‘বৃষ্টির পানিতে সব জমি তলাইয়া গ্যালো, এ্যাহন চালান শ্যাষ, লাভও শ্যাষ’
· Prothom Alo

জলাবদ্ধতায় পচে যাওয়া মুগ ডাল তুলছিলেন ইলিয়াস হাওলাদার (৩৬)। তাঁর বাড়ি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবী ইউনিয়নের বাইলাবুনিয়া গ্রামে। পাঁচ একর জমিতে মুগ ডালের আবাদ করেছিলেন তিনি। কিন্তু এপ্রিলের শেষ দিকে হওয়া বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসলি জমি তলিয়ে থাকায় সব মুগ ডাল পচে গেছে।
ইলিয়াস বলেন, ‘স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে দাদন ও এনজিও থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে মুগের আবাদ করি। পাকা ও আধা পাকা ফসল ঘরে তুলতে আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগত। কিন্তু বৃষ্টিতে জমি তলিয়ে যাওয়ায় শতভাগ ফসল পচে নষ্ট হয়ে গেছে।’ আক্ষেপ করে ইলিয়াস বলেন, ‘একটি ডালও বাঁচানো গেল না। যা আছে, তা-ও বিক্রি করার মতো অবস্থা নেই। ধারের টাকা কী দিয়ে শোধ করুম, এনজিওর কিস্তি দিমু ক্যামনে? এহন দেনার দায়ে মোর গ্রাম ছাড়তে হইবে।’
Visit bettingx.bond for more information.
রাঙ্গাবালী কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এবার ১৭ হাজার ৭১৭ হেক্টর জমিতে মুগ ডাল এবং ১ হাজার ৪৩৯ হেক্টর জমিতে চিনাবাদামের আবাদ করা হয়। কিন্তু বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ৮ হাজার ৩৩৮ হেক্টর জমির মুগ ডাল ও ৩০২ হেক্টর জমির চিনাবাদাম নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া গ্রীষ্মকালীন শাকসবজিসহ আরও ১৫ জাতের ফসল নষ্ট হয়।
পটুয়াখালী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহাবুবা সুখী প্রথম আলোকে জানান, গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে উত্তর বঙ্গোপসাগরে গভীর সঞ্চারণশীল মেঘমালার সৃষ্টি হওয়ার কারণে ২৮ এপ্রিল থেকে জেলাজুড়ে কালবৈশাখী ও কয়েকটি ধাপে ২০০.৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
রাঙ্গাবালী উপজেলার মৌডুবী ইউনিয়নের কৃষক মহসীন মিয়া (৫৪) এবার ৯ একর জমিতে মুগ ডাল চাষ করেন। জমিতে লাঙল দেওয়া, মুগ ডালের বীজ, সার ও কীটনাশক বাবদ মোট দেড় লাখ টাকা আগাম দাদন নিয়েছেন তিনি। তাঁর ধারণা ছিল, ফলন ভালো হওয়ায় সব ফসল তুলতে পারলে ৫ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা দাম পাবেন। কিন্তু কালবৈশাখীর প্রভাবে হওয়া বৃষ্টিতে তাঁর ফসলি খেত পানিতে তলিয়ে সব ডাল পচে গেছে। একটিও ডাল খাওয়ার বা বিক্রির উপযোগী নেই। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে মহসীন বলেন, ‘এখন মূলধন আর লাভ—দুটোই বর্ষার পানিতে নষ্ট হয়ে গেল।’
মৌডুবী ইউনিয়নের ভুইয়াকান্দা গ্রামের কৃষক শাহজাহান পণ্ডিত (৬৮) বলেন, এক লাখ টাকা সুদে এবং এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ১০ একর জমিতে মুগ ডালের আবাদ করেন তিনি। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার আগেই বৃষ্টিতে সব ডাল ৩ থেকে ৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে পচে গেছে।
শাহজাহান পণ্ডিত বলেন, তাঁর গ্রামে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন কৃষক প্রায় ১ হাজার একর জমিতে মুগ ডালের আবাদ করেছেন। বৃষ্টিতে সব ফসল পচে গেছে। তাঁদের জমির পাশ দিয়ে দারছিড়া নদী বয়ে গেলেও গ্রামসংলগ্ন বেড়িবাঁধে পানিনিষ্কাশনের জন্য কোনো স্লুইসগেট নেই। ফলে প্রতিবছর বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে অসংখ্য কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।
গত এপ্রিলের শেষ দিকে হওয়া বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হন জেলা সদর উপজেলার বদরপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার (৬৭)। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিতে তিন ভাগের দুই ভাগ ফসলই নষ্ট হইয়া গ্যাছে। সর্বনাশা বৃষ্টি আইয়া সব খেত নষ্ট কইরা গ্যাছে।’
একই গ্রামের কৃষক আবু আউয়াল গাজী (৪২) বলেন, ‘আমার মতো একজন গরিব কৃষক ডাল, বাদাম, মিষ্টিআলু, কাঁচা মরিচ দিয়া ৫০ হাজার টাকা লস দিলাম। বৃষ্টির পানি খালে আটকাইয়া সব জমি তলাইয়া গ্যালো। এ্যাহন চালান শ্যাষ, লাভও শ্যাষ।’
জেলা কৃষি অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, জেলায় ৪০ হাজার ৭৭২ হেক্টর জমির মুগ ডাল নষ্ট হয়ে ৬৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং ৪ হাজার ৭৫৭ হেক্টর জমির চিনাবাদাম নষ্ট হয়ে ১০ কোটি ১ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া ৩৩৩ হেক্টর জমির বোরো ধান, ৭১ হেক্টর জমির মিষ্টিআলু, ১ হেক্টর জমির পাট, ১১২ হেক্টর জমির সূর্যমুখী, ৫ হেক্টর জমির আউশ, ৪২ হেক্টর জমির ভুট্টা, ২৯ হেক্টর জমির তিল, ৭৬ হেক্টর জমির ফেলন ডাল, ৬ হেক্টর জমির পানের বরজ, ৭ হেক্টর জমির পেঁপেবাগান, ১৯২ হেক্টর জমির কাঁচা মরিচ, ৩ হেক্টর জমির কলাগাছের বাগান, ৫ হেক্টর জমির সয়াবিন এবং ৭৪ হাজার হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি পানিতে তলিয়ে শতকোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা মোট আবাদি জমির ২৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বলেন, ‘চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৭৪ হেক্টর জমিতে নানা জাতের ফসল আবাদ করা হয়েছিল। কিন্তু গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে হওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৩০ হাজার ৬৬২ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, যা মোট কৃষকের ২৩ দশমিক ৪২ শতাংশ।’