সারি সারি বিছানায় অসুস্থ শিশুরা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় মা–বাবা
· Prothom Alo

হলরুমের মতো বিশাল কক্ষে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি বিছানায় শুয়ে আছে অসুস্থ শিশুরা। অনেকের মুখে ও গায়ে রয়েছে লালচে ফুসকুড়ি। কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউ করছে কান্না। কান্নারত শিশুদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন স্বজনেরা। এর মধ্যে নার্সরা এসে শিশুদের কারও ক্যানুলা খুলছেন, কেউ লাগিয়ে দিচ্ছেন স্যালাইন। কোনো কোনো শিশুকে নেবুলাইজার দিচ্ছেন অভিভাবকেরা। এই অভিভাবকদের সবার মুখে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠার ছাপ। এই চিত্র রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের।
Visit afnews.co.za for more information.
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই হাসপাতালে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। করোনা মহামারি মোকাবিলার সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মার্কেটের জন্য তৈরি করা এই ভবনে গড়ে তোলা হয় হাসপাতাল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর হাসপাতালটিকে হাম ডেডিকেটেড করা হয়েছে। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় এই সাধারণ ওয়ার্ডে প্রায় ৪০০ বিছানা রয়েছে। প্রতিটি বিছানা পূর্ণ হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য।
হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা বলেন, প্রতিদিনই হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশু ও তাঁদের স্বজনদের ভিড় বাড়ছে। রাজধানী ও রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে আসছেন অভিভাবকেরা। এই হাসপাতালে সাধারণ ওয়ার্ড ও কেবিনের পাশাপাশি সংকটাপন্ন শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে ভবনের পঞ্চম তলায় আইসিউ ওয়ার্ডে।
হামে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে আসা হয়েছে ঢাকার মহাখালীতে ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরের চিত্রহাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় সাধারণ ওয়ার্ডে হাঁটতে গিয়ে বাঁ পাশের একটি কেবিনের দিকে চোখ যায়। সেখানেই হামে আক্রান্ত সাত মাস বয়সী শিশু আয়ান হোসেনকে নিয়ে চার দিন ধরে আছেন শিশুটির মা রীমা বেগম। রীমা বেগম রাজধানীর নবাবগঞ্জ এলাকা থেকে সন্তানের চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তিনি জানান, আয়ানের অসুস্থতা শুরু হয়েছিল জ্বর, সর্দি ও কাশি দিয়ে। পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া দেখা দেয়।
এরপর আয়ানের শরীরে ফুসকুড়ি ওঠায় প্রথমে ছেলেকে নিয়ে নবাবগঞ্জের স্থানীয় একটি হাসপাতালে যান রীমা বেগম। পরে সেখানকার চিকিৎসকের পরামর্শে আসেন এই হাসপাতালে। আয়ানের মতো আরও কয়েক শ শিশু সেখানে চিকিৎসাধীন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে ১০৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৫১; এর মধ্যে আইসিইউতে রয়েছে ৪৮টি শিশু। তারা হাম ও এই রোগের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১০৬ শিশুর সবাই হামে আক্রান্ত।
হামে আক্রান্ত শিশুসন্তানকে নেবুলাইজ করছেন স্বজনেরা। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার মহাখালীতে ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালেগত মাসে জ্বর হয় আট মাসের শিশু আমেনা আক্তারের। এরপর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয় সে। গত পাঁচ দিন আগে আবারও জ্বর আসে শিশুটির। এরপর হাসপাতালে নিয়ে গেলে তার হাম শনাক্ত হয়। পরে মানহাকে নিয়ে এই হাসপাতালে নিয়ে আসেন মানহার মা রাবেয়া বেগম ও তাঁর মামা রাসেল হোসাইন। তাঁরা ভোলা থেকে ঢাকায় এসেছেন।
রাসেল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত মাসে জ্বর হয়ে ভালো হয়েছে। এখন হাম হলো। চার দিন ধরে এখানে আছি, এখন একটু ভালোর দিকে আছে।’
চার দিন ধরে রাজধানীর শিশু হাসপাতালে জ্বর ও গলাব্যথা নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল ১২ বছরের শিশু লামিয়া আক্তার। গতকাল তাঁর শরীরে ফুসকুড়ি ওঠে। এরপর চিকিৎসকেরা লামিয়াকে এই হাসপাতালে আনার পরামর্শ দিলে দুপুরে তাঁকে এখানে আনা হয়।
হামে আক্রান্ত শিশুদের আনা হচ্ছে ঢাকার মহাখালীতে ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরের চিত্রহাসপাতালের বারান্দায় লামিয়াকে নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন তাঁর দাদি নাজমা বেগম। রাজধানীর কলশী এলাকা থেকে আসা এই নারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিশু হাসপাতালে ছিলাম, সেখান থেকে ডাক্তার এখানে আসতে বলেছে।’
হামে আক্রান্ত হয়ে একই হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে শিশু লামিয়ার ছোট ভাই ওমর ফারুক। সাড়ে চার বছর বয়সী শিশুটি তিন দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা মো. রুবেল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন দিন ধরে লামিয়ার ছোট ভাই এখানে ভর্তি। লামিয়া শিশু হাসপাতালে ছিল। গতকাল থেকে তার র্যাশ (ফুসকুড়ি) দেখা দেয়। পরে ডাক্তার এখানে আনতে বলে।’
ডিএনসিসি কোভিড–১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আসিফ আহমেদ হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে রোগীদের নিয়মিত সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে আমাদের নার্স–সংকট রয়েছে। এর পরও আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে চেষ্টা করছি।’