এলিট বাহিনীকে যে কারণে মূল বাহিনীর সম্পূরক হতে হবে

· Prothom Alo

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) বিলুপ্তি নিয়ে দীর্ঘদিন একটি আলোচনা চলছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ঘটনায় র‍্যাব বিলুপ্তির একটি সাধারণ দাবি ওঠে। দাবিটি দেশের ভেতরে—এমনকি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন থেকেও এই দাবি আসছিল। বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা বিএনপিও একসময় এই দাবি তুলেছিল। 

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

সম্প্রতি র‍্যাব সদর দপ্তরে এক মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মানবাধিকার সমুন্নত রেখে র‍্যাব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। তিনি আরও বলেছেন, নতুন একটি আইনের অধীনে বাহিনীটি এলিট ফোর্স হিসেবে থাকবে। বিগত রাজনৈতিক সরকারের সময়ে কিছু কর্মকর্তা গুরুতর অপরাধমূলক কাজের জন্য র‍্যাবসহ অনেক বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর মতে, এর দায়ভার পুরো বাহিনী নিতে পারে না।

তাঁর এই বক্তব্যে আলোচনায় আসে, দেশে নিকট অতীতে র‍্যাব ছাড়াও মানবাধিকার-পরিপন্থী কার্যক্রমের সঙ্গে পুলিশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্ট থাকার বহু অভিযোগ রয়েছে।

দেশের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বিচারবহির্ভূত ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কথাও দেশবাসী জানে। একটি ঘটনায় বিচারিক আদালতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আইনি লড়াই চলছে এখনো। সেটি কবে শেষ হবে, তা অনিশ্চিত।

একইভাবে র‍্যাবের একটি ব্যাটালিয়নের কিছু কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জে টাকার বিনিময়ে এক দিনে সাতজনকে উঠিয়ে নিয়ে হত্যার কাহিনিও অনেকেরই স্মৃতিতে থাকার কথা। এর বিচারকাজের সমাপ্তি কবে টানা হবে, সেটা ভাবনার বিষয়। প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করা কিছু কর্মকর্তা গুমের অভিযোগে এখন আইসিটি ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি আছেন।

র‍্যাব বিলুপ্তি প্রশ্নে দ্বিধান কারণ থাকতে পারে না

এসব পরিপ্রেক্ষিতে ধরে নিতে হয় অতীতে রাষ্ট্রক্ষমতার উঁচু পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের ইচ্ছা কিংবা সদস্যদের ব্যক্তিগত স্বার্থে এ ধরনের বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা মানবতাবহির্ভূত অনেক কাজ করেছেন। তাঁদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা সর্বজনীন দাবি। আর এসবের দায়ভার নিয়ে শুধু র‍্যাবকে বিলুপ্ত করা যৌক্তিক সমাধান নয় বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করছি না।

আলোচনাকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এটাও উল্লেখ করেছেন যে একটি যথোপযুক্ত আইনি কাঠামোয় র‍্যাব কিংবা যেকোনো নামে একটি এলিট ফোর্স থাকবে। এ বিষয়েও বিভিন্ন সময়ে আমি উল্লেখ করেছি, শুধু হাল আমলের পুলিশ বাহিনী দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করা যাবে না।

এ ছাড়া পুলিশের ওপর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় একটি ঝড় গেছে, এটাও উপলব্ধি করতে হবে। তবে এত দিনে তাদের সেটা কাটিয়ে ওঠা সংগত ছিল। কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখি, তারা আসামি ধরতে গিয়ে বা ধরে আনার সময় অপরাধীদের হামলার সম্মুখীন হয়। এতে আমরা স্বাভাবিকভাবে বিস্মিত ও বিচলিত হই। যারা আমাদের সুরক্ষা দেবে, তারাই যদি এ ধরনের আক্রমণের শিকার হয়, তাহলে সুবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো লোক স্বস্তিবোধ করতে পারে না। মূলত এ বিবেচনাতেই ২০০৩-০৪ সালের দিকে র‍্যাব গঠিত হয়েছিল।

