আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সমন্বয় ধর্ম
· Prothom Alo

পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের সঙ্গে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের এক গভীর সম্পর্ক আবিষ্কার করা যায়। এমন নয় যে তিনি বিশেষভাবে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করতেন বা উদ্যাপনের পক্ষে জোরালো মতামত দিয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ড আর আকাঙ্ক্ষা-আকুতির মধ্যে জোরালোভাবে এমন অনেক উপাদান পাওয়া যাবে, যা আমাদের এ প্রস্তাব সমর্থন করে। আজকাল যাকে আমরা পরিচয়ের রাজনীতি বলি, সে এলাকায় সাহিত্যবিশারদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ‘বাঙালি’ পরিচয়ের অবিচল প্রতিজ্ঞা পরিলক্ষিত হয়। অন্তত উৎসবের দিক থেকে দেখলে বা উৎসব আয়োজনের উপলক্ষের দিক থেকে দেখলে, নববর্ষের মতো সর্বজনীন কোনো মুহূর্ত বাঙালির সামষ্টিক জীবনে পাওয়া যায় না। লেখার শুরুতে সাহিত্যবিশারদের সঙ্গে পয়লা বৈশাখের নিবিড় সম্পর্কের কথা এ নিরিখেই বলা হলো।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
আর যদি বাঙালি মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে ধরি, তাহলে বলতে হয়, তিনি মুসলমানদের মধ্যে ‘বাঙালি’ পরিচয় উচ্চকিত করা অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। এদিক থেকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ আরও দু-একজন। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। আপাতত বলা যাক, বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে ইমানদার মুসলমান হিসেবে সাধ্যমতো হাজির রাখা আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সাধনার অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ পর্যন্ত বললেও সম্ভবত কম বলা হবে। বলা যায়, তিনি মুসলমান হিসেবে, মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে, মুসলমান সমাজের জন্য এবং প্রধানত মুসলমান সাহিত্যিকদের নিয়ে কাজ করেছেন।
তাহলে একটু আগেই যে বললাম, তিনি ‘বাঙালি’ পরিচয়কে শিরোধার্য করে কাজ করতেন, তার কী হবে?
মোহাম্মদ আজমআমাদের কালে ‘বাঙালি’ ও ‘মুসলমান’ পরিচয়ের যে জটিল ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে আমরা বাস করি, যেখানে এ দুই বর্গের পারস্পরিক সম্পর্ক মতবিরোধের এলাকা ছেড়ে প্রায়ই মর্মান্তিক বিভাজনের রূপ নেয়, সেখানে আমাদের পক্ষে বিশ্বাস করাও কঠিন যে সাহিত্যবিশারদসহ আরও কারও কারও কাছে এ দুই পরিচয়ের কোনো বিরোধ ছিল না। যারা বিরোধ দেখে, তাদের মোকাবিলার প্রয়োজন ছাড়া তিনি আসলে এটা উল্লেখ করারই দরকার বোধ করতেন না।
তিনি অবশ্য নিজের চট্টগ্রামনিবাসী পরিচয়কেও অতি গুরুত্বের সঙ্গে লালন করতেন। এদিক থেকে এবং মুসলমান আর বাঙালি পরিচয়ের ক্ষেত্রেও তাঁর এক সমমর্মী ছিলেন মুহম্মদ এনামুল হক। তাঁরা দুজন মিলে লিখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য। দৃষ্টিভঙ্গির যেসব ঐক্যের ভিত্তিতে এ যৌথ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল, তার মধ্যে চট্টগ্রামের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা অন্যতম প্রধান। পাশাপাশি এ–ও বলা উচিত, এ বইয়ে চাটগাঁর দুই বিদ্বান মিলে সাহিত্যিক উৎপাদনের দিক থেকে চাটগাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন করেছিলেন। জরুরি তথ্য হলো, বাস্তব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই তাঁরা কল্পনাটা খাড়া করেছিলেন। জীবনভর পুঁথি সঞ্চয় করে সাহিত্যবিশারদ যে সাহিত্যসৌধ গড়ে তুলেছিলেন, যার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বিকশিত হয়েছিলেন আমাদের দেশের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অধিকাংশ পণ্ডিতজন, তার বিস্ময়কর বৃহদংশ ছিল চট্টলার কবি-সাহিত্যিকদের।
ধারণাটা গড়ে উঠেছিল এভাবে: আরবদের বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম যেহেতু সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের আদি পীঠস্থান, ফলে এখানেই মুসলমানদের তরফে সবচেয়ে বনেদি সাহিত্যচর্চা হয়েছে। সে চর্চা আবার চাটগেঁয়ে আঞ্চলিক ভাষায় হলে হতো না, মুসলমানি বাংলায় তো একেবারেই নয়; তা সম্ভব হয়েছে কেবল বাঙালি জনগোষ্ঠীর সর্বজনীন সাহিত্যিক বাংলায় রচিত হওয়ার কারণে। এ দিকগুলোর বিশদ আলোচনায় আমরা এখানে অগ্রসর হব না। তবে পরিষ্কার বোঝা যায়, এই থিসিসের মধ্যেই চট্টলা নিবাসী, মুসলমান ও বাঙালি পরিচয়ের একটা বাস্তব কার্যকারণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
পরিচয়ের রাজনীতির এ দিকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘পরিচয়’ যখন আদর্শবাদী শ্রেষ্ঠত্বের কাঠামো হিসেবে আরোপিত হয়, তখন সে কেবল যাপিত জীবনে সংকটই তৈরি করে না, আবশ্যিকভাবে প্রচুর বিরোধী পক্ষও সৃষ্টি করে। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের আদর্শবাদিতার বিপরীতে বাস্তবের কার্যকারণ থেকে অনেক দূর পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন। তিনি ভাষা ও সাহিত্যের এলাকায় তাঁর অজরামর কাজ থেকেই সিদ্ধান্তের পক্ষে রসদ পেয়েছেন।
কী তাঁর কাজ?
