দুধ গরম হলে উপচে পড়ে, কিন্তু পানি পড়ে না কেন

· Prothom Alo

রান্নাঘরে সবচেয়ে বড় ধোঁকা সম্ভবত দুধের হাঁড়িই দেয়! আপনি হয়তো চুলায় দুধ গরম করতে দিয়ে দীর্ঘক্ষণ হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে বসে আছেন, কিছুই হচ্ছে না। কিন্তু যেই এক সেকেন্ডের জন্য চোখের পলক ফেলেছেন বা পাশের ঘরে গিয়েছেন, অমনি দুধ গরম হয়ে ফুঁসে উঠে চুলা ভাসিয়ে একাকার! কিন্তু পানি ফোটানোর সময় তো এমনটা ঘটে না। দুধ কেন এত অবাধ্য? এর পেছনের কারণ কী?

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

প্রথমেই দেখা যাক, পানি ও দুধের মধ্যে পার্থক্য কোথায়। পানি শুধুই পানির অণুর (H₂O) সমষ্টি। এর একটি অণুতে থাকে দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু ও একটি অক্সিজেন পরমাণু। একে তাপ দিলে পানির অণুগুলো বাষ্প হয়ে অনায়াসেই বাতাসে মিশে যেতে পারে।

দুধ গরম হয়ে ফুঁসে উঠে চুলা ভাসিয়ে একাকার!

কিন্তু দুধ কোনো সাধারণ তরল নয়; এটি পানি, চর্বি ও প্রোটিনের এক বিচিত্র মিশ্রণ। এই মিশ্রণটাই সব বিপত্তির মূলে! আমরা যখন দুধ গরম করি, তখন এর ভেতরে থাকা প্রোটিনগুলোর কাঠামো বদলে যেতে শুরু করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ডিন্যাচারেশন। এই প্রোটিনগুলো তখন পানির মায়া ত্যাগ করে কাছাকাছি থাকা চর্বির অণুদের সঙ্গে এক নতুন বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। যেহেতু চর্বি ও প্রোটিনের এই জোট পানির চেয়ে হালকা, তাই তারা দল বেঁধে হাঁড়ির একদম ওপরিভাগে চলে আসে। এই জোট যখন ওপরিভাগে জমা হয়, তখন একটি আঠালো আস্তরণ তৈরি করে। একেই আমরা বলি দুধের সর।

দুধ সাদা, কিন্তু মাখন হলুদ কেন
আমরা যখন দুধ গরম করি, তখন এর ভেতরে থাকা প্রোটিনগুলোর কাঠামো বদলে যেতে শুরু করে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ডিন্যাচারেশন।

দুধ কেন উপচে পড়ে, পানি কেন নয়

আসল নাটকটা শুরু হয় হাঁড়ির তলায়। প্রচণ্ড তাপে তলার পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে ওপরে উঠতে চায়। কিন্তু ওপরে তো প্রোটিন ও চর্বির সেই আস্তরণ বা সর এক শক্ত দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! বাষ্প এই দেয়াল ভেদ করে সহজে বের হতে পারে না।

আটকে পড়া এই বাষ্প যখন জোর করে ওপরে ওঠার চেষ্টা করে, তখন সেই আস্তরণের নিচে অসংখ্য বুদ্‌বুদ তৈরি হয়। নিচ থেকে ক্রমাগত বাষ্পের চাপ ও ওপরের আস্তরণের বাধার ফলে হাঁড়ির ভেতরে একধরনের ফেনা তৈরি হয়। তাপ যতই বাড়তে থাকে, এই ফেনার পরিমাণও তত বাড়তে থাকে। একসময় এটি হাঁড়ির দেয়াল টপকে বাইরে উপচে পড়ে।

জলীয় বাষ্পের অণুগুলো খুব সহজেই পানির পৃষ্ঠতল ভেদ করে বাইরের বাতাসে মিশে যেতে পারে

কিন্তু পানির অণুদের জগৎটা অনেক বেশি সরল। বিশুদ্ধ পানিতে প্রোটিন বা চর্বির মতো এমন কোনো ভারী উপাদান নেই, যা তাপ পেয়ে ওপরিভাগে কোনো শক্ত আস্তরণ তৈরি করতে পারে। ফলে হাঁড়িতে পানি গরম করতে দিলে তলা থেকে যখন জলীয় বাষ্প বুদ্‌বুদ আকারে ওপরে উঠে আসে, তখন সে ওপরিভাগে কোনো বাধার সম্মুখীন হয় না। বাষ্পের অণুগুলো খুব সহজেই পানির পৃষ্ঠতল ভেদ করে বাইরের বাতাসে মিশে যেতে পারে। বাষ্প বের হওয়ার জন্য এই সহজ পথ থাকার কারণেই সেখানে কোনো চাপ তৈরি হয় না।

ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণে দুধ কি খেতেই হবে
বিশুদ্ধ পানিতে প্রোটিন বা চর্বির মতো এমন কোনো ভারী উপাদান নেই, যা তাপ পেয়ে ওপরিভাগে কোনো শক্ত আস্তরণ তৈরি করতে পারে।

পানিতে কেন ফেনা তৈরি হয় না

পানিতে এমন কোনো আঠালো পদার্থ নেই, যা বাষ্পকে বুদ্‌বুদের খাঁচায় বন্দী করে রাখতে পারে। সাবানের ফেনা বা দুধের ফেনার জন্য একধরনের আস্তরণ দরকার হয়, যা বাতাসের বা বাষ্পের চারপাশ ঘিরে একটা স্থিতিশীল পর্দা তৈরি করবে। যেহেতু বিশুদ্ধ পানিতে এমন কোনো আস্তরণ তৈরির উপাদান নেই, তাই পানির বুদ্‌বুদগুলো ওপরিভাগে আসামাত্রই ফেটে যায় এবং বাষ্প মুক্ত হয়ে যায়।

দুধ উপচে পড়া বন্ধ করার উপায়

আমরা যদি দুধের উপচে পড়া আটকাতে চাই, তবে সেই আটকে পড়া বাষ্প বের হওয়ার পথ করে দিতে হবে। এর কয়েকটি সহজ সমাধান আছে।

নাড়াচাড়া করা: আপনি যখন চামচ দিয়ে দুধ নাড়েন, তখন ওপরের সেই চর্বি-প্রোটিনের আস্তরণটি ভেঙে যায়। ফলে আটকে থাকা বাষ্পগুলো মুক্তির পথ পায় এবং দুধ উপচে পড়ে না।

চামচ দিয়ে নড়াচড়া করলে, দুধের ওপরের চর্বি-প্রোটিনের আস্তরণটি ভেঙে যায়

হাতা বা চামচ রাখা: হাঁড়ির ওপর একটি কাঠের হাতা বা বড় চামচ আড়াআড়িভাবে রাখলে সেটিও কাজ দেয়। এটি ওপরের আস্তরণটিকে পুরোপুরি জমতে দেয় না এবং বাষ্প বের হওয়ার জন্য একটি সরু রাস্তা তৈরি করে রাখে।

চওড়া পাত্র ব্যবহার: পাত্রটি যদি অনেক চওড়া হয়, তবে বুদ্‌বুদগুলো অনেক বড় হওয়ার সুযোগ পায়। একসময় বুদ্‌বুদগুলো এত বড় হয়ে যায় যে তাদের পৃষ্ঠটান আর ঠিক থাকতে পারে না এবং সেগুলো ফেটে যায়। ফলে উপচে পড়ার মতো ফেনা তৈরি হতে পারে না।

সূত্র: সায়েন্স এবিসিদৈনিক কতটুকু পানি পান করতে হবে

Read full story at source