নিখোঁজ নারী ও নদীতে ভেসে ওঠা মাথাবিহীন লাশ—এক খুনের রোমহর্ষ যোগসূত্র

· Prothom Alo

একটি অপহরণ মামলা। আরেকটি অচেনা ও মাথাবিহীন লাশ উদ্ধারের নথি। দুই ঘটনাই আলাদা সময়ে, আলাদা থানায়, আলাদা ফাইলে বন্দী ছিল। সবকিছু আলাদা হলেও দুজনের গল্প আদৌ আলাদা কি না, এই প্রশ্নের উত্তর তখনো অজানা।

শুরুতে কেউই আঁচ করতে পারেনি যে এই দুই ঘটনার মধ্যে থাকতে পারে একই রক্তমাখা যোগসূত্র। তদন্তে ধুলা সরতেই ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে নিখোঁজ নারী ও নদীতে ভেসে ওঠা অচেনা নারীর দেহ, যাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়, তাঁদের একটিই পরিচয়। নাম সালেহা বেগম। পাশাপাশি ওই নারীকে হত্যার পর মাথা বিচ্ছিন্ন করার রোমহর্ষ কাহিনিও বেরিয়ে আসে।

Visit sports24.club for more information.

নিখোঁজের পর মামলা

সালেহা বেগমের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ার সাজিয়াড়া গ্রামে। গত বছরের ১৯ আগস্ট তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন। ঘটনার দুই মাস পর ১৮ অক্টোবর তাঁর ছেলে শামীম ফকির আদালতে অপহরণ মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

তদন্তের এক পর্যায়ে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর সালেহার প্রেমিক লালন গাজীকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। তাঁকে গ্রেপ্তারের পরই অজ্ঞাতপরিচয় মাথাবিহীন নারীর লাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায় পিবিআই।

তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সালেহা বেগম দীর্ঘদিন সৌদি আরবপ্রবাসী ছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি গ্রামে ফেরেন। এরপর একই গ্রামের লালন গাজীর সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রেমের টানে ঘর ছেড়ে আসা সালেহা বেগমকে খুনে জড়িত তাঁরই প্রেমিক লালন গাজী। এই খুনে সহযোগিতা করেন লালন গাজীর মামাতো ভাই সিজার মোল্লা। গত ১ মার্চ ঢাকার হাতিরঝিল থেকে তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মূল আসামি লালন গাজী। তাঁর সঙ্গে সালেহার প্রেমের সম্পর্ক ছিল

ইন্দুরকানী রহস্য

২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর মামলার নথি পান তদন্ত কর্মকর্তা খুলনা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) রেজোয়ান আহমেদ। তিনি প্রথমেই যে তথ্য পান, তা আরও ধোঁয়াশা তৈরি করে দেয়। কারণ, নিখোঁজ হওয়ার আগের সময়টা পরিবার যেভাবে বলেছিল, প্রযুক্তিগত তথ্য তার সঙ্গে মিলছিল না।

সালেহার পরিবার পিবিআইকে জানিয়েছিল, ২০২৪ সালের জুন থেকে এই নারী ঢাকায় এক চিকিৎসকের বাসায় কাজ করতেন। সেখানে ১০ হাজার টাকা বেতন পেতেন তিনি।

—রেশমা শারমিন, পুলিশ সুপার, পিবিআই, খুলনামাথাবিহীন লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি ছিল একেবারেই ক্লুলেস। কারণ, লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। পরে একটি অপহরণ মামলার তদন্তের এক পর্যায়ে লাশের পরিচয় পাওয়া যায়। তারপর দুজনকে গ্রেপ্তারের পর দুটি ঘটনার যোগসূত্র উঠে আসে এবং হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়।

কিন্তু এসআই রেজোয়ান প্রযুক্তিগত তদন্তে জানতে পারেন, লালন গাজী ও সালেহা বেগমের অবস্থান প্রায় এক বছর ধরে পিরোজপুরের ইন্দুরকানী এলাকায় ছিল।