১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশের আওতায় গঠিত বাহিনীটির সূচনা প্রশংসনীয় ছিল। এরা সম্পূর্ণ আইনি বিধান মোতাবেক শায়খ আবদুর রহমান এবং সিদ্দিকুল ইসলামসহ (বাংলা ভাই) একটি চরম উগ্রপন্থী দলের বেশ কিছু সদস্যকে গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করতে সক্ষম হয়েছিল। দণ্ডিত হন তাঁরা। তখনকার মতো ইতি ঘটে ওই সংগঠনের। বাহিনীটির গঠনকাঠামোতে আছে ভিন্নতা। সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে এটা গঠিত। এদের রয়েছে একটি সুসংগঠিত ও নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা কার্যক্রম। ফলে এরা বড় ধরনের অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সফল হয়। তবে এ ধরনের সাফল্যের পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যার একটি নেশায় তাদের পেয়ে বসে। ফলে বাহিনীটি চলে আসে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এত কিছু জেনেও সরকার বাহিনীটি বিলুপ্ত করছে না। একে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে চাইছে। অন্যান্য সংস্থার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী র‍্যাবের নতুন আইনি কাঠামো সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার কোনো রূপরেখা আমরা এখনো দেখিনি। তবে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এর কার্যক্রম পরিচালনার বার্তা আমাদের আশাবাদী করে। যে অধ্যাদেশবলে বাহিনীটি গঠিত, সেখানে রয়েছে তল্লাশি ও তদন্তকাজ পরিচালনার ক্ষমতা। তবে সরকার যে ধরনের অপরাধ তদন্ত করতে দেবে, সেগুলোই তারা করবে। অন্যদিকে আদালতের নির্দেশেও কয়েকটি তদন্তভার নেয়। এসব করতে তাদের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণের বিধান রাখা হয়েছে।

‘শিখিয়ে দেওয়া কথা না বললে ক্রসফায়ার’

আপাতদৃষ্টিতে র‍্যাব পুলিশ বাহিনীর একটি অংশ। সূচনা থেকেই এর প্রধান হিসেবে পুলিশের এবং উপপ্রধান হিসেবে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকেন। তবে ব্যাটালিয়নগুলোর কমান্ডিং অফিসার (সিও) থাকেন প্রধানত সেনাবাহিনী থেকে। বিভিন্ন বাহিনী থেকে প্রেষণে নিযুক্ত এ বাহিনীর সদস্যদের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রিত হয় মূল বাহিনীর বিধিবিধান অনুসরণে।

প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষায় ও নতুন প্রত্যাশা পূরণের জন্য এ ধরনের বিধানগুলো যথাযথ কি না, তা পর্যালোচনা করা দরকার। তাদের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, এর জন্য নতুন আইনে জবাবদিহি সুনিশ্চিত করতে হবে। নতুন আইন প্রণয়নকালে আরও বিবেচনায় নিতে হবে যে তাদের কার্যক্রম এখন প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পুলিশের সমান্তরালে চলছে। তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হলেও এ কার্যক্রম সম্পর্কে অতি সামান্য অবগত থাকেন মূল দায়িত্বের কর্মকর্তারা। ক্ষেত্রবিশেষে অনেক পরে জ্ঞাত হন।

উল্লেখ্য, মহানগর এলাকায় পুলিশ কমিশনার এবং জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার মূল জিম্মাদার। বর্তমান র‍্যাবের কার্যক্রমে তাঁদের সঙ্গে সমন্বয়ে ব্যবস্থা অনুপস্থিত। স্বাধীনতার পরপর তখনকার রক্ষী বাহিনীর কার্যক্রমও অনেকটা এ ধরনের ছিল।

ক্রসফায়ার ও সাভারের সাংসদ

র‍্যাবের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ৭ খুনের ঘটনার পর গুরুতর জন-অসন্তোষ দেখা দিলে সেখানকার ডিসি ও এসপিকে দ্রুত বদলি করা হয়। তবে বিষয়টির প্রতিকার বা প্রতিবিধান দেওয়ার দৃশ্যমান কোনো সুযোগ তাঁদের ছিল না। আমি মনে করি, সংগত কারণেই সে সুযোগ থাকা আবশ্যক। নতুন আইনে বিষয়টি বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় এখনো মাঠপর্যায়ে সেনাবাহিনী রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের সময়ে প্রথাবাহিত রেওয়াজ অনুসারে তারা থাকে।

এবারে তাদের কমিশন্ড অফিসারদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে, জেলায় কর্মরত সব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (ডিসি) অধীন বলে গণ্য করা হয়। সুতরাং তাঁদের কোনো ধরনের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া বা নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি ডিসিরই দেখার কথা।

সব দিক বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ক্ষিপ্রতা, নজরদারি, পেশাদারির উৎকর্ষ সম্পন্ন র‍্যাবের মতো একটি এলিট বাহিনীর আবশ্যকতা রয়েছে। আর র‍্যাবের সুযোগ-সুবিধা তো তাদের মূল সংস্থা থেকে বেশি। সুতরাং তাঁরা লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালন করবেন, এমনটা আশা করা অসংগত হবে না, অনেকে করছেনও। তবে ব্যতিক্রমও আছে বেশ কিছু। আশা করা যায়, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আলোচিত মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন।

এমনটা থাকতে হবে সব বাহিনীর সদস্যেরও। তবে আইনশৃঙ্খলার মূল কার্যক্রমের দায়িত্বে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের উপেক্ষা করা যাবে না। এতে কাউকে অন্য কারোর অধীন মনে করার কোনো সুযোগ নেই। সমন্বয় ও জবাবদিহি থাকতেই হবে।

  • আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

    [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source