হাওরের কৃষকের ঘুম-শান্তি কেড়ে নিয়েছে ‘পানি’

· Prothom Alo

সকালে হালকা বৃষ্টি ছিল। দুপুরের পর কিছুটা রোদ উঠলে চনমনে হয়ে ওঠে প্রকৃতি। কিন্তু বিকেল গড়াতেই আবার আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসে। বিদ্যুৎ চমকানোর পাশাপাশি মেঘ ডাকে, ঝোড়ো বাতাস বইতে থাকে। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি হাওরপারের কৃষকের চোখ থেকে ঘুম ও মন থেকে শান্তি কেড়ে নিয়েছে। কৃষকের চোখের সামনে ধানের খেত ডুবছে। কিছুই করার থাকছে না।

Visit playerbros.org for more information.

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের বিরইমাবাদ এলাকায় গেলে কৃষকদের মধ্যে ফসল ডোবার হাহাকার টের পাওয়া যায়। দূর থেকে মানুষের কর্মতৎপরতা দেখে মনে হয়, উৎসব চলছে। কিন্তু ভারী বর্ষণ ও ঢলের পানি হাওরপারের কৃষকের ফসল তোলার এই আনন্দ-উৎসবকে নিঃশব্দ-নীরব কান্নার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বিরইমাবাদ গ্রামের কৃষক দুলাল মিয়া বলেন, ‘দুই দিনে পানি বাড়ছে। মাইনষে ধান কাটতো পারের না। (কাউয়াদীঘি) হাওরের ফাটাইংরা (ফাটাসিংড়া) বিলর পাড়ে আমার ৩০ কিয়ার (১ কিয়ারে ৩০ শতক) খেত পানির তলে। মাত্র দুই কিয়ার কাটছি। এক হাত পানি কমলে ধান কিছুটা ভাসতো পারে, তখন মানুষ কিছু বাঁচত পারে। ধান পাকি (পেকে) গেছে। কাটার টাইম মিলছে না।’ তিনি বলেন, পানির ধান কাটার জন্য এখন শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা। মজুরি ছাড়াও প্রত্যেক শ্রমিককে ১৫০ টাকা করে যাওয়া-আসার ভাড়া, ধানের আঁটি পাড়ে আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৫০০ টাকা। এরপরও শ্রমিক পেলে মানুষ ধান কাটানোর চেষ্টা করছেন। বেশি টাকা গেলেও ধান তো ঘরে তোলা যাবে।

রোদ উঠলেও শঙ্কা কাটেনি হাওরে, ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা

সরেজমিনে দেখা যায়, হাওরের বুক থেকে ছোট ছোট নৌকা পাড়ের দিকে ভেসে আসছে। সেই নৌকাগুলো পাড়ে লাগানোর পর কৃষকেরা নৌকা থেকে ধানের আঁটি তুলে শুকনা স্থানে রাখছেন। কেউ যন্ত্রে ধান মাড়াই করছেন। কেউ ভেজা ধান স্তূপ করে রাখছেন। কেউ আবার সেই ধান বস্তায় ভরা হচ্ছে। শ্রমিকেরা ধানের বস্তা কাঁধে ও মাথায় করে শুকনা স্থানে অবস্থান করা ট্রাকে নিয়ে তুলছেন।

নারাইনপুরের শাহজান মিয়া বলেন, ‘আমার সাড়ে পাঁচ কিয়ার খেত। কাটছি আড়াই কিয়ার। আর কাটার সুযোগ নাই। গত চাইর (চার) দিনে হাওরো পানি বাড়ছে। ধানর ছড়ার আগা পানির নিচে ডুবি গেছে। পানি কমছে না।’ কবির মিয়া বলেন, ‘আমরার শান্তি নাই। ১৫ কিয়ার পানির তলে। এর মাঝে চাইর কিয়ারর ধান কোনো রকম তুলছি। শ্রমিক নাই, নৌকা নাই। নৌকার ভাড়াও বেশি। এখন ধান অইল (হলো) নৌকার, আর কৃষক অইল ফকির।’

সত্যনারায়ণ নুনিয়ার বাড়ি জেলার রাজনগর চা-বাগানে। তিনি কাউয়াদীঘি হাওরের বিরইমাবাদ এলাকায় ৩০ কিয়ার জমি বর্গাচাষ করেছিলেন। ধান সম্পূর্ণ পাকেনি। ধান পাকলে কাটবেন—সেই অপেক্ষায় ছিলেন। তার আগেই পানি এসে সব তলিয়ে নিয়েছে। সত্যনারায়ণ নুনিয়া বলেন, ‘লাভের লাগি (জন্য) দুইটা গরু আড়াই লাখ টাকা বিক্রি করি খেত করছিলাম। সব টাকা খেতে দিছি। এখন সব খেত পানির তলে। সব টাকা গেছে। ধান যে কাটব, কামলা নাই। একটা কামলার রোজ ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। তা-ও গাড়ি দিয়া আনতে হয়।’

ধানের খেত পানির নিচে এমন অনেকের মধ্যে রাজনগরের মনিলাল ভর জানিয়েছেন, তাঁর দুই কিয়ার এখন পানির নিচে। এ রকম পারভেজ মিয়ার ২৫ কিয়ার, বাবুল নুনিয়ার ছয় কিয়ার, জয়কুমার নুনিয়ার ১০ কিয়ার, শিপন মিয়ার ১৫ কিয়ার তলিয়ে আছে। চাউরুলির হানিফ মিয়া বলেন, ‘২২ কিয়ার খেত করছি। পাঁচ কিয়ারর ধান কাটছি। হঠাৎ পানি আইছে (আসছে)। বাকি ধানর আর আশা নাই।’

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছে কৃষি বিভাগ। তখন ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানা যাবে। গতকাল পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে হাওরাঞ্চলে ৯৪১ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে বলে স্থানীয় কৃষকেরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে শিলাবৃষ্টিতে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার প্রায় সাড়ে ৩০০ হেক্টর জমির ধান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পানির নিচে তলিয়ে আছে পাকা-আধা পাকা ধান। বৃহস্পতিবার বিকেলে মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারের বিরইমাবাদে

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌলভীবাজারের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাওরে ঢলের পানি নামছে। পানি কিছু বাড়ছে। এ পর্যন্ত হাওরে ৮৩ শতাংশ এবং হাওরের বাইরে ২৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে হাওরে দেখেছি কৃষকেরা গলা পানি, কোমর পানিতে নেমে ধান কাটছেন। এভাবে কৃষকেরা ডোবা ধানের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কেটে তুলতে পারবে বলে অনুমান করছি।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলার নদ-নদীর পানি অনেক কমছে। বিপৎসীমার অনেক নিচে। হাওরে অল্প কিছু বাড়ছে। একসঙ্গে অনেক বৃষ্টি হয়ে গেছে। সারা মাসে যেখানে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা। সেখানে দুই দিনে প্রায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আর ভারী বৃষ্টি না হলে পানি অনেক কমে যাবে। হাওরের নিচের দিকে চার-পাঁচ ফুট পানি। ওপরের দিকে সমস্যা নেই। বৃষ্টি না হলে ধান ওঠানো যাবে।’ তিনি বলেন, ‘কাউয়াদীঘি হাওরের পানি কমাতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। যতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকে সেচ চলছে।

Read full story at source