রেজোয়ান প্রথম আলোকে বলেন, এই রহস্য উদ্‌ঘাটনে তিনি ইন্দুরকানীর চাড়াখালী গ্রামে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, লালন গাজী ও সালেহা বেগম স্বামী–স্ত্রী পরিচয়ে দীর্ঘদিন একটি বাড়িতে ভাড়া ছিলেন। গত বছরের ১৯ আগস্ট খুলনায় লালন গাজীর মামার বাড়ি যাওয়ার কথা বলে দুজন বের হন। তারপর আর ফেরেননি। সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে তাঁদের মুঠোফোনও বন্ধ।

সেই দিনটিই পরে হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। কারণ, এই তথ্য জানার পরই বদলে যায় তদন্তের গতিপথ।

ট্রাংকে নারীর হাত-পা বাঁধা লাশ, নীল রঙের পিকআপের সূত্রে রহস্য ভেদসালেহাকে হত্যায় সহযোগিতা করা লালন গাজীর মামাতো ভাই সিজার মোল্লা

ঝপঝপিয়া নদীর অচেনা লাশ ও বদলে যাওয়া তদন্ত

তদন্ত কর্মকর্তা রেজোয়ানের কাছে বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় লালন গাজীর মামার বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটার গজালিয়া গ্রামে যান তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁদের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। তখন তিনি বটিয়াঘাট থানায় খোঁজ নেন, ১৯ আগস্ট বা এই তারিখের কাছাকাছি সময়ে কোনো লাশ উদ্ধারের ঘটনা আছে কি না।

নথি ঘেঁটে তদন্ত কর্মকর্তা জানতে পারেন, ২০ আগস্ট বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বটিয়াঘাটা উপজেলার সুরখালী ইউনিয়নের সুখদাড়া এলাকায় ঝপঝপিয়া নদী থেকে মাথাবিহীন এক নারীর লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। তবে ওই নারীর পরিচয় শনাক্ত করতে না পেরে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফন করা হয়।

সাত সেকেন্ডের অস্পষ্ট ফুটেজই খুনি পর্যন্ত পৌঁছে দিল গোয়েন্দাদেরসালেহার ব্যবহৃত আসবাব ও জামাকাপড় সিজারের বাড়ির উঠানে মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয়

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সেই অচেনা নারীর লাশের ছবি, পোশাক ও গয়না দেখানো হয় নিখোঁজ সালেহার ছেলে শামীম ফকিরকে। লাশটি সালেহা বেগমের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেন তাঁর ছেলে। পরে ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, নদীর অচেনা লাশ আর নিখোঁজ সালেহা একই মানুষ।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা পিবিআই খুলনা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) রেশমা শারমিন প্রথম আলোকে বলেন, মাথাবিহীন লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি ছিল একেবারেই ‘ক্লুলেস’। কারণ, লাশের পরিচয় পাওয়া যায়নি। পরে একটি অপহরণ মামলার তদন্তের এক পর্যায়ে লাশের পরিচয় পাওয়া যায়। তারপর দুজনকে গ্রেপ্তারের পর দুটি ঘটনার যোগসূত্র উঠে আসে এবং হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়।

তদন্তের শুরুতে গলদঘর্ম, শেষে ভিডিওতে দেখা মুঠোফোন দিল খুনির খোঁজসালেহার ব্যবহৃত আসবাব ও জামাকাপড় আলামত হিসেবে জব্দ করেছে পুলিশ

গোয়েন্দা জালে লালন

সালেহার খোঁজ তো মিলেছে। তাহলে লালন গাজী কোথায়? তিনিই কি সালেহাকে খুন করেছেন, নাকি তাঁকেও হত্যা করা হয়েছে? এমন সব প্রশ্ন ঘুরতে থাকে পিবিআইয়ের কর্মকর্তাদের মনে।

তবে নানা তথ্য–উপাত্ত মিলিয়ে পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা ধারণা করছিলেন, সালেহাকে হত্যার সঙ্গে লালন গাজী জড়িত থাকতে পারেন। আর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লালন বেঁচেই আছেন। তিনি ঘন ঘন মুঠোফোন ও সিম পরিবর্তন করছেন। পরিবার বা পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন।

পিবিআই জানিয়েছে, সালেহা নিখোঁজের সঙ্গে লালনের জড়িত থাকার বিষয়ে শুরুতেই সন্দেহ ছিল পরিবারের। এলাকায় লালন প্রচার করেছিলেন, সালেহা বিদেশ চলে গেছেন। তবে সালেহার পাসপোর্টের বিষয়ে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, তিনি বিদেশ যাননি। এ থেকে লালন গাজীকে আরও বেশি সন্দেহ করা হয়।

