হয়েছে। সীমানাপ্রাচীরসহ মাঠের ভেতরের গাছগুলোকে রং করা হয়েছে। মিম্বরের চারপাশে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থায়ী অজুখানার পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে অস্থায়ী অজুখানা। সুপেয় পানির জন্য মাঠের বিভিন্ন স্থানে ও আশপাশে স্থাপন করা হয়েছে টিউবওয়েল ও পানির ট্যাংক। স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী টয়লেটের ব্যবস্থা। এ ছাড়া মুসল্লিদের স্বাগত জানানোর জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বেশ কয়েকটি তোরণ। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে আগত মুসল্লিদের সুবিধার্থে ঈদের দিন কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও ভৈরব-কিশোরগঞ্জ লাইনে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দুটি স্পেশাল ট্রেন চলাচল করবে।
জনশ্রুতি আছে, মোগল আমলে এখানকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল শ লাখ টাকা। মানে এক কোটি টাকা। কালের বিবর্তনে শ লাখ থেকে বর্তমান শোলাকিয়া হয়েছে। অন্য আরেকটি বিবরণে আছে, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেই থেকে ঈদগাহটি একসময় শোয়ালাকিয়া ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ‘কিশোরগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য’ বইয়েও এ দুটি বর্ণনা আছে।