মিয়ানমার-মণিপুরের ‘গৃহযুদ্ধ’: চীন-ভারতের কার জয় কার পরাজয়

· Prothom Alo

ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে দীর্ঘ সংকট তৈরি হয়েছে। একদিকে মিয়ানমারের প্রলম্বিত গৃহযুদ্ধ, অন্যদিকে ভারতের কঠোর সীমান্তনীতি ও ৪ বিলিয়ন ডলারের কাঁটাতার প্রকল্প—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সেখানকার জাতিগোষ্ঠীগুলো। মিয়ানমার সীমান্তে চীন ও ভারতের ভূরাজনৈতিক লড়াই এ অঞ্চলে কী নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে তা নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন আলতাফ পারভেজ। তাঁর দুই পর্বের লেখার এটি শেষ পর্ব।

Visit turconews.click for more information.

গত লেখায় আমরা দেখিয়েছিলাম, ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের দুদিকের সাতটি রাজ্যে কেন সামাজিক অসন্তোষ বাড়ছে এবং তাতে কীভাবে নয়াদিল্লির আসিয়ানমুখী অগ্রযাত্রায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন, আরাকানে রাখাইনদের স্বরাজচেষ্টাও ভারতের ‘লুক ইস্ট’ নীতিকে বিপদে ফেলেছে। চিন ও আরাকান প্রদেশের সশস্ত্রতায় সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে তাদের বহুল আলোচিত কলকাতা থেকে মিজোরামমুখী ‘কালাদান ট্রানজিট’ উদ্যোগও। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করেও প্রত্যাশিত সময়ে এই প্রকল্প সমাধা করতে পারছে না তারা।

ভারতের জন্য বিশেষভাবে হতাশার দিক আরাকানের সিত্তিউই বা আকিয়াবকেন্দ্রিক তাদের ট্রানজিট প্রকল্পে অনিশ্চয়তার মধ্যেই গণচীন পাশের চাইয়াকফু থেকে ইউনান পর্যন্ত ট্রানজিট উপভোগ করছে নির্বিঘ্নে। এমনকি তারা চীন-মিয়ানমার রেল করিডর গড়ার লক্ষ্যে ইউনান প্রদেশের ঢালি থেকে মিয়ানমারের উত্তর শানসংলগ্ন রুইলি পর্যন্ত ৩৩০ কিলোমিটার রেলপথের কাজও প্রায় শেষ করে এনেছে। দুর্গম পাহাড়ি পথে বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম কষ্টকর নির্মাণযজ্ঞ ছিল এটা। এই রেল এখন মান্দালে হয়ে

গত লেখায় আমরা দেখিয়েছিলাম, ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের দুদিকের সাতটি রাজ্যে কেন সামাজিক অসন্তোষ বাড়ছে এবং তাতে কীভাবে নয়াদিল্লির আসিয়ানমুখী অগ্রযাত্রায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন, আরাকানে রাখাইনদের স্বরাজচেষ্টাও ভারতের ‘লুক ইস্ট’ নীতিকে বিপদে ফেলেছে। চিন ও আরাকান প্রদেশের সশস্ত্রতায় সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে তাদের বহুল আলোচিত কলকাতা থেকে মিজোরামমুখী ‘কালাদান ট্রানজিট’ উদ্যোগও। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করেও প্রত্যাশিত সময়ে এই প্রকল্প সমাধা করতে পারছে না তারা।

ভারতের জন্য বিশেষভাবে হতাশার দিক আরাকানের সিত্তিউই বা আকিয়াবকেন্দ্রিক তাদের ট্রানজিট প্রকল্পে অনিশ্চয়তার মধ্যেই গণচীন পাশের চাইয়াকফু থেকে ইউনান পর্যন্ত ট্রানজিট উপভোগ করছে নির্বিঘ্নে। এমনকি তারা চীন-মিয়ানমার রেল করিডর গড়ার লক্ষ্যে ইউনান প্রদেশের ঢালি থেকে মিয়ানমারের উত্তর শানসংলগ্ন রুইলি পর্যন্ত ৩৩০ কিলোমিটার রেলপথের কাজও প্রায় শেষ করে এনেছে।

