পেঁয়াজে কালো দাগ থাকলে কী হয়? এটি কি আসলেই কিডনি ও লিভার নষ্ট করতে পারে
· Prothom Alo

সম্প্রতি এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়মে ধুলেও এই দাগ কিডনি বা লিভার নষ্ট করতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলে?
Visit freshyourfeel.org for more information.
বর্ষাকালে বা আর্দ্র আবহাওয়ায় অনেক সময় পেঁয়াজের শুকনো খোসার নিচে কালচে দাগ বা গুঁড়ার মতো দেখা যায়। সম্প্রতি এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়মে ধুলেও এই দাগ কিডনি বা লিভার নষ্ট করতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ক্ষেত্রে এটি এতটা বিপজ্জনক নয়। সাধারণত এই কালো দাগ এক ধরনের ফাঙ্গাসের কারণে হয়, যা বেশিরভাগ সময় পেঁয়াজের বাইরের শুকনো স্তরের নিচেই সীমাবদ্ধ থাকে। যদি দাগ শুধু ওপরে থাকে এবং ভেতরের অংশ শক্ত ও স্বাভাবিক থাকে, তাহলে আক্রান্ত বাইরের স্তর ফেলে দিয়ে বা ভালোভাবে ধুয়ে ব্যবহার করা যায়।
সাধারণত এই কালো দাগ এক ধরনের ফাঙ্গাসের কারণে হয়, যা বেশিরভাগ সময় পেঁয়াজের বাইরের শুকনো স্তরের নিচেই সীমাবদ্ধ থাকেকালো দাগের আসল কারণ কী?
পেঁয়াজের গায়ে যে কালো গুঁড়ার মতো দাগ দেখা যায়, সেটি সাধারণত এস্প্যারাগাস নিগার( Aspergillus niger ) নামের এক ধরনের ছত্রাক। এটি “ব্ল্যাক মোল্ড” নামেও পরিচিত। এই ছত্রাক মাটিতে স্বাভাবিকভাবেই থাকে এবং গরম ও আর্দ্র পরিবেশে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পেঁয়াজ কাটার সময় বা পরিবহনের সময় ওপরের কাগজের মতো পাতলা আবরণে ক্ষত তৈরি হলে এই ছত্রাক সহজেই সেখানে জন্মাতে পারে। বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে যাওয়ায় সমস্যাটি আরও বেশি দেখা যায়।
সব কালো দাগ কি বিপজ্জনক?
চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, যদি কালো দাগ শুধুমাত্র পেঁয়াজের বাইরের দিকে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আক্রান্ত স্তরগুলো ফেলে দিয়ে বা ভালো করে ধুয়ে নিয়ে ভেতরের শক্ত ও সাদা অংশ ব্যবহার করা যেতে পারে। ফর্টিস হাসপাতালের পুষ্টিবিদ শালিনী অরবিন্দ বলেন, এই ধরনের ছত্রাক অনেক সময় চিনাবাদাম, পেস্তা, আঙুর ও কিছু শস্যজাত খাবারেও দেখা যায়। তবে বাইরের স্তর পরিষ্কার করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পেঁয়াজ ব্যবহার নিরাপদ থাকে।
তবে কিছু লক্ষণ দেখলে সেই পেঁয়াজ ফেলে দেওয়াই নিরাপদ। যেমন—
* পেঁয়াজ নরম হয়ে গেলে
* ভেতর পর্যন্ত কালো দাগ ছড়িয়ে গেলে
এসব ক্ষেত্রে পেঁয়াজে গভীর সংক্রমণ থাকতে পারে, যা খেলে পেটের সমস্যা বা খাদ্যবাহিত অসুস্থতা হতে পারে* দুর্গন্ধ বের হলে
* অতিরিক্ত ভেজা বা পচা অনুভূত হলে
এসব ক্ষেত্রে পেঁয়াজে গভীর সংক্রমণ থাকতে পারে, যা খেলে পেটের সমস্যা বা খাদ্যবাহিত অসুস্থতা হতে পারে। এই অবস্থায় শুধু ছত্রাক নয়, ব্যাকটেরিয়াও জন্মাতে পারে, যা পাকস্থলী ও অন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ছত্রাকযুক্ত খাবার খেলে কিছু ক্ষেত্রে মাইকোটক্সিন শরীরের লিভার ও কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও শুধুমাত্র পেঁয়াজের কালো দাগ থেকে এমন গুরুতর রোগ হওয়ার প্রমাণ সেভাবে নেই।
পেঁয়াজ ভালো রাখার উপায়
* শুকনো ও ঠান্ডা জায়গায় সংরক্ষণ করুন
* প্লাস্টিক ব্যাগে না রেখে খোলা ঝুড়িতে রাখুন
* ভেজা বা পচা পেঁয়াজ দ্রুত আলাদা করুন
* ফ্রিজে রাখলে আর্দ্রতা বাড়তে পারে, তাই সতর্ক থাকুন
পেঁয়াজের বাইরের দিকে সামান্য কালো দাগ মানেই আতঙ্কের কিছু নয়। তবে ভেতরে পচন ধরলে বা দুর্গন্ধ থাকলে তা না খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
মাইকোটক্সিনের ঝুঁকি কতটা?
গবেষণায় দেখা গেছে, এস্প্যারাগাস নিগারের কিছু প্রজাতি “মাইকোটক্সিন” তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে “Ochratoxin A” দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, পেঁয়াজের কালো দাগ থেকে সরাসরি গুরুতর অসুস্থতার প্রমাণ এখনো খুব সীমিত। বিশেষ করে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে সামান্য বাইরের সংক্রমণ সাধারণত বড় ঝুঁকি তৈরি করে না। তবে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ছত্রাকের স্পোর অ্যালার্জি বা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়াতে পারে।
পেঁয়াজের কালো দাগ থেকে সরাসরি গুরুতর অসুস্থতার প্রমাণ এখনো খুব সীমিতরান্না করলে কি ঝুঁকি কমে?
অনেকে মনে করেন রান্না করলে সব জীবাণু নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কিছু মাইকোটক্সিন তাপ সহনশীল হতে পারে। অর্থাৎ অতিরিক্ত পচা বা গভীরভাবে আক্রান্ত পেঁয়াজ রান্না করলেও পুরোপুরি নিরাপদ নাও হতে পারে।
পেঁয়াজ সংরক্ষণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলা শ্রেয়কীভাবে পেঁয়াজ ভালো রাখবেন
সঠিকভাবে সংরক্ষণই এই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। সেক্ষেত্রে পেঁয়াজ সংরক্ষণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম মেনে চলা শ্রেয়-
ঠান্ডা, শুকনো ও অন্ধকার জায়গায় রাখুন
প্লাস্টিক ব্যাগে দীর্ঘদিন রাখবেন না
জালের ব্যাগ বা খোলা ঝুড়ি ব্যবহার করুন
আলুর সঙ্গে একসঙ্গে না রাখাই ভালো
ভেজা বা কাটা পেঁয়াজ দ্রুত ব্যবহার করুন
পচা পেঁয়াজ অন্যগুলোর থেকে আলাদা রাখুন
অনলাইনে স্বাস্থ্যবিষয়ক অনেক তথ্য দ্রুত ভাইরাল হয়। তবে সব তথ্য পুরোপুরি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পেঁয়াজের কালো দাগ মানেই বিষ নয়, আবার একেবারে অবহেলা করার মতো বিষয়ও নয়। যদি সংক্রমণ শুধু বাইরের স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে পরিষ্কার করে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু পেঁয়াজ নরম, দুর্গন্ধযুক্ত বা ভেতর পর্যন্ত আক্রান্ত হলে তা ফেলে দেওয়াই নিরাপদ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মূল চাবিকাঠি হলো তাজা খাবার বেছে নেওয়া, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং খাবারের গুণগত মান সম্পর্কে সচেতন থাকা।
তথ্য: টাইমস অব ইন্ডিয়া, হেলথলাইন
ছবি: ইন্সটাগ্রাম