‘ও, জামাকাপড় বিক্রি করে আসছে, ওকে দিয়ে আর কী হবে!’
· Prothom Alo
সেরা নবাগত অভিনয়শিল্পী হিসেবে মেরিল–প্রথম আলো পুরস্কার পেয়েছেন শাম্মী ইসলাম নীলা। তাঁর মডেল থেকে অভিনেত্রী হওয়ার গল্প শুনলেন মনজুরুল আলমঅভিনেত্রী শাম্মী ইসলাম নীলা। ছবি: খালেদ সরকার
শুরুতেই জানতে চাই, পুরস্কার কতটা বদলে দিল? একটু সময় নিয়ে জানালেন, কাঁধে অনেক ভারী কিছু পেয়েছেন। এটা তাঁর দায়িত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে সেটা বুঝতে পারছেন। ‘বদলে যাওয়া বলতে এটাই, আমাকে আরও ভালো কাজ করতে হবে। সেই চাপটা অনুভব করছি। এখন নিজেকে আরও প্রমাণ করার সুযোগ পেলাম। এই পুরস্কারের মাধ্যমে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো,’ বলেন নীলা।
নীলার এই অর্জনে স্বামী, মা, শাশুড়িসহ পরিবারের সবাই খুশি। পুরস্কার ঘিরে বাসায় মজার কিছু ঘটেছে—এমন প্রশ্নে নীলা হেসে বলেন, ‘আমার স্বামী মজা করে বলেছেন, অ্যাওয়ার্ডকে খাওয়াচ্ছি কি না, অ্যাওয়ার্ড নিয়ে ঘুমাচ্ছি কি না। পরিবারের সবাই খুশি। তারা বোঝে, এটা বড় অর্জন।’
Visit extonnews.click for more information.
অভিনেত্রী শাম্মী ইসলাম নীলা। ছবি: খালেদ সরকারপথচলার শুরু
মডেলিং দিয়ে ক্যারিয়ার শুরুর বেশ পরে অভিনয়ে আসেন নীলা। প্রথম লাভ সাব নামে একটি নাটকে অভিনয় করেন। তৌসিফ মাহবুবের সঙ্গে খুবই ছোট একটি চরিত্র। নাটকের সেই অংশটা ভাইরাল হয়। নীলা বলেন, ‘পরে তৌসিফ ভাই আমাকে ডেকে আরেকটি গল্পের জন্য বলেন। তখন ফার্স্ট লাভ–এ কাজ করি। সেই নাটক দিয়েই পুরস্কার পেলাম।’
মডেল হিসেবেই পরিচিতি আছে, তাহলে এক দৃশ্যের নাটকে কেন অভিনয় করলেন? ‘অভিনয় নিয়ে জানার ইচ্ছা ছিল। অনেকেই বলতেন অভিনয় করি না কেন, একটু ভয় লাগত। মুঠোফোনে লাইভ করা আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো এক নয়। স্ক্রিন টেস্ট করার জন্যই প্রথম নাটকে নাম লেখানো। নাটকে আমাকে কেমন দেখা যাবে, সবাই কীভাবে নেবে, অনেক মানুষের সামনে অভিনয় করতে পারব কি না, ক্যামেরার সামনে ভয় লাগবে কি না—এসব পরীক্ষা করার জন্যই নাম লেখানো,’ বললেন তিনি।
অভিনেত্রী শাম্মী ইসলাম নীলা। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যেঐশ্বরিয়ায় প্রেরণা
শৈশব থেকেই বলিউড অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়া রায়ের অভিনয়ে মুগ্ধ নীলা, ‘ঐশ্বরিয়ার কাজগুলো আমাকে অনুপ্রাণিত করে। মূলত এ কারণেই মিস ওয়ার্ল্ডে যাওয়া ও মডেল হওয়া।’ ঐশ্বরিয়া মডেল থেকে পরে অভিনয়ে নাম লেখান, আপনিও কি সেই পথে হাঁটছেন? ‘আমার শুরুটা অভিনয় দিয়েই করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু হয়নি। এখন অভিনয়ে আমার ভালোবাসা বেশি। কারণ, মনে হয় আমার আলাদা আলাদা ট্যালেন্ট রয়েছে। আমার অভিনয় ট্যালেন্ট তৌসিফ ভাই বুঝতে পেরেছিলেন। যে কারণে আমাকে নাটকে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছিলেন। তার পর থেকে এটা মনে হয়েছে, অভিনয় আমার পক্ষে সম্ভব।’
মডেলিং থেকে পাওয়া
শুরুর দিকে মডেলিংয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। জীবনই তাঁকে মডেলিংয়ে টেনে নিয়ে যায়। মডেলিংয়ে গিয়ে নিজেকে নতুন করে চিনেছেন। সেসব কথাই জানতে চাই। ‘কথা বলা শিখেছি, কীভাবে উপস্থাপনা করতে হয়, আচার-আচরণ কেমন হবে, সেটা শিখেছি। জীবনে চলার পথে বড় একটি ট্রেনিং নিয়েছি। মডেলিংয়ের প্রতি ভালোবাসা থাকবে।’ তবে র্যাম্পে দেখা যায় না কেন—প্রশ্ন শুনেই দ্রুত উত্তর দিলেন নীলা, ‘র্যাম্প মডেল আমি কখনোই হতে চাই না। এ জন্য আরও অনেকেই যোগ্য। তারা উচ্চতায়, দক্ষতায় অনেক এগিয়ে। সবাইকে সবকিছু করতে হবে, এমনটা মনে করি না।’