দুর্গম পাহাড়ি পথে বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম কষ্টকর নির্মাণযজ্ঞ ছিল এটা। এই রেল এখন মান্দালে হয়ে আরাকানে চলে এলে ইউনান প্রদেশের সঙ্গে চাইয়াকফু হবে কয়েক ঘণ্টার পথ। মিয়ানমারে জান্তা নির্বিঘ্নে নির্বাচন করে ফেলায় বেইজিং অবিশ্বাস্য ধাঁচের এই প্রকল্প নিয়ে আবারও ভাবছে। বিপরীতে নয়াদিল্লি এবং মিজোরামের অনেকের প্রত্যাশা, দুই বছরের মধ্যে কালাদান নদীভিত্তিক কলকাতা-আরাকান-মিজোরাম ট্রানজিট শুরু হবে; কিন্তু কার্যত এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আরাকান-চিন সামরিক জোনে শান্তি আসবে কি না, তার ওপর।

ভারতীয় কালাদান প্রকল্পের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট চিন প্রদেশের পালেতোয়া শহর। জায়গাটি বান্দরবানের খুব কাছে। রাখাইন ও খুমিদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আছে এই শহরের দখল নিয়ে। এখানে তাতমা-দ, রাখাইন ও খুমিদের ত্রিমুখী সংঘাতে ভারতীয় ট্রানজিট রুটের রাস্তা বানানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। আবার বানানো গেলেও এটা সর্বাবস্থায় সচল রাখা ভবিষ্যতে কঠিন হবে।

মাঠে সামরিক সংঘাতের কারণে আরাকানের সিত্তিউই থেকে ভারতীয় কর্মকর্তাদের কিছুদিন আগে রেঙ্গুনে সরিয়ে নিতে হয়েছে। আরাকান-চিন অঞ্চলে সহিংসতা অব্যাহত থাকায় কালাদান প্রকল্প ছাড়াও ভারত মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যেও বেশ মুশকিলে আছে। আরাকানের চলমান সংঘাতে গণচীনের নিষ্ক্রিয় ভঙ্গির এসবও কিছু কারণ।

সেভেন সিস্টার্স ও মিয়ানমার সীমান্ত: উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও জটিল সংকট

মণিপুরের সহিংসতা যেভাবে জটিলতা বাড়াল

মিয়ানমার ও ভারত উভয় দেশের মধ্যে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার সমান ব্যবসা-বাণিজ্য হলেও তাতে ভারতের হিস্যা কম। মিয়ানমার থেকে আমদানি বেশি। সীমান্ত বাণিজ্যচুক্তিতে আছে যারা এখান দিয়ে ব্যবসা করবে, তাদের আমদানি-রপ্তানি দুটিই করতে হবে। এই নিয়মের কারণে সীমান্তে অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা বেশি হচ্ছে।

আবার কাঁটাতার বসানো যত বাড়ছে, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যও তত কমছে। আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য কমার একটা বড় ক্ষতি হলো মূল ভারত থেকে বহু দূরে পড়ে থাকা সীমান্তবর্তী এসব রাজ্যে অর্থনৈতিক দুরবস্থা বেড়ে যাওয়া। পণ্য বেচাবিক্রির সুযোগ কমে যাচ্ছে দেখে বিনিয়োগকারী উদ্যোক্তাও কম।

২০২৬ জানুয়ারিতে ভারত ও মিয়ানমারের সরকারি পর্যায়ের এক বৈঠকের মাধ্যমে আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে, ব্যবসার চলতি অঙ্ককে উভয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করবে। বাস্তবতা এই আশাবাদের সঙ্গে মেলে না। বিশেষ করে মণিপুরের কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি জটিল চেহারা নিয়েছে।

প্রায় আড়াই বছর ধরে মণিপুরে অশান্তি চলছে। মাঝখানে কিছুদিন রাষ্ট্রপতির শাসনও ছিল। সেখানকার সংঘাত কুকি আর মেইতেইদের মধ্যে হলেও নয়াদিল্লিতে অনেকে মনে করে, মিয়ানমারের চিন প্রদেশের অস্থিরতার সঙ্গে এর যোগ আছে। মণিপুরের কুকিরা চিনের মানুষদের মদদ পাচ্ছে। এটা অস্বাভাবিকও নয়। কারণ, ‘পেমবার্টন লাইনে’ ভাগ হয়ে থাকলেও উভয়ে তারা একই জাতি। ঐতিহাসিক এই যোগাযোগ নয়াদিল্লির জানা। এ কারণেই তারা এখন সীমান্তে যাতায়াত সংকোচন করতে চাইছে।

মণিপুরের কুকি গেরিলা ছাড়াও নয়াদিল্লি অসমিয়া উলফার দলছুট একাংশ নিয়েও এই সীমান্তে উদ্বিগ্ন থাকে। গত বছর জুলাইয়ে সীমান্তের অপরদিকে এক গোপন অভিযানে ভারতের কমান্ডোরা উলফার পরেশ বড়ুয়া গ্রুপের একটি ক্যাম্প ধ্বংস করে। তখন বিষয়টা অস্বীকার করা হলেও সেই অভিযানের প্রধান আদিত্য শ্রীকুমারকে এ বছর রাষ্ট্রীয় সামরিক পদক দেওয়ার মাধ্যমে সরকারিভাবে ব্যাপারটা স্বীকার করা হলো। লক্ষ করার মতো বিষয়, নেপিদো তার ভূখণ্ডে ভারতীয়দের এই অভিযানে তেমন আপত্তি তুলছে না। এটা সীমান্তবর্তী স্বাধিকারপ্রত্যাশী জাতিগুলোর বিষয়ে নয়াদিল্লি-নেপিদোর একক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত মিলে।

মণিপুরে যে কারণে আলোচনায় ‘জালেন-গাম’

এই সীমান্তের মণিপুর অংশে কুকি ও নাগারা সংখ্যায় ৩৫ শতাংশের মতো। তবে রাজ্যের রাজধানীতে নয়, মূলত চারপাশের পাহাড়ি এলাকায় থাকে তারা। অন্যদিকে রাজধানী ইম্পলে বসবাসকারী মেইতেইরা সংখ্যায় বেশি হলেও রাজ্যের মাত্র ১০ শতাংশ সমতলে প্রভাবশালী তারা। নয়াদিল্লির এখনকার শাসকদের সঙ্গে সনাতন ধর্মাবলম্বী মেইতেদের বেশ মিত্রতা। এই উভয়ের ওপর ক্ষুব্ধ খ্রিষ্টান কুকিরা। সেই ক্ষোভের প্রতি সংহতি আছে মিজোরাম ও পার্শ্ববর্তী চিনের মানুষদের। মণিপুর, মিজোরাম ও চিনের কুকিদের বন্ধনের জায়গা কেবল ভাষা-সংস্কৃতি নয়, ধর্মও।

মণিপুরে মেইতেই বনাম কুকি সহিংসতা মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে নয়াদিল্লির অবকাঠামো উন্নয়ন তৎপরতায় বেশ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা আবার পরোক্ষে গণচীনের জন্য সন্তোষজনক। তাতে মিয়ানমারের চিন, কাচিন, সাগাইং ব্যবসা-বাণিজ্যে ভারতমুখী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে না। ভারতের আসিয়ানমুখী হওয়াও গতি পাবে কম।

মণিপুরের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত হলো প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। প্রাচীর উঠছে এখানেও। কুকি ও নাগাদের সঙ্গে মেইতেইদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে এই সীমান্তে। মেইতেই সশস্ত্র সংগঠনগুলো এই সীমান্তে মিয়ানমারের জান্তাকে সহায়তা দিয়ে থাকে।

সীমান্ত–সংলগ্ন সাগাইংয়ের তামুতে নেপিদো বিরোধীদের দমনে তাতমা-দকে সহায়তা দিচ্ছে মেইতেইরা। তামু হলো মণিপুরের মোরহের উল্টোদিকের মিয়ানমারের জনপদ। মোরেহ্-তামু সংযোগ দিয়েই ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্যের বড় অংশ হয়। এখন থেকে থাইল্যান্ডের মায়ে-চোট পর্যন্ত হাইওয়ে তৈরির স্বপ্ন ভারতের বহু পুরোনো। কিন্তু মিয়ানমার ও মণিপুরের গৃহযুদ্ধ তাতে বাদ সেধেছে।

মণিপুরের মেইতেইরা এখন বিজেপির ঘনিষ্ঠ হলেও একদা তারা নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়েছিল হাতে। তাদের জাতিরই একাংশ সাগাইংয়ের তামু এবং চিন প্রদেশের তনজাং টাউনশিপ এলাকায় থাকে। মেইতেইদের সেখানে কাথেও বলা হয়। উভয় অঞ্চলের এই মেইতেইদের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ব্যাপক। মিয়ানমারভুক্ত মেইতেইরা তাতমা-দকে সহায়তার বিনিময়ে কিছু সুযোগ-সুবিধা পায়। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা চিন, সাগাইং এলাকায় তার বিরোধী গণতন্ত্রপন্থীদের সম্পর্কে তথ্যের জন্য ভারতীয় মেইতেই গেরিলাদের ব্যবহার করে। এ রকম অন্তত ছয়টি মেইতেই গেরিলা গ্রুপ আছে তামু-তানজংজুড়ে।

মেইতেই, কুকি, তাতমা-দ এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের এ রকম বিবিধ টানাপোড়েনের অন্তত একটা পার্শ্বফল হলো সীমান্তজুড়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি, যা ভারতের ‘লুক-ইস্ট’ নীতির জন্য বৈরী অবস্থা তৈরি করেছে। এ অবস্থা রাষ্ট্র এবং স্থানীয় মানুষ—সবারই অর্থনৈতিক নাজুকতা বাড়াচ্ছে।

ভূরাজনীতির উত্তাপে স্থানীয় জনজীবন দুর্বিষহ

বহুকাল ধরে নিয়ম ছিল, ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী মানুষেরা চাইলে নিজ নিজ সরকারের একটা পারমিট নিয়ে অপর দেশের ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় ভিসা ছাড়াই চলাফেরা করতে পারবে। ১৯৫০ থেকে অনেক দিন এই সুবিধা ৪০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ৪৩টি এলাকা দিয়ে এই সুবিধা ভোগ করা যেত।

এটাকে উভয় দেশ কূটনৈতিক ভাষায় বলত ‘ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম’ বা এফএমআর। ২০০৪ সালে সুবিধাটা ১৬ কিলোমিটারে কমানো হয়। ২০২৪–এ ১০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়। এ সময় এ–ও নিয়ম করা হয়, ১০ কিলোমিটারের এই যাতায়াতের সুবিধাও কেবল অরুণাচলের পাঙসৌ বা নামপং, মণিপুরের মোরেহ এবং মিজোরামের জখহথর দিয়ে চলবে।

আবার আসা-যাওয়া করা ব্যক্তিদের বায়োমেট্রিক পরিচয়ও রাখা হবে। পাঙসৌ, মোরেহ ও জখহথর হলো ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক যোগাযোগের মূল তিন সীমান্তসূত্র। সর্বশেষ এফএমআর একদম বাতিল করে দেওয়া হলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায়। এই সিদ্ধান্ত মণিপুর সরকার মানলেও মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড তার বিরুদ্ধে। আবার বিষয়টা আন্তরাষ্ট্রীয় হলেও ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কিছু বলেনি।

নয়াদিল্লির জন্য মিয়ানমারে একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নির্বাচনী ব্যবস্থাই সুবিধাজনক। কিন্তু তাতমা-দ অদূর ভবিষ্যতে সে রকম কোনো রাজনৈতিক প্রকল্পে রাজি হবে, এমন লক্ষণ নেই।

যেসব জনপদের ওপর দিয়ে ‘পেমবার্টন লাইন’ চলে গেছে, মূলত তাদের সুবিধার জন্য এফএমআর নিয়ম ছিল। এফএমআর সুবিধার মাধ্যমেই এখানকার আদিবাসীদের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি টিকে ছিল। এক অঞ্চলের শিশুরা অন্য অঞ্চলের বিদ্যাপীঠে গিয়েছে এই আইনি সুবিধার মাধ্যমে। অর্থনৈতিক অবস্থা এবং শিক্ষায় এখানকার সীমান্তের উভয় দিকের মানুষ অনেক পিছিয়ে। ফলে এফএমআর তাদের জন্য অক্সিজেনতুল্য ছিল। কিন্তু এফএমআর সীমিত করার ব্যাপারে নয়াদিল্লি ও নাগপুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নেতাদের বড় ধরনের সম্মতি রয়েছে। তাঁদের এই সম্মতির কারণ বোঝা দুরূহ নয়।

প্রাচীরের কারণে ভুক্তভোগীরা মূলত সীমান্ত এলাকার আদিবাসী খ্রিষ্টান সমাজের। বাংলাদেশ থেকে যারা মিজোরামে আশ্রয় নিয়েছে, তারাও খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী। এই সীমান্তের দুই দিকের যাবতীয় অসন্তোষ ঘনীভূত হয়ে একটা খ্রিষ্টানরাষ্ট্র হতে পারে বলে ভারত-বাংলাদেশে-মিয়ানমারে মাঝেমধ্যেই রাজনৈতিক প্রচারণা দেখা যায়।

