রান্নায় চাহিদা, নজর শিল্প–পরিবহনে

· Prothom Alo

দেশে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট যত ঘনীভূত হচ্ছে, ততই বিকল্প জ্বালানি হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) গুরুত্ব বাড়ছে; একসময় যা কেবল বড় শহরের কিছু বাসাবাড়িতে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন গ্রাম থেকে শহর, চায়ের দোকান থেকে অভিজাত রেস্তোরাঁ—সর্বত্র রান্নার প্রধান চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তবে এলপিজির এই ক্রমবর্ধমান বাজার এখন আর কেবল রান্নাঘরের চৌহদ্দিতে আটকে নেই। খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের নজর এখন দেশের শিল্প ও পরিবহন খাতে। তাঁরা মনে করছেন, এই দুই খাতে সরবরাহ বাড়ানো গেলে এলপিজির বাজার আরও বহুগুণ সম্প্রসারিত হবে।

Visit mchezo.life for more information.

এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াব সূত্র বলছে, এলপিজির বাজার যে হারে বাড়ছিল, এখন তা কিছুটা কমে এসেছে। তবে বাজারে এখনো ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আছে। চলতি বছর এলপিজির চাহিদা ১৮ লাখ টন ছাড়াতে পারে। ২০৩০ সালে ২৫ লাখ টন ও ২০৪১ সালে চাহিদা ৫০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। শিল্প ও পরিবহনে সরবরাহ বাড়ানো গেলে এটি আরও বিস্তৃত হবে। 

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গাড়িতে অনেকেই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন এলপিজি (অটো গ্যাস)। সারা দেশে এখন এক হাজারের বেশি অটো গ্যাসস্টেশন আছে। কয়েক বছর ধরে গাড়িতে এলপিজির ব্যবহার বেশ বাড়ছিল। তবে এখন এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ায় গাড়ির জ্বালানি এলপিজিতে রূপান্তরের প্রবণতা কমে এসেছে।

এলপিজি অটো গ্যাসস্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসিন পারভেজ প্রথম আলোকে বলেন, এলপিজির প্রতি লিটার ৬০ টাকা পর্যন্ত গাড়ি রূপান্তরের আগ্রহ বেশি ছিল। মার্চে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিলে গাড়ি এলপিজিতে রূপান্তর আরও বেড়ে যায়। তবে দাম বাড়ার পর থেকে আর আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এখন বরং কেউ কেউ ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। 

দেশের এলপিজি বাজার আরও বিস্তৃত হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছেন জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবার রান্নার কাজে গাছপালা (লাকড়ি), শুকনা গোবর ও বায়োমাস ব্যবহার করে থাকে। এটি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। বাকিরা প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপিজি ব্যবহার করে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করেন ৪১ লাখ গ্রাহক। প্রায় ১০ বছর ধরে আবাসিকে নতুন গ্যাস–সংযোগ বন্ধ আছে। একই সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে দেশজুড়ে নগরায়ণ বাড়ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে আর এতে রান্নায় এলপিজি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে মানুষ। 

এক দশকে তিন গুণ বাজার

দেশে ২০১৫ সালে আবাসিকে গ্যাস–সংযোগ বন্ধ করা হয়। ২০১৬ সালে আগের বছরের তুলনায় ১০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয় এলপিজির ব্যবসায়। ২০১৭ সালে এটি দাঁড়ায় ১২৩ শতাংশে। ওই সময় বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম কম থাকায় মানুষের নাগালে চলে আসে। বেশ কিছু কোম্পানিও বাজারে আসে তখন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের বাজারে এলপিজি সরবরাহ করা হয়ে সাড়ে ৫ লাখ টন। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টন। এ বছর এটি ১৮ লাখ টন ছাড়াতে পারে। 

