হাওরে ২ হাজার টাকা মজুরিতেও মিলছে না ধান কাটার শ্রমিক, হারভেস্টারের ভাড়া চার গুণ
· Prothom Alo

টানা বৃষ্টির কারণে এক সপ্তাহের ব্যবধানে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে কৃষিশ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দুই হাজার টাকা দৈনিক মজুরিতেও শ্রমিক মিলছে না। অন্যদিকে ধানমাড়াই যন্ত্রে (হারভেস্টার) ধান কাটাতে গুনতে হচ্ছে চার গুণ পর্যন্ত বেশি ভাড়া। সব মিলিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।
Visit freshyourfeel.org for more information.
গতকাল শনিবার বিকেলে করিমগঞ্জের বড় হাওরে হাঁটুসমান পানিতে কাঁচি দিয়ে ধান কাটছিলেন কৃষক সাইদুর রহমান। তাঁকে সহযোগিতা করছিল নবম শ্রেণিপড়ুয়া এক ছেলে এবং দ্বাদশ শ্রেণির আরেক ছেলে। ১০ বছর বয়সী মেয়ে কাটা ধানের আঁটি টেনে নিয়ে পাশের ডিঙি নৌকায় রাখছিল। এক পরিবারের সবাই মিলে ধান কাটার এমন দৃশ্য এখন হাওরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে।
শিশুসন্তানদের নিয়ে পানিতে নেমে ধান কাটার বিষয়ে সাইদুর রহমান জানান, যাঁদের ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, তাঁরা সব আশা ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু যাঁদের ধান অপেক্ষাকৃত একটু উঁচু জায়গায়, বৃষ্টির পানিতে কোথাও হাঁটুপানি আর কোথাও কোমরপানিতে পাকা ধান দুলছে। তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে সেই ধান দেখে কি আর সহ্য করা যায়? কিন্তু ধান কাটার শ্রমিক পাব কোথায়? গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে তীব্র শ্রমিকসংকট দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে যে শ্রমিক পাওয়া যেত ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়, সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে সেই শ্রমিক এখন মিলছে না দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকায়ও। সাত শ টাকা মণের ধানের জন্য দুই হাজার টাকা রোজে শ্রমিক নিলে কৃষকের থাকবে কী? সে জন্যই কূলকিনারা না পেয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিজের ধান নিজেই কাটছি।’
স্ত্রীসহ পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে একইভাবে ধান কাটছেন বড়াটিয়া হাওরের কৃষক আবদুল কাদির। তিনি বলেন, সবাই যেন বিপদের সময়ে সুযোগ নিচ্ছেন। একে তো বৃষ্টি হলেই বুক ধরফর করে—এই বুঝি কষ্টের ফসল তলিয়ে গেল; অপর দিকে তীব্র শ্রমিকসংকট আর হারভেস্টার মেশিনমালিকদের তালবাহানায় কৃষকেরাই মনে হচ্ছে সবচেয়ে অবহেলিত। টানা বৃষ্টির কারণে অনেক জমিতে হারভেস্টার মেশিনও যাচ্ছে না। যেগুলোতে পানি কম, সেগুলোতে গেলেও যেখানে প্রতি একরে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা ভাড়া হওয়ার কথা, সেখানে এখন দিতে হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। সে ধান ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করলে কৃষকেরা বাঁচবেন কী করে? সেটা দেখার যেন কেউ নেই।
টানা বৃষ্টির কারণে অনেক জমিতে হারভেস্টার মেশিনও যাচ্ছে না। গতকাল শনিবারজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার পর্যন্ত হাওরে ৫০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছিল। এরপর টানা বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে ধানখেত তলিয়ে যেতে শুরু করে। গতকাল পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৩২ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক শতকোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কৃষকদের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ইটনার ধনু-বৌলাই নদ ও চামড়া ঘাটের মগড়া নদীর পানি ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
এক সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে হাওরের অসংখ্য জমি পানির নিচে চলে গেছে। ধারদেনা করে উৎপাদিত ধান ফেলে খালি হাতে বাড়িতে ফিরছেন অনেক কৃষক। তবে অপেক্ষাকৃত উঁচু বা সেমি–হাওর এলাকায় এখনো কিছু পাকা ধান রয়ে গেছে। শ্রমিক ও হারভেস্টার–সংকটের কারণে সেগুলো কাটতেও হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগের বছরগুলোতে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো শ্রমিক কিশোরগঞ্জে আসতেন ধান কাটতে। কিন্তু এবার মৌসুমের শুরুতেই বৈরী আবহাওয়ার কারণে শ্রমিক আসা কমে গেছে।
ফলে স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে বিপুল পরিমাণ জমির ধান কাটা, মাড়াই, গোলায় তোলা ও খড়ের গাদা তৈরি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে হারভেস্টার মেশিন ভাড়া ঘিরে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগও উঠেছে। কৃষকেরা বলছেন, এই চক্র ইচ্ছেমতো ভাড়া নির্ধারণ করছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, হাওরাঞ্চলের জন্য ৩৬৭টি কম্বাইন হারভেস্টার দেওয়া হয়েছে, যার ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। তবে এই সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। প্রতি একর ধান কাটার জন্য ছয় হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নিচু ও পানিবদ্ধ জমিতে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দুর্যোগকে পুঁজি করে অস্বাভাবিক ভাড়া নেওয়া উচিত নয়। বিষয়টি নিয়ে হারভেস্টারমালিক ও কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।