কাকের ডাকে সন্ধ্যা নামে আন্ধারমানিক গ্রামে

· Prothom Alo

দিনভর কোলাহল আর কর্মব্যস্ততা। দিন শেষে সন্ধ্যার আগমনী বার্তা নিয়ে যখন প্রকৃতি ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করে, তখন দেশের অনেক গ্রামেই শোনা যায় পাখির কলকাকলি। তবে মানিকগঞ্জ পৌর এলাকার আন্ধারমানিক গ্রামে সন্ধ্যা নেমে আসে এক ভিন্ন আবহে। এখানে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক মুখর হয়ে ওঠে হাজারো কাকের ডাকে। স্থানীয় মানুষের কাছে কাকের সেই সমবেত ডাকই যেন সন্ধ্যার ঘণ্টাধ্বনি।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

আন্ধারমানিক গ্রামের পাশেই বয়ে গেছে কালীগঙ্গা। নদীর পাড় ঘেঁষে আছে মেহগনি, বট, পাকুড়, রেইনট্রি ও কড়ইসহ বিভিন্ন গাছ। দিনের বেলা এসব গাছ ফাঁকা মনে হলেও বিকেলের শেষভাগে দৃশ্যপট বদলে যায়। দূরদূরান্ত থেকে শত শত কাক উড়ে এসে গাছগুলোর ডালে বসতে শুরু করে। কিছু সময়ের মধ্যেই গাছগুলো কালো পাখির ভিড়ে ঢেকে যায়। তখন শুরু হয় তাদের একযোগে ডাকাডাকি।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য, কয়েক দশক ধরেই এ দৃশ্য চলে আসছে। তাঁদের ধারণা, নিরাপদ আশ্রয় ও পর্যাপ্ত গাছপালার কারণে কাকগুলো এখানে রাতযাপন করে। প্রতিদিন বিকেলে কাকের ঝাঁক ফিরে আসার দৃশ্য দেখতে আশপাশের এলাকার লোকজনও ভিড় করেন।

মানিকগঞ্জ পৌরসভার স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আবু মো. নাহিদ বলেন, প্রতিদিন ভোরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি, হোটেল ও খাবারের দোকানের উচ্ছিষ্ট খেতে যায় কাকগুলো। আবার সন্ধ্যার আগে আগে কাকগুলো ফিরতে শুরু করে। কাকের ডাক শুনেই বোঝা যায়, মাগরিবের সময় হয়ে গেছে। ঘড়ি না দেখলেও চলে।

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী আরাফাত হোসেন বলেন, ‘অনেকের কাছে কাকের ডাক বিরক্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে এটি প্রকৃতির পরিচয়ের অংশ। কাক না ডাকলে সন্ধ্যাটা যেন অসম্পূর্ণ লাগে।’

আন্ধারমানিক গ্রামের পাশেই বয়ে গেছে কালীগঙ্গা। নদীর পাড় ঘেঁষে আছে মেহগনি, বট, পাকুড়, রেইনট্রি ও কড়ইসহ বিভিন্ন গাছ। দিনের বেলা এসব গাছ ফাঁকা মনে হলেও বিকেলের শেষভাগে দৃশ্যপট বদলে যায়। দূরদূরান্ত থেকে শত শত কাক উড়ে এসে গাছগুলোর ডালে বসতে শুরু করে।

পাখিবিদদের মতে, কাক অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সামাজিক পাখি। তারা সাধারণত দলবদ্ধভাবে বাস করে এবং রাত কাটানোর জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বেছে নেয়। নিরাপদ ও বড় গাছ থাকলে একই স্থানে বছরের পর বছর তারা ফিরে আসে।

জেলায় পাখির কল্যাণে কাজ করে স্থানীয় সংগঠন এসো পাখি লালন করি (পালক)। সংগঠনের সদস্যসচিব বিমল রায় বলেন, নগরায়ণ ও গাছপালা কমে যাওয়া এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে অনেক এলাকায় কাকের সংখ্যা কমে গেছে। অথচ আন্ধারমানিক গ্রামটি এখনো কাকের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে টিকে আছে। ফলে প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখানে তৈরি হয় এক অনন্য প্রাকৃতিক দৃশ্য।

বিমল রায় আরও বলেন, কাক বিভিন্ন উচ্ছিষ্ট ও ময়লা-আবর্জনা খেয়ে শহর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে থাকে। এ কারণে কাককে প্রকৃতির ঝাড়ুদার বলেও পরিচিত।

তবে কাকের আধিক্যের কারণে কিছু সমস্যাও রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, গাছের নিচে ময়লা পড়ে এবং কখনো কখনো অতিরিক্ত শব্দের কারণে অসুবিধা হয়। তবু অধিকাংশ মানুষ কাকগুলোর প্রতি সহনশীল। কারণ, তাঁরা মনে করেন এই পাখিগুলো গ্রামের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কলেজপড়ুয়া সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘শহরে গেলে এমন দৃশ্য দেখা যায় না। বিকেলে যখন আকাশভরা কাক উড়ে আসে, তখন মনে হয় প্রকৃতি নিজের ভাষায় কিছু বলছে। অনেকেই ছবি তুলতে আসেন।’

আরাফাত হোসেন, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী অনেকের কাছে কাকের ডাক বিরক্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে এটি প্রকৃতির পরিচয়ের অংশ। কাক না ডাকলে সন্ধ্যাটা যেন অসম্পূর্ণ লাগে।

শনিবার সরেজমিনে গ্রামটি ঘুরে দেখা গেছে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে কাকের ডাক ধীরে ধীরে কমতে থাকে। একসময় তারা ডালের ফাঁকে নিশ্চুপ হয়ে বসে পড়ে। গ্রামের পথঘাটও তখন শান্ত হয়ে আসে। পশ্চিম আকাশের শেষ আলো মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে নেমে আসে রাতের নীরবতা।

স্থানীয় পাখিপ্রেমী সামছুন্নবী তুলিপ বলেন, ‘প্রকৃতির এই দৈনন্দিন আয়োজন শুধু একটি গ্রামের বৈশিষ্ট্য নয়, এটি মানুষ ও পাখির সহাবস্থানেরও এক মেলবন্ধন। আধুনিকতার চাপে যখন অনেক প্রাকৃতিক দৃশ্য হারিয়ে যাচ্ছে, তখন কাকের ডাকে সন্ধ্যা নামা এই গ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি।’

Read full story at source