লোয়াব সূত্র বলছে, দেশে মোট ৫৬টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসার জন্য লাইসেন্স নিয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব সিলিন্ডার প্ল্যান্ট আছে। রান্নায় ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় বাজারে। সব মিলে বর্তমানে ৫ কোটির বেশি সিলিন্ডার আছে বাজারে। আমদানি সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির, যার মধ্যে ১৬টি আমদানি করে। তবে অধিকাংশ আমদানি করে ৮টি কোম্পানি। এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। একটি সরকারি কোম্পানিও আছে। তবে ৯৯ শতাংশের বেশি এলপিজি সরবরাহ করে বেসরকারি খাত। দেশে ২০০০ সালে প্রথম এলপিজি সরবরাহ শুরু করে বসুন্ধরা গ্রুপ। দীর্ঘ সময় ধরে তারাই ছিল শীর্ষে। এখন শীর্ষে আছে মেঘনা ফ্রেশ, ওমেরা, ইউনাইটেড আইগ্যাস, ওরিয়ন, যমুনা, বিএম, পেট্রোম্যাক্স, ডেলটা, জেএমআইয়ের মতো কোম্পানি। 

দেশে এলপিজির আমদানি কমে গেলে গত ডিসেম্বরে ব্যাপক সরবরাহ সংকট তৈরি হয়। দুই মাসের বেশি সময় ধরে টানা সংকট অব্যাহত ছিল। বাজারে তিন গুণ দামে বিক্রি হয় এলপিজির সিলিন্ডার। এরপর ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু সুবিধা দেয় সরকার। লোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, দাম বাড়লে ভোক্তার আগ্রহ কমে যায়, এটাই স্বাভাবিক। রান্নায় এলপিজির ব্যবহারের কারণে পাইপলাইনের গ্যাস শিল্পে সরবরাহ করা যাচ্ছে। শিল্পেও এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। দেশে এলপিজির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের নীতিসহায়তা দরকার। আর আমদানি করা এলপিজি খালাসে বেসরকারি খাতে টার্মিনাল নির্মাণের অনুমোদন দিতে পারে সরকার।

বাড়তি দামে কমতে পারে আগ্রহ

 ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। সবশেষ গত মাসে দুই দফায় বাড়ানো হয় এলপিজির দাম। এরপর মে মাসে অপরিবর্তিত রাখা হয়। এতে ১২ কেজি এলপিজির সিলিন্ডারের এখন দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকা। প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৬১ টাকা ৬৬ পয়সা। এই হিসাবে বিভিন্ন আকারের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হবে। গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটো গ্যাস) দাম প্রতি লিটার ৮৯ টাকা ৫০ পয়সা। 

তবে বাজারে এখনো বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এর জবাবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজার বড় করার ক্ষেত্রে দাম একটি বড় বাধা। বর্তমানে যে দাম আছে, তা ন্যায়সংগত। এর চেয়ে বাড়তি দামে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। এটি ঠেকাতে বাজারে অভিযান চালাতে পারে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। এটি এলপিজি বাজার বড় হওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে। এমন বাড়তি দামে এলপিজি ব্যবহারে মানুষের আগ্রহ কমতে পারে। দাম বাড়ায় দেড় লাখ টন থেকে গত মাসে এলপিজি বিক্রি ৮৮ হাজার টনে নেমে গেছে। বাজার সম্প্রসারণে চ্যালেঞ্জের মধ্যে সহনীয় দামে ভোক্তার কাছে এলপিজি সরবরাহ করা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। 

বাজার সম্প্রসারণে সরকারের সহযোগিতা চান ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, এলপিজি আমদানিতে পরিবহন খরচ কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিতে হবে। এলপিজি দুর্ঘটনা কমাতে হলে নিরাপদ সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। নিয়ম মেনে ব্যবহার করলে এটি থেকে দুর্ঘটনার আশঙ্কা খুবই কম। তাই নিয়মের বাইরে সিলিন্ডারের ব্যবহার ঠেকাতে সরকারি নজরদারি বাড়ানো দরকার। পেট্রোলিয়াম পণ্যের মজুত, সরবরাহ নিয়মিত নজরদারির জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজি দুর্ঘটনার ৮৫ শতাংশ কমাতে পরে সচেতনতা। এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। নিরাপত্তা বিধিমালা সুনির্দিষ্ট করে তা কার্যকর করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।

Read full story at source