পিবিআই আরও জানিয়েছে, টানা ৪০ দিনের অনুসন্ধান ও নজরদারির পর গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারঘাট এলাকার একটি খেয়াঘাট থেকে লালনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তিনি সালেহাকে হত্যা ও মাথা বিচ্ছিন্ন করার রোমহর্ষ বর্ণনা দেন।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রেজোয়ান বলেন, লালন গাজীর বর্ণনায় বেরিয়ে আসে এই হত্যার ঘটনায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন মামাতো ভাই সিজার মোল্লা।

ভিডিওতে অস্পষ্ট খুনির মুখ, শেষে গুলি ছোড়ার ধরন দেখে শনাক্তসুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারঘাট এলাকার একটি খেয়াঘাট থেকে লালনকে গ্রেপ্তার করা হয়

বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় খুন

লালন গাজীকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, তাঁর একটি মাটিকাটার ভেকু ছিল। সেই ভেকু দিয়ে মাটি উত্তোলন করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। খুলনার ডুমুরিয়ার সাজিয়াড়া গ্রামে তাঁর স্ত্রী–সন্তানেরা বসবাস করেন। সৌদি আরব থেকে সালেহা দেশে ফেরার পর তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে স্বামী–স্ত্রী পরিচয়ে ২০২৪ সালের জুন থেকে তাঁরা পিরোজপুরের ইন্দুরকানীর চাড়াখালী এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। সালেহা তাঁর পরিবারকে বলেছিলেন, ঢাকায় চাকরি করেন। আর লালন গাজী বলেছিলেন, ভেকু দিয়ে মাটি উত্তোলনের কাজ করতে পিরোজপুরের ইন্দুরকানীতে আছেন তিনি।

তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, সালেহা বিয়ের জন্য লালনকে চাপ দিতে থাকেন। বিয়ে না করলে পরিবারকে সব জানিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি। এ কারণে সালেহাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন লালন। সেই পরিকল্পনার কথা জানান মামাতো ভাই সিজার মোল্লাকে। ঘটনার দিন সালেহা বেগমকে নিয়ে লালন তাঁর মামার বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটার গজালিয়ায় যান।

ঢাকার হাতিরঝিল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সিজার মোল্লাকে

লালন ও তাঁর মামাতো ভাই সিজার মোল্লার বরাত দিয়ে তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, ঘটনার দিন ১৯ আগস্ট অনেক বৃষ্টি ও ঝড় হয়েছিল। সিজার মোল্লার সঙ্গে পরামর্শ করে লালন সালেহাকে বাড়ির পাশের একটি পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে যান। বাড়ি থেকে রশি এনে দেন সিজার মোল্লা। মধ্যরাতে সালেহা বেগমের গলায় সেই রশি পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন লালন। এ সময় পরিত্যক্ত ঘরের দরজায় পাহারা দেন সিজার মোল্লা।

তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, লাশের পরিচয় যেন শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য সালেহা বেগমের শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করেন তাঁরা। সিজার মোল্লা বাড়ি থেকে হাঁসুয়া নিয়ে আসেন। সেই হাঁসুয়া দিয়ে সালেহার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ভদ্রা নদীতে লাশ ফেলে দেন তাঁরা। লাশ ভাসতে ভাসতে পৌঁছায় ভদ্রা নদীর শাখা ঝপঝপিয়া নদীতে।

অর্থ আত্মসাৎ, আলামত গায়েব

তদন্ত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, একসঙ্গে থাকার সময় এক বছরে নানা কৌশলে সালেহা বেগমের ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছিলেন লালন গাজী।

এ ছাড়া এই মামলার আলামত পরিকল্পিতভাবে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।

পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন বলেন, সালেহা বেগমকে হত্যার পর লালন গাজী ও তাঁর মামাতো ভাই সিজার মোল্লা পিরোজপুরের ইন্দুরকানী যান। সেখানে সালেহা বেগমের ব্যবহৃত আসবাব ও জামাকাপড় সিজারের বাড়ি নিয়ে এসে উঠানে পুঁতে রাখেন তাঁরা। পরে সিজারকে গ্রেপ্তারের পর এগুলো মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয়।

Read full story at source