তাঁর প্রধান কাজ হাতে লেখা পুরোনো সাহিত্য সংগ্রহ, সম্পাদনা ও পরিচিতি নির্মাণ। কাজের এ এলাকা সম্ভ্রান্ত চর্চা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ ভাগের কলকাতায়। তার জন্য অবশ্য ইউরোপীয় বিদ্যাবত্তার সহায়তার প্রয়োজন হয়েছিল। মোটাদাগে, বিদ্যাটা প্রাচ্যবিদ্যার অঙ্গ, যদিও এ চর্চা পরবর্তী জমানায় বিস্তর জাতীয় বোধের উৎস হতে পেরেছে। উনিশ শতকের শেষের দিকে প্রাচ্যবিদ্যাচর্চায় খুব সংগত কার্যকারণেই একটা ধারণা বিকশিত হতে শুরু করে যে উপনিবেশিত অঞ্চলের প্রকৃত পরিচয় পাওয়ার জন্য ধ্রুপদি ভাষা আর যথেষ্ট নয়, অনুসন্ধান চালাতে হবে দেশজ ভাষায়। এ কাজে রাষ্ট্রীয় সহায়তাও মিলেছিল। গ্রিয়ারসনের ধ্রুপদি ভাষা-গবেষণা এ দৃষ্টিভঙ্গিরই ফসল। কলকাতায় এ ধরনের চর্চা বড় মাপের বহু পণ্ডিতের জন্ম দিয়েছে। সে আবহই পৌঁছে গেছে বহু দূরবর্তী চট্টগ্রামে—আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের প্রান্তীয় ডেরায়।
কীভাবে তা সম্ভব হলো?
আবদুল করিমের তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারে পুঁথির বড় ধরনের সংগ্রহ ছিল। চর্চাও ছিল। কাজেই কলমি পুঁথি তিনি শৈশব থেকেই পড়তে পারতেন। সাময়িকপত্রের সেই রমরমার কালে আরেকটি অভ্যাস তাঁর গড়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন মাসিকপত্রের নিয়মিত ভোক্তা। পত্রিকা মারফতই কলকাতার সংস্কৃতি এসে পৌঁছেছিল আবদুল করিমের ঘরে। তিনি অল্প বয়সেই পুঁথিসাহিত্য সংগ্রহ করা এবং সেগুলোর সম্পাদিত রূপ প্রকাশের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। কাজটা তিনি চালিয়ে গেছেন মৃত্যু পর্যন্ত।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ তখন এসব কাজের তীর্থস্থান। চিঠি আর সাময়িকপত্র মারফত সাহিত্যবিশারদ সে তীর্থে সমাদর আদায় করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর প্রথম দিকের রচনা ও বইগুলো সাহিত্য পরিষদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয়। তবে এই গ্রাম্য বা বড়জোর মফস্সলবাসী পণ্ডিতকে কলকাতার বনেদি গবেষকগণ যে সব সময় উপযুক্ত কদর করতে পেরেছেন, তা নয়। তাঁর গবেষণা অন্যদের নামে প্রকাশিত হয়েছে, এমন ঘটনাও সেখানে ঘটেছে। এ তথ্য থেকে অবশ্য কলকাতার পণ্ডিতগণের পূর্ব বাংলা-বিদ্বেষ বা হিন্দু পণ্ডিতদের মুসলমান-বিদ্বেষবিষয়ক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা মোটেই সমীচীন হবে না। কারণ, প্রায় সমরূপ অভিজ্ঞতা ঢাকার পণ্ডিতজনের সঙ্গেও তাঁর একাধিকবার হয়েছে।
এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই যে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব উপনিবেশ-পূর্ব মুসলমান সাহিত্যিকদের হাতে লেখা পুঁথির বিশাল সংগ্রহ গড়ে তুলতে পারা। এ কাজে তিনি শারীরিক শ্রম, টাকাপয়সা আর সময়ের যে বিনিয়োগ করেছেন, তার তুলনা বিরল। তাঁর সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশে মধ্যযুগের সাহিত্য-গবেষণার পুরো কাঠামোটি গড়ে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুসলমান লেখকদের অপরিচয়জনিত অনুপস্থিতি যে সংকট তৈরি করেছিল, তার সমাধান হয়েছে। ঢাকার পরবর্তী প্রজন্মের পণ্ডিতগণ কাজটা করেছেন। বিদ্যাচর্চার জগতে এ অবদানের কোনো তুলনা হয় না। তবে শুধু অন্যদের কাজের অঢেল উপকরণ সরবরাহ করাতেই তাঁর কৃতিত্ব সীমিত নয়; যদিও সে কৃতিত্বই তাঁকে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট। তিনি নিজেও সম্পাদনার মধ্য দিয়ে এবং বিপুল পরিমাণ প্রবন্ধ লিখে সাহিত্যের ওই অনালোকিত অংশে প্রয়োজনীয় আলোর জোগান দিয়েছেন। গবেষকগণ বলছেন, তাঁর রচিত প্রবন্ধের সংখ্যা ছয় শতাধিক। এর একটা বড় অংশ পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে লেখা সাহিত্য ও সাহিত্যিকের পরিচয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাহিত্যবিশারদই প্রথমবারের মতো ওই লেখক ও লেখার পরিচয় উপস্থাপন করেছেন। যাকে আমরা গবেষণার প্রাথমিক উৎস বলি, তার এত বড় মহাজন যেকোনো সংস্কৃতিতেই দুর্লভ।
