অন্তঃসত্ত্বা রাবেয়ার পেটে লাথি, একসঙ্গে নিভে যায় তিন প্রাণ

· Prothom Alo

গৃহিণী রাবেয়া বেগম। স্বামী ভ্যানচালক মো. মামুন। ১২ বছরের সংসারে তিন কন্যাসন্তানের বাবা-মা হন তাঁরা। পরে আবার অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন রাবেয়া। তিনি যখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন ওষুধ না আনা নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হয় তাঁর। ওষুধ না আনার কারণ জানতে চাইলে রাবেয়ার তলপেটে লাথি দেন মামুন। ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয় রাবেয়ার। একই সঙ্গে মারা যায় তাঁর গর্ভে বেড়ে ওঠা দুই সন্তানও।

Visit mwafrika.life for more information.

ঘটনাটি ৯ বছর আগের। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের হারামিয়া ইউনিয়নের পূর্ব কাচিয়াপারের গুচ্ছগ্রামে এ ঘটনা ঘটে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মামুন নিজের ভ্যানে করে লাশ নিয়ে যান বাড়ির অদূরে নির্জন বিলে। এরপর আগুন ধরিয়ে দেন স্ত্রীর লাশে। এতে স্ত্রীর শরীরের প্রায় অর্ধেকই পুড়ে যায়। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলার রায় হয় গত বৃহস্পতিবার। আদালত রাবেয়াকে হত্যার দায়ে তাঁর স্বামী মামুনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড, লাশ পোড়ানোর দায়ে ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেন।

মামলার নথি ও নিহত রাবেয়ার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালে সন্দ্বীপের হারামিয়া ইউনিয়নের পূর্ব কাচিয়াপারের গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা মো. মামুনের সঙ্গে একই এলাকার রাবেয়া বেগমের বিয়ে হয়। তাঁদের প্রথমে একটি কন্যাসন্তান, পরেরবার যমজ কন্যাসন্তান হয়। পরপর তিনটি কন্যাসন্তান হওয়ায় মামুন অসন্তুষ্ট ছিলেন। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর গর্ভে আবারও যমজ সন্তান রয়েছে জেনে মামুনের ধারণা ছিল, দুটিই কন্যাসন্তান হবে। তাই স্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া লেগে থাকত তাঁর।

২০১৭ সালের ২৩ মে অন্তঃসত্ত্বা রাবেয়ার জন্য ওষুধ আনার কথা ছিল মামুনের। তবে তিনি তা না আনার কারণ জানতে চান স্ত্রী। বিষয়টি নিয়ে দুজনের ঝগড়া হয়। মামুন ঝগড়ার এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে রাবেয়ার তলপেটে লাথি দেন। ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয় রাবেয়ার। তবে ঘটনা আড়াল করতে নিজের ভ্যানে স্ত্রীর লাশ পাশের নির্জন বিলে নিয়ে যান স্বামী মামুন। পরে মৃত স্ত্রীর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর রাবেয়ার বাবার বাড়িতে খবর দেন, তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না।

স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি করে বিলে রাবেয়ার দগ্ধ লাশ খুঁজে পান। খবর পেয়ে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠায়। লাশের ময়নাতদন্তের পর জানা যায়, রাবেয়ার গর্ভে থাকা দুই সন্তানই ছেলে। হত্যার ঘটনায় রাবেয়ার ভগ্নিপতি কামাল পাশা বাদী হয়ে সন্দ্বীপ থানায় হত্যা মামলা করেন।

ঘটনার পরপরই গ্রামের লোকজন মামুনকে ধরে পুলিশে দেন। পরে রিমান্ডে আনা হলে মামুন স্ত্রীকে লাথি মেরে হত্যা এবং লাশ বাড়ির অদূরে নিয়ে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।

তদন্ত শেষে সন্দ্বীপ থানার তৎকালীন এসআই জাহাঙ্গীর আলম মামুন ও তাঁর চাচা ইমাম হাফেজকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। ১০ জনের সাক্ষ্য শেষে বৃহস্পতিবার জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রামের বিচারক মো. শাহাবুদ্দিন রায় দেন। রায়ে রাবেয়ার স্বামী মামুনকে সাজা দেওয়া হলেও খালাস পান ইমাম হাফেজ।

ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি শাহাদাত হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামুন জামিনে গিয়ে পলাতক। তাই আদালত তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করেছেন।’

ইমাম হাফেজের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী মিলাদুল আমীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামুন তাঁর স্ত্রীকে মেরে নিজেই ভ্যানগাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। মামলায় তাঁর চাচাকেও জড়ানো হয়। তবে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত চাচাকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।’

গ্রেপ্তারের ছয় বছর পর জামিনে মুক্তি পান মামুন। এরপর প্রতিটি ধার্য দিনে হাজিরা দিতেন আদালতে। রায় ঘোষণার আগে পলাতক হয়ে যান। জানতে চাইলে জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রামের বেঞ্চ সহকারী সেকান্দর আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আদালতে হাজিরা দিতে এলে মামুন প্রায়ই বিমর্ষ থাকতেন। নিজের আফসোসের কথাও বলতেন অন্য আসামিদের। তাঁর ধারণা ছিল, স্ত্রীর গর্ভে থাকা যমজ সন্তানও কন্যা হবে। তবে পরে জেনেছেন, দুটিই ছেলেসন্তান।’

মামলার বাদী ও নিহত রাবেয়ার ভগ্নিপতি কামাল পাশা প্রথম আলোকে বলেন, আসামি মামুনকে গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করা হোক। এভাবে আর কোনো স্বামী যাতে নৃশংসভাবে স্ত্রীকে খুন করতে না পারে। ছেলে বা মেয়ে—যেটিই হোক, সন্তান নিয়ে কেউ যেন বৈষম্য না করে।

Read full story at source