গার্দিওলার মনে কী আছে, গার্দিওলাও জানেন না
· Prothom Alo

মাঠের ধারের সেই চিরচেনা দৃশ্য। গোল হওয়ার পর ডাগআউটে সেই অস্থির পায়চারি, কখনো বা শূন্যে ঘুষি মারা কিংবা ফুটবলারদের কানে কানে কোনো গূঢ় মন্ত্র জপে দেওয়া—গত এক দশকে ম্যানচেস্টার সিটির সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র তিনি। পেপ গার্দিওলা।
কিন্তু ইতিহাদ স্টেডিয়ামের বাতাসে এখন এক অন্য রকম গুঞ্জন। প্রশ্নটা বেশ পুরোনো, কিন্তু উত্তরটা এখনো কুয়াশাবৃত—পেপ কি থাকছেন? নাকি এক দশকের মায়া কাটিয়ে নীল জার্সিধারীদের বিদায় জানাবেন এই কাতালান কোচ?
Visit grenadier.co.za for more information.
চুক্তির এখনো এক বছর বাকি। কিন্তু গার্দিওলা ঘরানার ফুটবল যেমন ছকবাঁধা ব্যাকরণ মেনে চলে না, তাঁর জীবনের সিদ্ধান্তগুলোও তেমনই। শোনা যাচ্ছিল, আন্তর্জাতিক বিরতির ফাঁকেই হয়তো তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা ফয়সালা করে ফেলবেন। কিন্তু ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফ-এর খবর হলো, গার্দিওলা সিটির সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সেই বৈঠক পিছিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাড়াহুড়া করতে নারাজ। আগামী ১৬ মে এফএ কাপ ফাইনাল আর ২৪ মে প্রিমিয়ার লিগে অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে মৌসুম শেষ হবে। মে মাসের শেষেই তিনি আয়নার সামনে দাঁড়াবেন। নিজের ভেতরের তাড়নাটা দেখবেন সেখানে। তারপরই সিদ্ধান্ত—থাকবেন, নাকি ১০ বছরের মায়া কাটিয়ে নীল আকাশ ছেড়ে অন্য কোথাও উড়াল দেবেন।
কারাবাও কাপ জিতে ভীষণ উচ্ছ্বাস দেখান গার্দিওলাগত মাসে আর্সেনালকে হারিয়ে কারাবাও কাপ জেতার পর গার্দিওলার সেই বন্য উদ্যাপন দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে ৫৫ বছর বয়সী এই কোচের মনে বিদায়ের সুর বাজছে। যেন এক টগবগে তরুণ কোচ তাঁর প্রথম ট্রফি জিতলেন! কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। যদি এটাই তাঁর শেষ মৌসুম হয়, তবে খালি হাতে বিদায় নেওয়াটা কি মানায়? রিয়াল মাদ্রিদের কাছে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর যখন বলেছিলেন, ‘আগামী বছর এই দলটা আরও শক্তিশালী হবে’—অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, উত্তরসূরির জন্য একটা গোছানো ঘর রেখে যাওয়ার তৃপ্তি থেকেই হয়তো এমন বলেছেন।
রাফিনিয়া ২৮ দিনের বেশি মাঠের বাইরে থাকলেই প্রতিদিন ২৯ লাখ টাকা পাবে বার্সাসিটি কর্তৃপক্ষ গার্দিওলার ওপর কোনো চাপ দিচ্ছে না। পারস্পরিক আস্থার সম্পর্কটা এখানে খুবই জোরালো। গার্দিওলা কখনো কোনো ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি ভাঙেননি। বার্সেলোনা, বায়ার্ন—সব জায়গায় চুক্তি পূর্ণ করেছেন। তবে সিটির সঙ্গে তাঁর একধরনের ভদ্রলোকের চুক্তি আছে—যখন খুশি যেতে পারবেন। তাই তলে তলে প্রস্তুতি তো রাখতেই হয়। সিটির ফুটবল পরিচালক হুগো ভিয়ানা ইতিমধ্যেই একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করেছেন। সেখানে আছেন গার্দিওলারই সাবেক সহকারী এনজো মারেস্কা, বায়ার্ন মিউনিখের বর্তমান কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানি এবং গত বছর রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়া জাবি আলোনসো।
পেপ গার্দিওলা। ক্লাব ফুটবলের পাট চুকিয়ে কি কোনো জাতীয় দলের দায়িত্ব নেবেনগার্দিওলা যদি সিটি ছাড়েন, তবে তাঁর পরবর্তী গন্তব্য কোনো ক্লাব দল হবে না, এটা অনেকটা নিশ্চিত। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, ক্লাব কোচিংয়ে সিটিই তাঁর শেষ ঠিকানা। এরপর হয়তো ব্রাজিল কিংবা ইংল্যান্ডের মতো কোনো জাতীয় দলের ডাগআউটে দেখা যাবে তাঁকে। বিশেষ করে ব্রাজিলের সেই হলুদ জার্সিটার প্রতি তাঁর আজন্ম এক টান, এটাও জানিয়েছেন বিভিন্ন সময়। আবার গত কয়েক বছরে ইংল্যান্ডের সঙ্গে তাঁর যে টান তৈরি হয়েছে, তাতে টমাস টুখেলের চেয়ারে বসলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে যা–ই হোক না কেন, গার্দিওলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন—ইংল্যান্ডের অন্য কোনো ক্লাব তাঁর ছোঁয়া পাবে না।
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভিনি–ইয়ামাল ‘জোট’গার্দিওলা কি ইচ্ছা করেই এই অনিশ্চয়তা জিইয়ে রাখছেন? হতে পারে এটা তাঁর কোনো নতুন কৌশল। সিটির খেলোয়াড়দের মনে একটা প্রচ্ছন্ন ভয় বা জেদ ঢুকিয়ে দেওয়া যে ‘কোচের শেষ সময়, কিছু একটা করে দেখাতেই হবে’।
‘লং গুডবাই’ ফুটবলে অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। খোদ কিংবদন্তি স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন বলেছিলেন কথাটা। আগেভাগে বিদায়ের ঘোষণা দিলে দল ভেঙে পড়ে। খেলোয়াড়েরা হাল ছেড়ে দেন। গার্দিওলাও সেটা জানেন নিশ্চয়ই। তাই তাড়াহুড়া করে কিছু বলছেন না।
মে মাসের এক পড়ন্ত বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা তাই করতেই হচ্ছে।