প্রবাসে বন্ধুর হাত: ক্যালিফোর্নিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পাশে ‘বিসাক’
· Prothom Alo

ক্যালিফোর্নিয়ার বিশাল আকাশের মতো এখানে আসা মানুষদের স্বপ্নগুলোও সুবিশাল। সেই স্বপ্নের টানে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে শত শত শিক্ষার্থী পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের এই রাজ্যে। কেউ আসেন উচ্চশিক্ষার নেশায়, কেউ গবেষণার সুযোগ নিতে, আবার কেউবা এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়। তবে স্বপ্নের এই দেশে পা রাখার পর বাস্তবতা অনেক সময় কঠিন হয়ে ধরা দেয়। বিশেষ করে তাদের জন্য, যাদের এখানে কোনো পরিচিতজন নেই।
Visit afsport.lat for more information.
দীর্ঘ বিমানযাত্রা শেষে লস অ্যাঞ্জেলেস বা সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর এক অজানা উৎকণ্ঠা গ্রাস করে অনেক শিক্ষার্থীকে। কোথায় যাবেন, কার কাছে সাহায্য চাইবেন, মাথা গোঁজার ঠাঁই কোথায় হবে—সবকিছুই যেন এক গোলকধাঁধা। নতুন দেশে নতুন জীবনের শুরুতে এই মুহূর্তে একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একটি নির্ভরতার হাত, পরিচিত কোনো কণ্ঠস্বর আর নিরাপদ একটি আশ্রয়।
ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পার্কে আনন্দঘন পরিবেশে ‘বাংলাদেশি ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়া’ (বিসাক)–এর সদস্য ও শিক্ষার্থীরাঅচেনা এই প্রবাসজীবনে শিক্ষার্থীদের সেই নির্ভরতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বাংলাদেশি ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়া’, সংক্ষেপে ‘বিসাক’। এটি শুধু একটি সংগঠন নয়; বরং এটি শিক্ষার্থীদের জন্য আস্থা ও সহায়তার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। অনেকের কাছে বিদেশের মাটিতে নিজের পরিবারের মতো এক আশ্রয়ের নাম বিসাক। তাদের মূলমন্ত্র একটিই— ‘শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার্থীরা’।
ক্যালিফোর্নিয়া: স্বপ্ন ও বাস্তবতার সন্ধিস্থল
শিক্ষা, গবেষণা আর আধুনিক প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়—সবই এই রাজ্যে রয়েছে। ফলে প্রতিবছরই বাড়ছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পদচারণ। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এর মধ্যে শুধু লস অ্যাঞ্জেলেস এলাকাতেই বাস করেন প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী। এই বিশাল কমিউনিটির প্রতিটি শিক্ষার্থীর পেছনে রয়েছে একেকটি সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প।
ক্যালিফোর্নিয়ায় বিসাক আয়োজিত ক্রিকেট টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে ট্রফি ও সনদ তুলে দেওয়া হচ্ছেঅচেনা শহরে প্রথম দিনগুলো
ক্যালিফোর্নিয়ায় পা রেখেই একজন শিক্ষার্থীকে প্রথম যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো একাকিত্ব আর অনিশ্চয়তা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তি আর অচেনা পরিবেশের চাপ অনেককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। যাতায়াতব্যবস্থা, সিম কার্ড কেনা কিংবা থাকার ব্যবস্থা—সবকিছু নিয়ে প্রথম দিনগুলোয় হিমশিম খেতে হয়।
ঠিক এই সংকটকালেই ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসে ‘বিসাক’। যখন কেউ নিজের দেশে স্বজনদের ছেড়ে হাজার মাইল দূরে একা অনুভব করেন, তখন বিসাকের সদস্যরা পাশে এসে ভরসা দেন। এই সংগঠন নতুনদের মনে এই বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে যে, ‘তুমি একা নও, তোমার পাশে আমরা আছি’। মূলত এই ভ্রাতৃত্ববোধ থেকেই বিসাক আজ ক্যালিফোর্নিয়ার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে এক অনন্য নাম।
পড়াশোনার ক্লান্তি দূর করতে এবং নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্য বাড়াতে নিয়মিত এমন মিলনমেলা ও চড়ুইভাতির আয়োজন করে সংগঠনটিবিসাক: একতার শক্তিতে আগামীর পথচলা
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশি ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়া বা বিসাক। সম্পূর্ণ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গঠিত এই অরাজনৈতিক ও অলাভজনক সংগঠনটির মূল লক্ষ্য হলো রাজ্যটিতে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এক সুতায় গাঁথা। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সংগঠনের ৫১ সদস্যের শক্তিশালী নির্বাহী কমিটি ১৫টি ভিন্ন বিভাগে ভাগ হয়ে শিক্ষার্থীদের নানা প্রয়োজনে কাজ করে যাচ্ছে। ‘একতাই আমাদের উজ্জ্বল আগামীর পথ’ স্লোগান নিয়ে বিসাক তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিসাকের প্রেসিডেন্ট রাসেল মাহমুদ বলেন, ‘নতুন দেশে এসে একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একাকিত্ব, তথ্যের অভাব এবং শুরুর অনিশ্চয়তা। বিসাক চায়, সেই জায়গায় একটি আস্থার নাম হয়ে উঠতে, যেখানে শিক্ষার্থীরা পা রাখার প্রথম দিন থেকেই নিজেদের নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত মনে করতে পারে।’ তাঁর মতে, সংগঠনের আসল শক্তি এর কাঠামোতে নয়; বরং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতায়।
ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন বছর বরণ করে নিতে এক নৈশভোজে অংশ নিয়েছেন বিসাকের সদস্য ও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। প্রবাসের কর্মব্যস্ত জীবনের মধে৵ উৎসব-পার্বণে একে অপরের সান্নিধ্যে খুঁজে নিচ্ছেন একটুকরা বাংলাদেশবিমানবন্দর থেকে নতুন ঘর—সবখানেই বিসাক
ক্যালিফোর্নিয়ায় পা রেখেই একজন শিক্ষার্থীকে প্রথম যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো যাতায়াত ও নিরাপদ আবাসন। লস অ্যাঞ্জেলেস বা সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর অচেনা পরিবেশে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েন। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বিসাক চালু করেছে ‘ফ্রি এয়ারপোর্ট পিকআপ সার্ভিস’। ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে ৭৮ জন নতুন শিক্ষার্থীকে বিমানবন্দর থেকে গ্রহণ করে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসে আয়োজিত আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড আর্কিটেক্টসের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে ‘বিসাক’–এর প্রতিনিধিরাআবাসনসংকটেও ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বিসাক। এ পর্যন্ত তারা ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬ জন শিক্ষার্থীকে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ ঘর খুঁজে পেতে সহায়তা করেছে। সংগঠনের নেতা লিংকন আহমেদ জানান, নিরাপদ এলাকা ও চুক্তির নানা নিয়ম না জানার কারণে নতুনরা প্রায়ই সমস্যায় পড়েন। বিসাক তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে সেই চিন্তা দূর করে।
তেমনই এক সুবিধাভোগী ইউসিএলএর শিক্ষার্থী রাবেয়া চৌধুরী এলিনা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘ভিসা হওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায় আমি ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসি। ফেসবুকে বিসাকের খোঁজ পাই। এরপর থেকে কোথায় যাব বা কোথায় থাকব, তা নিয়ে আর ভাবতে হয়নি। আমার কাছে বিসাক এক আশীর্বাদের নাম।’
ক্যালিফোর্নিয়ায় বিসাক আয়োজিত অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাক্যারিয়ার ও মানসিক বিকাশে পাশে থাকা
শিক্ষাজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো সিপিটি ও ওপিটি। এ বিষয়ে সঠিক ধারণা না থাকলে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা আইনি বা পেশাগত সমস্যার মুখোমুখি হন। বিসাকের নেতা আতাউর রহমান জানান, তারা নিয়মিত সেমিনার ও ওয়ার্কশপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সচেতন ও দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ বা দক্ষতা উন্নয়নেও বিসাক কাজ করছে বলে জানান সংগঠনের আরেক নেতা সাকিব আবদুল্লাহ।
লস অ্যাঞ্জেলেসের বিশ্বখ্যাত লোটাস ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে ‘বিসাক’–এর সদস্য ও শিক্ষার্থীরাকেবল পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও বিশেষ নজর রয়েছে বিসাকের। রিসালাত হোসেন অন্তর বলেন, ‘বিদেশের যান্ত্রিক জীবনের একাকিত্ব দূর করতে আমরা এমন একটি কমিউনিটি তৈরি করছি, যেখানে সবাই নিজেকে আপন মনে করবে। একই সঙ্গে প্রবাসে দেশি সংস্কৃতি ও উৎসবগুলো ধরে রাখার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে শিকড়ের পরিচয় তুলে ধরছে সংগঠনটি।’
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা
বিদেশে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসিক চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে বিসাক বিশেষ সহায়তা দিয়ে থাকে। সংগঠনের সদস্য রুমানা আক্তার নিপা বলেন, তাঁরা নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা ও তথ্যসহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন, যাতে তাঁরা সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রবাসে নিজেদের শিক্ষাজীবন পরিচালনা করতে পারেন।
বিদেশের মাটিতে দেশি খাবারের স্বাদ ভাগাভাগি করে নিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় বিসাক আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে মধ্যাহ্নভোজের আনন্দমানবিক কার্যক্রম
বিসাকের কার্যক্রম কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং নানা মানবিক কাজেও তাঁরা সমান সক্রিয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জরুরি পরিস্থিতি কিংবা প্রবাসে কোনো বাংলাদেশির অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মতো শোকাবহ ঘটনায় বিসাকের সদস্যরা পরম বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ান। সংগঠনের সদস্য মওদুদ আহমেদ বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি যেকোনো সংকটে দ্রুত সাড়া দিতে। কারণ, প্রবাসজীবনে মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা।’
সময়ের পরিক্রমায় ক্যালিফোর্নিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে বিসাক এখন একটি আস্থার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। বিদেশের মাটিতে এই সংগঠনের উপস্থিতিতে কেউ আর নিজেকে একা ভাবেন না। এখানে নতুন কেউ এলে কেউ ছোটেন বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে, কেউ খুঁজে দেন মাথা গোঁজার ঠাঁই, কেউ দেন সঠিক তথ্য কিংবা জোগান মানসিক সাহস। এই পুরো কর্মযজ্ঞের মূলে রয়েছে একটি অটুট বিশ্বাস—শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে শিক্ষার্থীরাই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি। আর এই ভ্রাতৃত্ববোধ নিয়েই ক্যালিফোর্নিয়ার বুকে একটুকরা বাংলাদেশ হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বিসাক।