ট্রাম্প কেন মুক্তিকামী ইরানিদের সঙ্গে প্রতারণা করলেন
· Prothom Alo

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার ফলে ইরানের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কোনো নীতিগত অবস্থান বলার সুযোগ নেই। বরং এটিকে একটি রাজনৈতিক, সামরিক ও নৈতিক ব্যর্থতা আড়ালের শেষ মুহূর্তের চেষ্টা বলা যেতে পারে।
Visit turconews.click for more information.
বিশ্ব মূলত তেহরানের ধর্মভিত্তিক ও দমনমূলক শাসনব্যবস্থার অন্তিম পরিণতি দেখার অপেক্ষায় ছিল। সে বিষয়ে কথা না বলে ট্রাম্প কেবলই অঙ্কের হিসাব কষছেন। তিনি বলছেন ইরান প্রতিদিন ৫০ কোটি ডলার হারাচ্ছে, সেনাদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে না এবং তাদের নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে। নীতিনির্ধারকেরা যখন সত্যিকারের কোনো রাজনৈতিক সাফল্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হন, তখনই সাধারণত হিসাবরক্ষকদের মতো এমন ভাষায় কথা বলেন।
আমেরিকার যুদ্ধবিরতিই যেভাবে ইরানের যুদ্ধ জয়যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশের ভেতরে ও বাইরে ইরানিদের একটি বড় অংশ আশায় বুক বেঁধেছিল, চার দশকের বেশি সময় ধরে তাদের জীবনের ওপর চেপে বসা এই শাসনব্যবস্থার বোধ হয় এবার পতন ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু শিগগিরই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, আলী খামেনির ব্যবস্থার পতন ঘটানো এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য নয়। মূলত আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে সাজানোর জন্যই এই যুদ্ধ। আর এর জন্য যদি রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে খোদ ইরানকেই বলিদান করতে হয়, তাতেও কারও কোনো আপত্তি নেই।
যাঁরা মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁরা বুঝতেন এই যুদ্ধটি তাঁদের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে না। ট্রাম্প ইরানের আর্থিক পতনের হুমকির কথা শোনাচ্ছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর চাপ সৃষ্টির কথা বলছেন এবং জলপথটি আবার খুলে দেওয়ার জন্য তেহরান ‘ভিক্ষা’ চাইছে বলেও ইঙ্গিত দিচ্ছেন। অথচ এর চেয়েও বড় একটি সত্য তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। আর সেই সত্যটি হলো, যে সরকারের ঘাঁটিতে বোমা হামলা হয়েছে, যাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে এবং জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা নিহত হয়েছেন, তারা কিন্তু ঠিকই এখনো টিকে আছে।
ট্রাম্প ভবিষ্যতে কী করবেন, তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না। সব কটি দরজা আধা খোলা রাখা এবং সব পরিস্থিতিকে যুক্তিসংগত হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে তিনি কেবল একটি পরিণতির দিকেই পথ প্রশস্ত করছেন। আর তা হলো ইরানের জনগণের সঙ্গে নয়, বরং তেহরানের ওই বর্তমান সরকারের সঙ্গেই চুক্তিতে আসা।
এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন একটি পরিণতি অনেক ইরানিকেই পিছিয়ে আসতে বাধ্য করেছে। তাঁরা যখন বুঝতে পারেন এই যুদ্ধ বর্তমান সরকার অপসারণের বদলে খোদ ইরানকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষের একাংশ ‘বহিরাগতদের মাধ্যমে উদ্ধার পাওয়ার’ মানসিকতা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। সরকার উচ্ছেদের ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে প্রচার করা এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ‘ইরানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ তত্ত্বটিকেই শক্তিশালী করেছে। ফলে ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ নামে নতুন করে ভিন্নমত দমনের সুযোগ পেয়ে গেছে ইরান সরকার।
ট্রাম্প ভবিষ্যতে কী করবেন, তা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারে না। সব কটি দরজা আধা খোলা রাখা এবং সব পরিস্থিতিকে যুক্তিসংগত হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে তিনি কেবল একটি পরিণতির দিকেই পথ প্রশস্ত করছেন। আর তা হলো ইরানের জনগণের সঙ্গে নয়, বরং তেহরানের ওই বর্তমান সরকারের সঙ্গেই চুক্তিতে আসা।
ইরান যুদ্ধ যেভাবে শেষ হতে পারেএমন পরিস্থিতি যদি কোনো সমঝোতার রূপ নেয় এবং বর্তমান শাসকগোষ্ঠী টিকে থেকে নতুনভাবে বৈধতা পায়, তবে ৪০ বছর ধরে এই ব্যবস্থায় বন্দী থাকা ইরানের সাধারণ মানুষ তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। এই যুদ্ধে এবং এর আগের নানা গণ-অভ্যুত্থানে যে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁরা যে বিশ্বকে সঠিক বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, এটি হবে তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আর বার্তাটি হলো তেহরানের সমস্যা কেবল এর আচরণ বা আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষাতেই আটকে নেই। বরং এক আবদ্ধ ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্তমান সরকারের অস্তিত্বটাই এখানকার মূল সমস্যা।
আর তাই এত বোমা হামলা ও ক্ষতির পরও বর্তমান সরকারের টিকে থাকার এই বিষয়টি একটি চূড়ান্ত পরাজয়ের কঠোর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এটি ওই বিশ্বাসের পরাজয়, যেখানে মনে করা হতো যুদ্ধ কখনো পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে। এটি ওই সব মানুষের পরাজয়, যাঁরা আজ দেখতে পাচ্ছেন যে এমন একটি আলোচনার টেবিলে তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হচ্ছে, যেখানে খোদ তাঁদেরই কোনো জায়গা নেই।
যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইসরায়েলের ফাঁদে পড়েছেবহির্বিশ্ব এবং ইরানের আধিপত্যবাদী নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো মোটেও এমন কিছুর অপেক্ষায় ছিল না। কোনো অনন্ত যুদ্ধবিরতি কিংবা দর-কষাকষির মাধ্যমে নিজেদের সুবিধামতো হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা খোলার কৌশলও তাদের কাম্য ছিল না। বরং তারা চেয়েছিল গোষ্ঠীগত নানা সামরিক বাহিনীর ছায়াযুদ্ধ ও পুরোনো রীতির বাইরে এসে একটি মৌলিক সমাধান বেরিয়ে আসুক, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে নতুন করে গড়ে তুলবে।
কারাম নামা ব্রিটিশ-ইরাকি লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত