এই যুগে মনুষ্যসৃষ্ট এই মহামারিতে ৫০০ শিশুর মৃত্যু গ্রহণযোগ্য নয়
· Prothom Alo

বাংলাদেশ উন্নত দেশ হতে চায়। দেশটির মাথাপিছু আয় ও আয়ুষ্কাল বেড়েছে। ছোট পরিবারে একটি বা দুটি বাচ্চা। সেই একটি বা দুটি বাচ্চাই মারা যাচ্ছে হামে। এই ‘ফ্যামিলি ট্র্যাজেডি’ রাষ্ট্র উপেক্ষা করতে পারে না। এই যুগে মনুষ৵সৃষ্ট এই মহামারিতে ৫০০ শিশুর মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
Visit bettingx.bond for more information.
চলতি বছরেই হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা ছিল। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস, হামের সমস্যায় আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি। আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় নানা তথ্য-উপাত্ত বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের অযোগ্যতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, টিকার প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাপনাকে অহেতুক জটিলতায় ফেলা, হামের ক্যাম্পেইন নির্ধারিত সময়ে করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে অপ্রস্তুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হলো।
রাজশাহীতে হামে শিশুমৃত্যুর খবর জানাজানির পর বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওই হাসপাতালের পরিচালককে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাতে চাইলেন। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ ধরনের প্রতিক্রিয়া থেকে পরবর্তী সময়ে সর্বাত্মক যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল, তা নেওয়া হলো না। হামকে মহামারি ঘোষণার জন্য জনস্বাস্থ্যবিদদের মতকে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। এটি হলো বড় সমস্যাকে ধীরে ধীরে এড়িয়ে যাওয়া। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন বলা হয়, হাম তো আমারও হয়েছিল বা বিষয়টিকে হালকা করার চেষ্টা করা হয়, তখন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরের অন্যদের মধ্যে গা ছাড়া ভাব চলে আসে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঈদে হামের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের ছুটি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয় বলেই এমন ঘোষণা এল। মন্ত্রী-সচিব হামে চিকিৎসাধীন শিশুদের দেখতে বিভিন্ন হাসপাতালে যাচ্ছেন। অথচ হাম পরিস্থিতিকে মহামারি ঘোষণা করল না সরকার। করোনা মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, হাম পরিস্থিতিকে মহামারি ঘোষণা করলে সবার মনোযোগ এ দিকে থাকত। সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিংবা মৃত্যু কমাতে সরকার বিশেষ কাউকে দায়িত্ব দিতে পারত। হামের চিকিৎসায় বিশেষ বরাদ্দ পাওয়া যেত। অথচ বরাদ্দ না থাকায় হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে হামের চিকিৎসায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
বিভিন্ন হাসপাতালে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা ভর্তি হচ্ছে। রোগীর স্বজনকেই অক্সিজেন, বিভিন্ন ওষুধ কিনে আনতে বলা হচ্ছে। পরিবারগুলোর পক্ষে তা কেনা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ বিশেষ বরাদ্দ থাকলে হাসপাতালগুলো নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে পারত।
হাম পরিস্থিতিকে মহামারি ঘোষণা করা হলে উপজেলা, জেলা পর্যায়সহ সব পর্যায়ে একই ধরনের চিকিৎসা পেত শিশুরা। ফলে ঢাকা পর্যন্ত আসতে হতো না। এ ছাড়া একটা আপৎকালীন কর্মপরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নে আমাদের সামনে কর্মসূচি থাকত। এসব কিছু নেই। ফলে হাসপাতালগুলোতে হামের রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর মিছিল থামছে না।
হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় ন্যাশনাল গাইডলাইনও নেই আমাদের। গাইডলাইনের আওতায় চিকিৎসক-নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে হামের জটিলতা ও মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। বাংলাদেশ উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) বাবল সি-প্যাপ উদ্ভাবন করেছে। এটিকে সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়নি। এটি করা গেলেও শিশুদের অক্সিজেন-স্বল্পতা এত মারাত্মক হতো না।
শিশুদের টিকা দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে প্রাদুর্ভাব কমবে। তবে দীর্ঘদিন ধরে হাম-পরবর্তী জটিলতা নিয়ে যে শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি, তারাও ঝুঁকিতে। ঈদে মানুষ গ্রামে যাবে। যে পরিবারে ছোট শিশু আছে, তাদের মধ্যে জ্বর-কাশি বা অন্য কোনো লক্ষণ থাকলে পরিবারগুলোকে ঈদে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে। বেড়াতে গিয়ে হামের লক্ষণ দেখা দিলে ঈদের সময় গ্রামে চিকিৎসা পাওয়াটা আরও কঠিন হয়ে যাবে।
লেখক: অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ, সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক