জ্বালানিসংকট: যুদ্ধবিরতির সুফল পেতে সময় লাগবে
· Prothom Alo
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ কমে যায়, বেড়ে যায় দাম। দেশেও আমদানি করা জাহাজ আসা পিছিয়ে যেতে থাকে। কেউ কেউ সরবরাহ নিয়ে অপারগতা জানায়। বিকল্প উৎস থেকে দ্বিগুণ দামে কিনেও সরবরাহ ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। এক মাসেই জ্বালানি আমদানি করে লোকসান হয় ৯ হাজার কোটি টাকা।
যুদ্ধ থেমে গেলে জ্বালানি আমদানির খরচ কমতে শুরু করবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরদিনই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমতে শুরু করে। অবশ্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় এক দিন পরই দাম আবার বাড়ছে। ফলে যুদ্ধবিরতির সুফল পেতে সময় লাগবে; তাই এখনই স্বস্তি মিলছে না।
Visit zeppelin.cool for more information.
জ্বালানি বিভাগের দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সূত্র (ফর্মুলা) দেওয়া আছে। এতে তিন মাসের দামের গড় করে হিসাব করা হয়। এ হিসাবে এখন দাম কমলেও জুনের আগে সুফল মিলবে না। খোলাবাজার থেকে কিছুটা কম দামে কেনা যেতে পারে। এর পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম কমলে স্বস্তি তৈরি হবে। এতে আমদানি খরচ কমবে, ডলার সাশ্রয় হবে এবং ভর্তুকির ওপর চাপ কমবে। আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া কিছু করার নেই।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় এক দিন পরই দাম আবার বাড়ছে। ফলে যুদ্ধবিরতির সুফল পেতে সময় লাগবে; তাই এখনই স্বস্তি মিলছে না।রাজধানীর মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘলাইন। ৯ এপ্রিল ২০২৬, পরীবাগ
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ করেছে কাতার ও ওমান। আগামী ১৮ মে পর্যন্ত ওমান ও ১২ মে পর্যন্ত কাতার থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকবে। ঘাটতি পূরণে খোলাবাজার থেকে দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনছে সরকার। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১০ ডলার। এপ্রিলে প্রতিটি কেনা হয়েছে গড়ে ২০ ডলারের বেশি দামে। এর মধ্যে প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ২৮ দশমিক ২৮ ডলারে কেনা হয়েছে। এতে পেট্রোবাংলার লোকসান বাড়ছে। তবে যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনে গত বুধবার প্রতি ইউনিট ১৭ দশমিক ৯৯ ডলার দরে এক জাহাজ এলএনজি কেনার দরপ্রস্তাব পাওয়া গেছে।
একই দামে ৮টি জাহাজ কিনতে সরকারের সাশ্রয় হতে পারে ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। এপ্রিলে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। দাম কমার দিকে থাকলে মে মাসে ঘাটতি কমবে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, মে মাসে মোট ১১টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি চূড়ান্ত হয়ে গেছে। যুদ্ধ থেমে গেলে বাকি ৮টি কার্গো কম দামে কেনার সুযোগ তৈরি হবে। সর্বশেষ এটি কমে ১৬ ডলারে নেমে আসে বিশ্ববাজারে। এ দাম থাকলেও প্রতি ইউনিটে ৪ ডলার খরচ কমবে। এতে এক জাহাজ কিনতে সাশ্রয় হবে ১ কোটি ৩২ লাখ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় যা ১৬৫ কোটি টাকা (১২৫ টাকা ডলারের দর ধরে)। তার মানে একই দামে ৮টি জাহাজ কিনতে সরকারের সাশ্রয় হতে পারে ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। এপ্রিলে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। দাম কমার দিকে থাকলে মে মাসে ঘাটতি কমবে।
জ্বালানি তেল সংগ্রহের জন্য ফিলিং স্টেশনের সামনে লম্বা লাইন। বিজয় সরণী এলাকায়এলএনজি থেকে দিনে সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের অবকাঠামো আছে। এর জন্য মাসে ১১টি এলএনজি কার্গো (জাহাজ) আনতে হয়। এপ্রিলে আনা হচ্ছে ৯টি কার্গো। এর মধ্যে খোলাবাজার থেকে ৮ কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। আর কাতারের সঙ্গে দ্বিতীয় চুক্তির অধীনে অ্যাঙ্গোলা থেকে একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে। এত দিনে এলএনজি থেকে গড়ে ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। আগামী মাসে বাড়তি জাহাজ আমদানি হলে সরবরাহ বাড়বে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমযুদ্ধ থামলে সরবরাহ বাড়তে পারে, দামও কমবে। তবে জ্বালানির দাম আগের জায়গায় যেতে সময় লাগবে। হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক চালু হতে পারে। আগামী কয়েক মাসে জ্বালানি আমদানিতে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলার বাড়তি লাগতে পারে। যুদ্ধ থেমে গেলেও রেশ থেকে যাবে। মূল্যস্ফীতি বাড়ার গতি কিছুটা শ্লথ হতে পারে।জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় বিশ্ববাজারে দাম কমার কারণে আশা তৈরি হয়েছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার আবার অস্থিরতা দেখা গেছে। তাই সুফল পাওয়ার বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। এটি বুঝতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
তেলের দাম কমলে সুফল মিলবে
শুধু গ্যাস নয়, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেল খাতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেল বিক্রি করে এক দশক ধরে নিয়মিত মুনাফা করছে বিপিসি। গত অর্থবছরও ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে সংস্থাটি। এখন দ্বিগুণের বেশি দামে জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে। এর পরও এপ্রিলে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। এতে এক মাসেই বিপিসির লোকসান হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরীযুদ্ধবিরতির ঘোষণায় বিশ্ববাজারে দাম কমার কারণে আশা তৈরি হয়েছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার আবার অস্থিরতা দেখা গেছে। তাই সুফল পাওয়ার বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। এটি বুঝতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি তেল কেনা হয় পাঁচ দিনের দামের গড় ধরে। তাই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে দ্রুত সুফল পাওয়া যেতে পারে। জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি করা হয় ডিজেল। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রতি ব্যারেল ডিজেল আমদানি করা হয় গড়ে ৮৩ ডলার করে। মার্চে এটি বেড়ে হয় ১৮৬ ডলার। এপ্রিলে ডিজেলের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ২৮৪ ডলারে উঠেছিল। এরপর কিছুটা কমে হয় ২৪৭ ডলার। তবে যুদ্ধবিরতির খবরে এটি কমে ১৯০ ডলারে নেমে আসে। যদিও গতকাল জ্বালানি তেলের বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে।
বিশ্বের তেল ও জ্বালানি পণ্যের বাজারের দরদাম প্রকাশকারী শীর্ষ ওয়েবসাইট অয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য বলছে, বুধবার যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) দাম কমে ৯২ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছিল। গতকাল তা আবার ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলারের বেশি বেড়েছে। গতকাল বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে ১১টায় ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল উঠেছে ৯৭ ডলারে। যুদ্ধের আগে এ দাম ছিল ৭০ ডলার, যা একপর্যায়ে ১১৯ ডলারে ওঠে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, যুদ্ধ থামলে সরবরাহ বাড়তে পারে, দামও কমবে। তবে জ্বালানির দাম আগের জায়গায় যেতে সময় লাগবে। হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক চালু হতে পারে। আগামী কয়েক মাসে জ্বালানি আমদানিতে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলার বাড়তি লাগতে পারে। যুদ্ধ থেমে গেলেও রেশ থেকে যাবে। মূল্যস্ফীতি বাড়ার গতি কিছুটা শ্লথ হতে পারে।