যেভাবে দায়িত্ব কাঁধে
বহুবার তাঁকে শুনতে হয়েছে, ক্যারিয়ারে সবকিছু খুব সহজে পেয়ে গেছেন তিনি। এসব কথায় তাঁর মন খারাপ হয়। ‘চোখের সামনে দিনের পর দিন বাবাকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতে দেখেছি। একসময় আমাদের আইসিইউ বিল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। অথচ বাবাই ছিলেন একমাত্র আয়ের মানুষ। তখন আমরা কেউই ভালো ছিলাম না। যখন আমার বন্ধুদের সঙ্গে হাসি–খেলা–আড্ডায় মেতে থাকার কথা, তখন আমাকে দায়িত্বের কথা ভাবতে হয়েছে।’ তখন নীলার বয়স ছিল ১৭। কী করবেন, কিছুই জানতেন না। কিছুটা সময় নিয়ে বলেন, ‘ফেসবুকে নানা কিছু করার চেষ্টা করি। লাইভ করি, পোস্ট দিই, মার্কেটিংয়ের কাজ করি। ব্র্যান্ডিং করতেও শিখেছি। অনলাইনে জামাকাপড় বিক্রি করতে হয়েছে। যে কারণে অনেকেই বলতেন, “ও, জামাকাপড় বিক্রি করে আসছে, ওকে দিয়ে আর কী হবে।” নেতিবাচক কথা কানে নিইনি। কাপড় বিক্রি করেই আইসিইউর বিল দিয়েছি। আমার জার্নিটা এত সহজ ছিল না। পরিশ্রম করে আজকের স্থানে আমাকে আসতে হয়েছে।’
মডেলিং, অভিনয় থেকে পুরস্কার—এই যাত্রা নীলাকে শিখিয়েছে অনেক কিছু। তাঁর ভাষ্যে, ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ হওয়ার পর একটা কথাই বারবার মনে হলো, আমাদের দেশের নারীদের ঠিকমতো কথা বলতে শেখাটা জরুরি। অনেক নারী মেধাবী। অথচ কতজন নিজের দক্ষতা তুলে ধরতে পারেন? এই প্ল্যাটফর্মে এসে আমি বুঝতে শিখেছি, বড় অর্জনের জন্য সুন্দর করে কথা বলতে হয়, সুন্দর চিন্তা করতে হয়, সর্বোপরি নিজের দক্ষতা অর্জন করতে হয়। আজ আমি বড় বড় প্রতিষ্ঠান, ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করি। এগুলো একদিনে হয়নি। প্রতিযোগিতা করে আমাকে টিকে থাকতে হয়েছে। নারী হিসেবে নয়, গুণ আছে বলেই আমি প্রায়োরিটি পাই।’
বিদেশে গিয়ে কেন ‘কন্ট্র্যাক্ট ম্যারেজ’ করতে হয়? আসছে সেই গল্পঅভিনেত্রী শাম্মী ইসলাম নীলা। ছবি: শিল্পীর সৌজন্যেটিকে থাকার অর্থ
নীলার অভিনয় নিয়ে স্কুলিং নেই, থিয়েটার থেকেও শেখা হয়নি। অভিনয় অঙ্গনে টিকে থাকার কথা মাথায় এলে কী মনে হয়? ‘ভাবছি অভিনয়ের মাধ্যমেই সহশিল্পীদের কাছ থেকে শিখব। সহশিল্পীদের ভালো জিনিসগুলোই আয়ত্ত করতে চাই। এর বাইরে পড়াশোনা, সিনেমা দেখা তো রয়েছেই। টিকে থাকা মানেই আমার কাছে পরিশ্রম,’ বলেন নীলা। কিছুটা থেমে আবার বললেন, ‘আমার পথচলায় আশপাশের অনেকেই সহায়তা করেছেন। আমি দেখতে মিষ্টি ছিলাম, যার কারণে কেউ কখনোই অন্যভাবে দেখেনি। সবাই অনেক স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। একটা কথাই বলব, যোগ্যতা দিয়েই সেরা নবাগত অভিনেত্রীর সম্মান পেয়েছি। এই সম্মান আমাকে অনেক দূরে নিয়ে যাবে। আরও অনেক অর্জন বাকি।’
বছরে ৫ নাটক
টানা নাটকে অভিনয় করার তাঁর ইচ্ছা নেই। জানালেন, বছরে পাঁচটা ভালো গল্পের নাটকে অভিনয় করতে চান। ঈদের কিছু কাজের চিত্রনাট্য পেয়েছেন। বললেন, ‘একদমই গতানুগতিক গল্প। এমন গল্পে আমি কাজ করতে চাই না। যেহেতু সিনেমায় কাজ করার ইচ্ছা, সেই প্রস্তুতিটাই এখন কাজের মাধ্যমে নিতে চাই। অভিনয় অঙ্গনে আমার কেউ ছিল না। একটু একটু করে এগিয়েছি। এখন প্রাপ্তির খাতা ভারী হচ্ছে। গতানুগতিক কাজ কেন করব?’