সাহিত্যবিশারদ মনে করতেন, মুসলমান সমাজ তার গৌরবময় যুগে সাহিত্যিক বাংলার প্রযত্ন নিয়ে নিজেদের আভিজাত্যের প্রমাণ দাখিল করেছিল। সে অর্জনকে ভুলে গিয়ে পরের অনেক প্রজন্ম কেবল নিজেরাই হীন ও হতবল হয়নি, বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক নিজের যে পরিচয়চর্চার মধ্য দিয়ে সে নিজেই অর্জন করেছিল, সে দাবি করতেও ভুলে গেছে। তাঁর কাছে বাঙালি পরিচয় কোনো বিশিষ্ট চর্চার মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠার ব্যাপার ছিল না; বরং যাপিত বাস্তবতার অনিবার্য প্রকাশ হিসেবেই তিনি এ পরিচয়কে গ্রহণ করেছিলেন। তাই এ দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ তাঁকে পীড়িত করতে পারেনি।
প্রশ্ন জাগে, নিজের বাঙালি পরিচয়, মুসলমান পরিচয়, এমনকি চাটগেঁয়ে পরিচয়কে বিরোধহীনভাবে সমঝোতায় এনে সাহিত্যসেবায় জীবন উৎসর্গ করার এই প্রেরণাকে কি আমরা আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ব্যক্তিগত কৃতিত্ব হিসেবে দেখব? একে ব্যক্তির অবদান ও গুণ হিসেবে তো দেখতেই হবে। তবে কালের আনুকূল্য না পেলে এ ধরনের কোনো ঘটনা আসলে ব্যক্তির মধ্যে ঘটতে পারে না। পাণ্ডিত্যের এলাকায় সমকালীন পটভূমির ওপর সামান্য আলোকপাত আগেই করা হয়েছে। মনোগঠন সম্পর্কে বলা যায়, তাঁর প্রজন্ম একটা সমন্বয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছিল। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ইসমাইল হোসেন সিরাজীসহ ওই প্রজন্মের বেশ কয়েকজন কৃতবিদ্য মানুষ আমরা পেয়েছি, যাঁরা মুসলমান পরিচয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েও বাঙালিত্বের সঙ্গে ওই পরিচয়ের উল্লেখযোগ্য কোনো বিরোধ দেখতে পাননি। কোন প্রেক্ষাপটে এ ধরনের একটি সহজ-স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটেছিল, তার বিশ্লেষণ যেমন জরুরি, তেমনি আমাদের জনগোষ্ঠী পরবর্তী কোন ধরনের পটভূমিতে আরোপণমূলক ও আদর্শবাদী ‘বাঙালি’ পরিচয় এবং তার বিপরীতে অনুদার ও অসহিষ্ণু ‘মুসলমান’ পরিচয়ে চিহ্নিত হতে চাইল, তার তত্ত্বতালাশও জরুরি কাজ।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের পরের প্রজন্ম তাঁর পাণ্ডিত্য ও আহৃত সম্পদের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছে। জনগোষ্ঠী হিসেবে আমরা এর ফলে প্রভূত পরিমাণে উপকৃত হয়েছি। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে পুরোনো সাহিত্য পাঠের বহু নতুন তরিকা ও নজির দুনিয়াজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমনকি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অবলম্বন করেও নতুন ধারার বেশ কিছু কাজ হয়েছে। নতুন প্রেক্ষাপটে তাঁর সাহিত্যিক তৎপরতা যে নতুন তাৎপর্যে উদ্ভাসিত হবে, তা সন্দেহাতীতভাবে বলা চলে। সেই সঙ্গে এ কথাও বলে রাখা দরকার, বাংলাদেশের জনসমাজের পরিচয়নির্ভর বিদ্বেষের এই কালে একজন সমন্বয়বাদী অগ্রপথিক হিসেবেও তিনি চর্চিত হতে থাকবেন।
লেখক: গবেষক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক