হান্টাভাইরাস কী, কীভাবে ছড়ায়

· Prothom Alo

আটলান্টিক মহাসাগরের একটি প্রমোদতরিতে হঠাৎ করেই হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। যেখানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাধারণত ইঁদুরের মলমূত্র বা লালার সংস্পর্শ থেকে এই বিরল রোগটি মানুষের শরীরে ছড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত দুজনের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেছে এবং আরও পাঁচজন পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। রহস্যময় ঘটনাটি ঘটেছে একটি জাহাজে, যা আর্জেন্টিনা থেকে পশ্চিম আফ্রিকার কেপ ভার্দের দিকে যাচ্ছিল।

শুরুতে হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর শরীরে সাধারণ ফ্লু বা জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এর মধ্যে ক্লান্তি, কাঁপুনির সঙ্গে জ্বর ও শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা অন্যতম। তবে সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এই ভাইরাস আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এটি সরাসরি মানুষের হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস কিংবা কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। ফলে রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয় ও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়, যা প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

Visit moryak.biz for more information.

তবে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে আশ্বস্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তারা জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের জন্য এই ভাইরাসের ঝুঁকি এখনো অনেক কম। তবে বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয় নিয়ে বেশ অবাক হয়ে আছেন এখন। এত কড়া নিরাপত্তার প্রমোদতরিতে ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ানো এই ভাইরাস কীভাবে পৌঁছাল? বর্তমানে সেটা জানতে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।

তারকাদের পছন্দের আইসক্রিমআটলান্টিক মহাসাগরের এই প্রমোদতরিতে হঠাৎ করেই হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে

হান্টাভাইরাস কী?

হান্টাভাইরাসের বসবাস হলো ইঁদুরজাতীয় প্রাণীদের শরীরে। এটি সাধারণত ইঁদুরের লালা, প্রস্রাব বা মলের মাধ্যমে ছড়ায়। মানুষ যখন ইঁদুরের শুকনো মল পরিষ্কার করতে গিয়ে ঝাড়ু দেয়, তখন ওই মল থেকে ভাইরাসের ক্ষুদ্র কণাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায়। নিশ্বাসের সঙ্গে সেই বাতাস ভেতরে গেলেই মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া ইঁদুরের কামড় বা আঁচড় থেকেও এটি ছড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত ডিয়ার মাউস নামের একপ্রকার ইঁদুর এই ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করে।

মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ কি সম্ভব?

সাধারণত হান্টাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। তবে দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া অ্যান্ডিস স্ট্রেইন নামের একটি ব্যতিক্রমী ভাইরাস খুব বিরল ক্ষেত্রে একজনের দেহ থেকে অন্যজনে ছড়াতে পারে। সম্প্রতি এমভি হন্ডিয়াস নামের জাহাজে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর বিজ্ঞানীরা কিছুটা চিন্তিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মারিয়া ভ্যান কারহোভ জানিয়েছেন, আক্রান্তরা একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকায় মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের সম্ভাবনা এখনই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কেন কিছু মাছ নিজের বাচ্চাকে খেয়ে ফেলেইঁদুর থেকে ছড়ায় হান্টাভাইরাস

লক্ষণগুলো কেমন হয়?

হান্টাভাইরাস মূলত দুই ধরনের জটিল রোগ সৃষ্টি করে মানবশরীরে। কিডনির সমস্যা সাধারণত এশিয়া ও ইউরোপে বেশি দেখা যায়। এর শুরুতে মাথাব্যথা, পেটে ব্যথা আর বমি বমি ভাব হয়। পরে এটি কিডনি বিকল করে দিতে পারে। এমনকি ৫ থেকে ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

ফুসফুসের সমস্যা মূলত আমেরিকায় দেখা যায়। শুরুতে সাধারণ ফ্লুর মতো মনে হলেও ধীরে ধীরে ফুসফুসে পানি জমে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সিডিসির তথ্যমতে, শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই প্রাণ হারান। সংক্রমণের এক থেকে আট সপ্তাহ পর সাধারণত এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

হান্টাভাইরাস থেকে বাঁচার উপায় কী?

সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, এখন পর্যন্ত হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। আক্রান্ত রোগীদের মূলত প্রচুর বিশ্রাম, পানি পান ও উপসর্গ অনুযায়ী আলাদা চিকিৎসা দেওয়া হয়। তাই এই রোগের হাত থেকে বাঁচার প্রধান উপায় সচেতনতা।

ঘরবাড়ি ইঁদুরমুক্ত রাখাই হলো সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। বাড়ির দেয়ালের ছিদ্র বন্ধ রাখা, খাবার ভালোভাবে মুখবন্ধ পাত্রে রাখা এবং ময়লা শক্ত ঢাকনাযুক্ত বালতিতে ফেলা উচিত। ইঁদুরের মল পরিষ্কার করার সময় বিশেষ সর্তকতা জরুরি। এ ছাড়া সেই জায়গার ওপর ব্লিচমিশ্রিত পানি স্প্রে করে অন্তত ৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। যাতে ভাইরাসটি মারা যায়।

গরু কেন মেঘ দেখলে ভয় পায়

কতটা ভয়ংকর এই রোগ?

বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষ হান্টাভাইরাসজনিত কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত হন। যার অর্ধেকই ঘটে চীনে। এমনকি গত বছর অস্কারজয়ী অভিনেতা জিন হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়াও নিউ মেক্সিকোতে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর বাড়িতে মৃত ইঁদুরের বাসা পাওয়া গিয়েছিল, যা থেকে ধারণা করা হয় তিনি সংক্রমিত হয়েছিলেন।

গত ৫ মে এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারি বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যান কারহোভ জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জন্য হান্টাভাইরাসের ঝুঁকি বেশ কম। এর কারণ ব্যাখ্যা করে বিশেষজ্ঞ বলেন, হান্টাভাইরাস কিংবা এর সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যান্ডিস স্ট্রেইনও মানুষের মধ্যে খুব একটা কার্যকরভাবে ছড়াতে পারে না।

নিউ মেক্সিকোতে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানকার প্রায় ২৫ শতাংশ ইঁদুর এই ভাইরাসে আক্রান্ত। কিন্তু সেই তুলনায় প্রতিবছর সেখানে গুটিকয় মানুষ সংক্রমিত হন। এর মানে ভাইরাসটি বিপজ্জনক হলেও এটি খুব সহজে একজনের শরীর থেকে অন্যজনে বা বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে না। অর্থাৎ সংক্রমণের হার বেশ দুর্বল। তাই এটি খুব বেশি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার ভয় কম।

সূত্র: সিএনএন, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকমানুষের চোখ কত রং দেখতে পায়

Read full story at source