আম্মা বলতেন, সুখে থাকার জন্য চেষ্টা কোরো না, ভালো থাকো...
· Prothom Alo

ফেসবুকে সক্রিয় আফজাল হোসেন। প্রায়ই ছবি দিয়ে বা নানান বিষয় লিখে নিজের অনুভূতি জানান। আজ সোমবার একটা সাদা–কালো ছবি দিয়ে মায়ের স্মৃতিচারণা করেছেন বরেণ্য এই নির্মাতা, অভিনেতা ও চিত্রশিল্পী। সেই লেখাটা প্রথম আলো বিনোদন পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।
এখনো আমি সেই পারুলিয়া থেকে আসা ছেলেটি আছি বলে মনে হয়। শহর আমাকে লোক বানিয়ে দিতে পারেনি। প্রবল টানেই শহরে এসেছিলাম। পা ফেলার দিন থেকেই চেয়েছি, এই শহর আপন করে নিক। নিজেও তার আপন হয়ে উঠতে চেয়েছি। কিন্তু মনে মনে বলেছি, তোমার সবকিছু আমার চাই না।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
গ্রামের ঘন প্রেম ভেদ করে আপাদমস্তক নাগরিক হয়ে ওঠার ইচ্ছা দৈর্ঘ্যে–প্রস্থে বেড়ে উঠতে পারেনি। এখনো প্রায়ই পারুলিয়া তার নানা রকমের বর্ণ–গন্ধ আমার মনের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়। মাঝেমধ্যেই মনে হয়, হারিকেন থেকে মেখে যাওয়া কেরোসিনের গন্ধ হাতে লেগে আছে। কখনো কখনো চড়ুই পাখির ডাক বিনা টিকিটে আমাকে পারুলিয়া ভ্রমণে নিয়ে যায়।
অসুন্দরকেও দেখে মানুষ ‘বাহ্’ বলতে পারে, এটাই শিল্পের ক্ষমতা: আফজাল হোসেনআফজাল হোসেনদেখি মুখখানা বদলে গেছে। মুখময় অজস্র অচেনা রেখা, মন রয়ে গেছে সেই পুরানোটাই। এই দীর্ঘ বয়স পর্যন্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সংকোচে ভোগা স্বভাবটা সামান্য পাতলা হয়ে যায়নি। আশা আকাঙ্ক্ষার রূপেরও বদল হয়নি।
কত কিছু দেখে দেখে বয়স বেড়ে গেছে অনেক, এখনো এই মনে চাওয়া–পাওয়ার ছটফটানি নেই। প্রয়োজনে কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছা হলে বলার আগে ভেবে দেখি, তাঁকে বিরক্ত করা হবে কি না। এখনো ভুলিনি, জটিল হওয়া ভালো নয়। উপকার বা সহযোগিতা পেলে কৃতজ্ঞ হতে হয়।
প্রিয়জনদের কাছে আমার দাবি কম। কিন্তু প্রিয় বলেই অহরহ তাঁদের সন্তুষ্টির জন্য কিছু করতে পারি কি না, ভাবি। কারও মন্দ ভূমিকায় আহত হই কিন্তু মনে করি না, আমিও তাঁর বা তাঁদের প্রতি মন্দ হব। অপ্রিয় মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করি না, মনে মনে তাঁদের ও আমার মাঝখানে একটা বেড়া তুলে দিই, সে অদৃশ্য বেড়া একটা দূরত্ব তৈরি করে রাখে। স্বস্তিতে থাকতে পারি।
মনে অনেক প্রশ্ন, উত্তর পাই না: আফজাল হোসেনআফজাল হোসেনবিশ্বাস করি, সব মানুষ সমান নয়, স্বভাবে বিচিত্র হওয়ারই কথা। এ সত্য মনে রাখলে, মেনে নিতে পারলে ভালো থাকা যায়। অতএব পুরানো বয়সের মনটাকে সব সময় বাবা–বাছা করে বোঝাই, কারও ওপর রুষ্ট হয়ো না, শান্ত থাকো। ঠান্ডা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে, আমার ভালো থাকা আমারই হাতে।
ভালোর প্রশংসা করতে পারি মন খুলে। সামান্য মিথ্যা বলতে গেলে এখনো বুক কাঁপে। এখনো প্রশংসা শুনলে লজ্জা পাই। আমরা তিন ভাইবোন দেখতে এক রকম নই, কিন্তু মন এক রকমের, নরম। আমরা একসঙ্গে হলে বাচ্চাদের বলি, সময়ের প্রয়োজনে একটু শক্ত হতে হবে। তারাও নরম।
সবাই জানি, কারও ‘আমি কী হনুরে’ ভাব দুনিয়াতে কেউই পছন্দ করে না। যোগ্যতা নিয়ে বড়াই করা মানুষদের বোকা বোকা লাগে, তা মনে রাখি। মনে রাখি, আমাদের মতো মানুষদের যোগ্যতার মধ্যে নানা অসম্পূর্ণতা রয়েছে। সে অসম্পূর্ণতা কাটানোর চেষ্টাতেই জীবন মুখর থাকে, রাখে আনন্দ ও উত্তেজনাময়।
আফজাল হোসেনআম্মা, আপনি বলতেন, সুখে থাকার জন্য চেষ্টা কোরো না, ভালো থাকো, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা কোরো; সেটাই মনে সুখ এনে দেবে। বলতেন, ঘরময় যদি ভালোবাসা ধরে রাখতে পারো, সে ভালোবাসা রোদ ও হাওয়ার সাথে চারপাশেও ছড়িয়ে পড়বে।
প্রায়ই আপনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, নিঃস্বার্থ থেকো। অপরকে ঠকিয়ে নিজের বিশেষ লাভ হয় না। চারপাশে অনেক ঠকিয়ে বড় হওয়া মানুষ দেখবে। তারা অর্থে–বিত্তে বড় হয়েছে, কিন্তু নিজের মনের কাছে বড় হয়ে উঠতে পারে না। মানুষ ঠকিয়ে বড় হওয়া মানে জনমভর নিজের কাছে ছোট হয়ে থাকা।
আম্মা, ছোটবেলায় কলতলায় ধরে নিয়ে গিয়ে জোরজবরদস্তি করে সাবান মাখিয়ে গোসল করানোর সময় একটু রাগ করেই বলতেন, মানুষ হয়ে বাঁচো। এখন নিয়মিত সাবান মেখে গোসল করি, এত গোসল, এত সাবানে ‘মানুষ হয়ে বাঁচো’ কথাটা ধুয়ে যায়নি।
আপনি নেই, আব্বাও নেই; কিন্তু আপনাদের জীবনের সৌন্দর্য, মনের শুভ্রতায় আমরা, সন্তানেরা মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টায় আছি।
মা দিবস কেটেছে ক্যামেরার সামনে, আপনাকে মনে করে করে।