বিরল চাঁদিয়ালের সন্ধানে

· Prothom Alo

দিনভর সিলেটের কানাইঘাটের বড় হাওরে বিরল পাতিসারসের ছবি তুলে সন্ধ্যায় শহরে ফিরলাম। ছয়জনের দলের দুজন ঢাকা ফিরে গেল আর আমরা চারজন শ্রীমঙ্গলের বাসে উঠলাম। দুই বছর পর শ্রীমঙ্গলে এসেছি।

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা সেরে আদমপুর ও কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রমে পাখি পর্যবেক্ষণের নিমিত্তে সারা দিনের জন্য অটোরিকশা নিলাম। আদমপুর বিটে পৌঁছালাম ৯টা নাগাদ। ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট বনের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ৩০ প্রজাতির বেশি পাখি-প্রাণী-প্রজাপতির ছবি তুললাম। এরপর টার্গেট করা তিন-চারটি পাখি দেখার সম্ভাব্য স্থান ছড়ার মুখে চলে এলাম।

Visit orlando-books.blog for more information.

এখানে একসময় বামন মাছরাঙা বাসা বানাত। যাহোক, সরু ছড়া ধরে সামনের দিকে এগোতে থাকলাম। এখানে জঙ্গল বেশ ঘন। প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পর এক জায়গায় এসে থামলাম। সঙ্গী বিশিষ্ট পক্ষিবিদ আবদুল মজিদ শাহ শাকিল বাইনোকুলার দিয়ে বিশাল এক গাছের সবুজ পত্রগুচ্ছের ভেতরে থাকা সবুজ নতুন একটি পাখি খুঁজে বের করলেন। আমরাও দ্রুত সেদিকে ক্যামেরা তাক করে পাখিটির ছবি তুললাম। তবে এই পাখি দেখার গল্প আরেক দিনের জন্য তুলে রাখছি।

এরপর আরও দু–তিনটি পাখির ছবি তুলে অল্প একটু সামনে এগোলাম। মনে হলো আরেকটি নতুন পাখি বা লাইফার কপালে আছে। পাখিটিকে প্রায় এক যুগ ধরে খুঁজছি। শাকিল মুঠোফোনে পাখিটির ডাক ছাড়ল। আর মিনিট দুয়েকের মধ্যেই পাখিটি সাড়া দিল। কিন্তু ঘন ডালপালা ও পাতার আড়ালে থাকায় সহজে ওকে ফোকাস করতে পারছিলাম না। তা ছাড়া নতুন পাখি দেখলে আমার যা হয়, হাত কাঁপা শুরু হলো। ঘড়ির কাঁটায় ১২টা ১২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড হতেই কাঁপা হাতে প্রথম ছবিটি তুললাম। এরপর দুটি ছররা ক্লিকে ২৭টি ছবি তুললাম। কিন্তু একটি ছবিও মনমতো হলো না। তবে ২৯তম ছবি থেকে ভালো ছবি ওঠা শুরু হলো। মিনিট দুয়েক পরে আরেকটি পাখি এসে হাজির। ৬ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে মোট ১২৯টি ছবি তুলে আরেকটি নতুন পাখির খোঁজে বনের আরও গহিনে এগিয়ে গেলাম। ২৬ জানুয়ারি ২০২৬-এর ঘটনা এটি।

এত কষ্ট করে পাওয়া নতুন পাখিটি এ দেশের বিরল আবাসিক শাখাচারি (প্যাসারিন) পাখি চাঁদিয়াল। আসলে ওর কোনো প্রচলিত বাংলা নাম নেই। অনেকে ইংরেজি নামের অনুবাদে চাঁদিবুক মোটাঠুঁটি বলেন। চাঁদিয়াল নামটি পশ্চিমবঙ্গের। ইংরেজি নাম সিলভার-ব্রেস্টেড ব্রডবিল। গোত্র ইউরিল্যামিডি, বৈজ্ঞানিক নাম Serilophus lunatus। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা মেলে।

চাঁদিয়াল ছোট আকারের পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক পাখি লম্বায় মাত্র ১৯ সেন্টিমিটার। ওজনে ৩৫ গ্রাম। গাঁট্টাগোট্টা পাখিটির মাথা বড়, ঠোঁট চওড়া, ঘাড় মোটা এবং লেজ ও ডানা খাটো। মাথার চাঁদি ধূসরাভ। চোখের ওপর চওড়া ও দীর্ঘ কালো ভ্রুরেখা। পিঠের উপরিভাগ কালচে ধূসরাভ, কোমরের দিকে যা ক্রমে কমলাটে বাদামি হয়ে গেছে। দেহের নিচটা রুপালি-ধূসরাভ। ডানা কালো, যার আগা সাদা। ডানায় নীলচে ছোপ। লেজ মোটামুটি কালো। ঠোঁট নীলাভ-সাদা। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে প্রায় একই রকম হলেও স্ত্রীর গলা ও বুকের মাঝখানে অলংকারের মতো রুপালি কণ্ঠী থাকে। স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে চোখ বাদামি, অক্ষিবলয় হলুদ। পা ও পায়ের পাতা হলদে সবুজ। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে বড়গুলোর মতো হলেও ঠোঁট কালচে।

আদমপুরের গহিন বনে গাছের ডালে চাঁদিয়ালের পাশ–ছবি

এরা সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। দিবাচর ও বৃক্ষচারী পাখিগুলো সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে। ঝুলন্ত লতাপাতা ও গাছের পত্রগুচ্ছে খাবার খোঁজে। পোকামাকড় ও শামুক প্রিয় খাবার। ভোর ও গোধূলিতে বেশি সক্রিয়। গাছের ডালে খাড়াভাবে বসে ও মাঝেমধ্যে লেজ নাড়ায়। উচ্চ স্বরে ‘কি-উউ...’, ‘চির-র-র-র...’ বা ‘কিটিকিটিকি...’ শব্দে ডাকে।

মার্চ থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় মাটি থেকে ১-৩ মিটার উচ্চতায় ঝুলন্ত সরু ডালে ডিম্বাকার থলের মতো বাসা বানায়। স্ত্রী চার-পাঁচটি সাদা বা পাটকিলে ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে তা দেয়। ডিম ফোটে ১৫-১৮ দিনে। ছানা লালন–পালন উভয়েই মিলেমিশে করে। আয়ুষ্কাল কমবেশি ছয় বছর।

  •  আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি, বন্য প্রাণী প্রজনন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

Read full story at source