আর্টেমিস ২ মিশনে মহাকাশে কে কে যাচ্ছেন, সঙ্গে কী কী নিচ্ছেন

· Prothom Alo

অ্যাপোলো মিশনের পর দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে। চাঁদের কক্ষপথে মানুষের আনাগোনা যেন রূপকথার গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে এবার পুরোপুরি প্রস্তুত আর্টেমিস ২ মিশনের চার নভোচারী! তাঁরা শুধু তুখোড় পাইলট, ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানীই নন; তাঁরা কারও জীবনসঙ্গী, কারও বাবা কিংবা মা। মহাকাশের ভয়ংকর ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের দুঃসাহসিক স্বপ্ন ও পরিবারের প্রতি ভালোবাসার এক দারুণ ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছেন তাঁরা।

আপনি হয়তো ভাবছেন, এত বড় মিশনে যাওয়ার সময় একজন নভোচারী ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য মহাকাশযানে কী নিয়ে যেতে পারেন? সেই প্রশ্নের উত্তরই থাকছে এই লেখায়।

Visit sportfeeds.autos for more information.

চাঁদের উদ্দেশ্যে আর্টেমিস ২ উৎক্ষেপণ করা হবে মার্চে
রিড ওয়াইজম্যান মনে করেন, মহাকাশের মতো জীবনের পরের দিনটিও যেহেতু অনিশ্চিত, তাই সব পরিবারেরই এমন খোলামেলা আলোচনা করা উচিত।

কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান: সিঙ্গেল ফাদারের মহাকাশযাত্রা

রিড ওয়াইজম্যান মার্কিন নৌবাহিনীর একজন সাবেক টেস্ট পাইলট। আপনি হয়তো জেনে মজা পাবেন, আকাশে উড়তে যাঁর এত ভালোবাসা, তাঁরই নাকি উচ্চতাভীতি আছে! ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে টানা ছয় মাস কাটানো এই অভিজ্ঞ নভোচারী এবার পুরো আর্টেমিস ২ মিশনের নেতৃত্ব দেবেন।

তবে তাঁর জীবনের গল্পটা কিছুটা বেদনার। ২০২০ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি তাঁর স্ত্রীকে হারান। এরপর থেকে দুই কিশোরী মেয়েকে তিনি একাই বড় করছেন। সিঙ্গেল ফাদার হিসেবে মহাকাশযাত্রার চরম ঝুঁকির কথা তিনি তাঁর মেয়েদের কাছে কখনোই লুকাননি।

মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক টেস্ট পাইলট রিড ওয়াইজম্যান

একবার মেয়েদের সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়ে তিনি পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ‘শোনো, এখানে আমাদের ইচ্ছাপত্র রাখা আছে, এখানে আছে ট্রাস্টের কাগজপত্র। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে তোমাদের এই এই কাজ করতে হবে।’

তিনি মনে করেন, মহাকাশের মতো জীবনের পরের দিনটিও যেহেতু অনিশ্চিত, তাই সব পরিবারেরই এমন খোলামেলা আলোচনা করা উচিত।

চাঁদের পথে ব্যক্তিগত জিনিস হিসেবে তিনি নিজের সঙ্গে নিচ্ছেন ছোট্ট একটি নোটপ্যাড! পুরো মিশনে মহাকাশ থেকে তাঁর মনের মধ্যে যা যা অদ্ভুত সুন্দর ভাবনা আসবে, তিনি চাইছেন সব ওই ছোট্ট খাতায় লিখে রাখতে।

আর্টেমিস প্রোগ্রামের আদ্যোপান্ত
২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে টানা ছয় মাস কাটানো অভিজ্ঞ নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান এবার পুরো আর্টেমিস ২ মিশনের নেতৃত্ব দেবেন।

মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ: চাঁদের পথে প্রথম নারী

ইঞ্জিনিয়ার এবং পদার্থবিদ ক্রিস্টিনা কোচ মহাকাশবিজ্ঞানে একটি পরিচিত নাম। ২০১৯ সালে স্পেস স্টেশনে টানা ৩২৮ দিন কাটিয়ে তিনি নারী হিসেবে সবচেয়ে দীর্ঘ মহাকাশযাত্রার রেকর্ড গড়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, প্রথম সম্পূর্ণ নারী দলের স্পেসওয়াকের অংশও ছিলেন তিনি। আর এবার তিনি হতে যাচ্ছেন চাঁদের দিকে পাড়ি জমানো ইতিহাসের প্রথম নারী!

ছোটবেলায় অ্যাপোলো ৮ মিশন থেকে তোলা চাঁদের দিগন্ত দিয়ে পৃথিবীর ওঠার সেই বিখ্যাত ছবিটি তাঁর বেডরুমের দেয়ালে ঝোলানো থাকত। সেই ছবি দেখেই তিনি নভোচারী হওয়ার স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছিলেন।

ইঞ্জিনিয়ার এবং পদার্থবিদ ক্রিস্টিনা কোচ

পৃথিবী থেকে দূরে যাওয়ার আগে তিনি তাঁর স্বামীকে মজার ছলে একটি কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে গেছেন। স্পেস স্টেশনে থাকার সময় যেমন হঠাৎ ফোন করে বলা যেত, কিন্তু চাঁদের পথে সেটা সম্ভব নয়। তিনি হেসে স্বামীকে বলেছেন, ‘বাসার আলমারিতে কোন জিনিস কোথায় রাখা আছে, তা খুঁজতে তুমি কিন্তু এবার আর আমাকে হুটহাট ফোন করতে পারবে না! তোমাকে নিজেই খুঁজে নিতে হবে।’

পৃথিবীর সঙ্গে মায়ার বাঁধন ধরে রাখতে ক্রিস্টিনা কোচ নিজের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর প্রিয়জনদের হাতে লেখা বেশ কিছু চিরকুট।

নাসার আর্টেমিস মিশন কী ও কেন
ক্রিস্টিনা কোচ হেসে স্বামীকে বলেছেন, ‘বাসার আলমারিতে কোন জিনিস কোথায় রাখা আছে, তা খুঁজতে তুমি কিন্তু এবার আর আমাকে হুটহাট ফোন করতে পারবে না! তোমাকে নিজেই খুঁজে নিতে হবে।’

মিশন স্পেশালিস্ট জেরেমি হ্যানসেন: চাঁদের পথে প্রথম কানাডিয়ান

কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন এই প্রথমবার মহাকাশে যাচ্ছেন। প্রথম যাত্রাতেই তিনি গড়ে ফেলছেন এক দারুণ ইতিহাস। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের প্রথম কোনো নাগরিক হিসেবে তিনি চাঁদের পথে পাড়ি দিচ্ছেন!

সাবেক এই ফাইটার পাইলট ব্যক্তিগত জীবনে তিন সন্তানের জনক। রকেট উৎক্ষেপণের সময় প্রচণ্ড শব্দ ও আগুনের ঝলকানি দেখে বাচ্চারা যেন ভয় না পায়, সে জন্য তিনি বড়দিনের ছুটিতে বাচ্চাদের নিয়ে আর্টেমিস ১-এর উৎক্ষেপণের ভিডিও দেখেছেন। তিনি তাদের বুঝিয়েছেন, কন্ট্রোল রুমে বিজ্ঞানীরা যখন সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন, তখন সেটা যতটা ভয়ের মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। এটি শুধু নিরাপত্তার খাতিরেই করা হয়।

জেরেমি হ্যানসেন

পরিবারের প্রতি ভালোবাসা থেকেই জেরেমি নিজের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন চাঁদের আকৃতির চারটি সুন্দর লকেট। স্ত্রী এবং তিন সন্তানের জন্য বানানো এই লকেটগুলোতে তাদের বার্থস্টোন বসানো আছে এবং তাতে খোদাই করে লেখা আছে ‘মুন অ্যান্ড ব্যাক’। আর কানাডিয়ান হিসেবে মহাকাশে তিনি নিজের সঙ্গে আরও নিচ্ছেন সুস্বাদু ম্যাপল সিরাপ ও ম্যাপল কুকিজ!

আর্টেমিস ৩ মিশনে চাঁদে যাচ্ছে না মানুষ, নাসার পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন
রকেট উৎক্ষেপণের সময় প্রচণ্ড শব্দ ও আগুনের ঝলকানি দেখে বাচ্চারা যেন ভয় না পায়, সে জন্য জেরেমি হ্যানসেন বড়দিনের ছুটিতে বাচ্চাদের নিয়ে আর্টেমিস ১-এর উৎক্ষেপণের ভিডিও দেখেছেন।

পাইলট ভিক্টর গ্লোভার: চাঁদের পথে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী

ভিক্টর গ্লোভার শুধু তুখোড় পাইলটই নন, তিনি হতে যাচ্ছেন চাঁদে ভ্রমণ করা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী। চার সন্তানের বাবা গ্লোভারকে বলা হয় এই দলের সবচেয়ে স্টাইলিশ মানুষ! কমলা রঙের ফ্লাইট স্যুটের সঙ্গে তাঁর ডিজাইনার ব্রাউন লেদার বুটের স্টাইল সত্যিই চোখে পড়ার মতো।

তাঁর একটি চমৎকার ডাকনাম আছে, আইক। এর মানে আই নো এভরিথিং, মানে আমি সব জানি! ফ্লাইট টেস্ট ইঞ্জিনিয়ারিং, সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মিলিটারি সায়েন্স—এই তিনটি বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি থাকার কারণেই সহকর্মীরা তাঁকে আদর করে এই নাম দিয়েছেন। মিশনের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি ১৯৬০-এর দশকের জেমিনি এবং অ্যাপোলো মিশনের পুরোনো জার্নালগুলো খুঁটিয়ে পড়ছেন, যাতে আগের দিনের পাইলটদের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন কিছু শেখা যায়।

ভিক্টর গ্লোভার হতে যাচ্ছেন চাঁদে ভ্রমণ করা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী

চাঁদের এই ঐতিহাসিক যাত্রায় গ্লোভার নিজের সঙ্গে নিচ্ছেন একটি বাইবেল, তাঁর বিয়ের আংটি, পারিবারিক কিছু স্মৃতিচিহ্ন এবং অ্যাপোলো ৯-এর নভোচারী রাস্টি শোয়েকার্টের লেখা অনুপ্রেরণামূলক উক্তির একটি সংগ্রহ।

নাসার একটি ভিডিওতে এই চারজন মিলে তাঁদের পুরো মিশনটিকে একটি চমৎকার বাক্যে তুলে ধরেছিলেন। ক্রিস্টিনা বলেছিলেন, ‘উই আর রেডি’। জেরেমি যোগ করেছিলেন, ‘উই আর গোয়িং’। গ্লোভার বলেছিলেন, ‘টু দ্য মুন’। আর সবশেষে কমান্ডার ওয়াইজম্যান বাক্যটি শেষ করেছিলেন এই বলে—‘ফর অল হিউম্যানিটি!’

লেখক: শিক্ষার্থী, জীববিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: বিবিসি ডটকমনাসার আর্টেমিস অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করল বাংলাদেশ

Read full story at source