মণিপুরে কী ঘটছে, এত অস্ত্র আসছে কোথা থেকে

তিন দেশেই এই প্রচারকেরা কল্পিত দেশটি নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, ততটাই নীরব এখানকার সীমান্তজনদের সংকট-সমস্যায়। তবে তাদের প্রচারে বাস্তব তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি থাকলেও এটা সত্য, এখানকার সীমান্ত জনগোষ্ঠীগুলো চায় না তাদের ঐতিহাসিক পরিসরে কাঁটাতার বসুক। কারণ, স্মরণাতীতকাল থেকে তারা নানান দুর্যোগে-প্রয়োজনে একদিক থেকে আরেক দিকে যাওয়া-আসা করেছে এবং করে। বিশেষ করে নাগারা সীমান্তপ্রাচীরের খুবই বিরোধী।

ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ডের কাপলাং উপদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর মিয়ানমারে বলে ভারতীয়দের বিশ্বাস। তারা মনে করছে, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং শরণার্থীদের ঢেউ দেখিয়ে সীমান্তে কাঁটাতার বসিয়ে নয়াদিল্লির সরকার নাগাদের সশস্ত্র আন্দোলন কাবু করতে চায়। বর্তমানে উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোতে নাগাল্যান্ডে সশস্ত্র আন্দোলন সবচেয়ে শক্তিশালী।

নাগা বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, ‘ভারত মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধকে উপজীব্য করে সীমান্তের যেখানে কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে, সেটা আমাদের জমিন। আমাদের ঐতিহাসিক বাসস্থান। ব্রিটিশরা কৃত্রিমভাবে এখানে সীমানা বসিয়েছে।’

মণিপুরের মুসলমানদের কথা কেউ ভাবছে কি

নাগাল্যান্ডের অপর দিকে মিয়ানমারের সাগাইংয়ে প্রায় ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গায় ২৭০টি গ্রাম নিয়ে নাগাদের একটা স্বশাসিত অঞ্চল আছে। তবে নাগারা মনে করে, সেই অঞ্চলের বাইরেও মিয়ানমারে তাদের বহু জনপদ আছে।

অনেকগুলো ট্রাইবে বিভক্ত প্রায় ১০ লাখ নাগা আছে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে। ভারত সীমান্তের পুরোটায় কাঁটাতার বসালে নাগাল্যান্ড ও মণিপুরের স্বজাতি থেকে প্রায় চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে মিয়ানমারের নাগারা। স্বাভাবিকভাবেই সীমান্তের উভয় দিকের নাগা ও কুকিরা সীমানাপ্রাচীরের বাস্তবায়ন মেনে নিচ্ছে না। এর একটা ফল হচ্ছে, এসব অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠীর জনপদের ভেতর দিয়ে নয়াদিল্লির পক্ষে আসিয়ানমুখী যাত্রাপথ চালু করা দুরূহ। সীমান্তের মিয়ানমার অংশে গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনপন্থীদের সশস্ত্রতা থাকলেও ভারতের একই সমস্যা।

ফলে নয়াদিল্লির জন্য মিয়ানমারে একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও নির্বাচনী ব্যবস্থাই সুবিধাজনক। কিন্তু তাতমা-দ অদূর ভবিষ্যতে সে রকম কোনো রাজনৈতিক প্রকল্পে রাজি হবে, এমন লক্ষণ নেই।

এ বছরের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে রোহিঙ্গা নিধনের জন্য মিয়ানমারে সিনিয়র জেনারেলদের বিচারকাজ শেষ হবে। সেখানে যদি তারা দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে আসিয়ানের ওপর একটা চাপ তৈরি হবে এই সদস্যদেশটির শাসন পরিসরে পরিবর্তন বিষয়ে কথা বলতে। আসিয়ানের সে রকম কোনো উদ্যোগ হয়তো ভারতের নীরব সমর্থন পাবে। সমর্থন থাকবে যুক্তরাষ্ট্রেরও। নিশ্চিতভাবে তাতে এখনকার মতোই অনাগ্রহ থাকবে গণচীন ও রাশিয়ার। বৈশ্বিক মুরব্বিদের এ রকম ঠান্ডা যুদ্ধের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে থাকে নয়াদিল্লি, ঢাকা ও নেপিদো থেকে বহু দূরের ঘন সবুজ নাগা ও জো গ্রামগুলোর মানুষগুলো। অথচ একদা তারা নিজেরাই নিজেদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রক ছিল।

  • আলতাফ পারভেজ গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source