দেশের রাজনীতিতে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন
· Prothom Alo
প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু অপ্রত্যাশিত ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন, পক্ষাঘাতে ভুগছিলেন এবং কার্যত জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বিদায় নিলেন; কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ হিসেবে।
আমি তোফায়েল আহমেদকে প্রথম দেখি ১৯৬৯ সালের গণ–আন্দোলনের সময়। তখন আমি ঢাকা কলেজে পড়ি। ওই বছরের জানুয়ারিতে চারটি ছাত্রসংগঠন মিলে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। তোফায়েল আহমেদ তখন ডাকসুর ভিপি এবং ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভা-সমাবেশে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। আন্দোলন যত এগিয়েছে, তাঁর জনপ্রিয়তাও তত বেড়েছে। আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি ছাত্রসমাজের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতাদের একজন হয়ে ওঠেন। বলা যায়, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব; আর তাঁর ঠিক পরেই ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। সেই সময় তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, যে রকম জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে বিরল।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
১৯৬৯ সালের শেষ দিকে ছাত্রলীগের সম্মেলনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আ স ম আবদুর রব সাধারণ সম্পাদক হন। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ছাত্রলীগের কিছু কর্মীকে নিয়ে স্বাধীনতার প্রস্তুতির লক্ষ্যে একটি গোপন সংগঠন গড়ে তোলা হয়, যার নাম ছিল ‘নিউক্লিয়াস’। এ বিষয়ে অনেক ভুল তথ্য প্রচলিত থাকলেও বাস্তবে এটি ছিল স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতিমূলক একটি সাংগঠনিক কাঠামো। শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে যখন অনেকের মনে হয়েছিল সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজন হতে পারে, তখন এই সংগঠনের কার্যক্রম গুরুত্ব পায়। সামরিক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও ছিল।
পরে যখন নিশ্চিত হওয়া গেল যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং আওয়ামী লীগ ভালো ফল করবে, তখন এর কার্যক্রম অনেকটাই স্থগিত হয়ে যায়; কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যার পর ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা ভারতে গিয়ে আবার সংগঠনটিকে সক্রিয় করেন। বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী এর সদস্যসংখ্যা কয়েক হাজার ছিল। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘মুজিব বাহিনী’ রাখা হয়। এই বাহিনীর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ।
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে তোফায়েল আহমেদকে নিজের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। এর পর থেকে তোফায়েল আহমেদকে সরকার ও রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হিসেবেই দেখা যায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তার কিছু অংশের সঙ্গে তাঁর নামও জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে রক্ষীবাহিনী নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। যদিও পরবর্তী সময়ে তিনি দাবি করেছিলেন, রক্ষীবাহিনীর দায়িত্ব তাঁর হাতে ছিল না।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও বাকশাল সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতার মতো তিনিও গ্রেপ্তার হন, নির্যাতনের শিকার হন এবং কয়েক বছর কারাবন্দী থাকেন। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হন। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে দলের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ‘নিষ্ক্রিয়তা’র জন্য তোফায়েল আহমদ পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সমালোচনার মুখে পড়েন।
দলের ভেতরে তোফায়েল আহমেদের গুরুত্ব আবারও আলোচনায় আসে ২০০৭ সালে সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। তখন আওয়ামী লীগের ভেতরে ‘সংস্কারপন্থী’ একটি গোষ্ঠী সক্রিয় হয়েছিল। তাঁরা দল পুনর্গঠনের বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং তৎকালীন এক-এগারোর সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে গেলে সংস্কারপন্থীদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ‘সংস্কারপন্থী’ নেতারা ক্ষমতার বলয়ে আর আগের অবস্থানে ফিরতে পারেননি। ফলে দলের ভেতরে প্রান্তিক অবস্থানেই তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় কাটে। তাঁকে দলের উপদেষ্টা পরিষদে রাখা হলেও পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক ছিল। অনেকের ধারণা, শেখ হাসিনা তোফায়েল আহমেদের উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করতেন। কারণ, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতা; আর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভিত্তি ছিল পারিবারিক উত্তরাধিকার। বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা এখানেই প্রতিফলিত হয়—আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত নেতৃত্ব এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নেতৃত্বের মধ্যে একধরনের অন্তর্নিহিত টানাপোড়েন।
সব মিলিয়ে তোফায়েল আহমেদের জীবন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের উত্থান-পতন, সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতার এক প্রতিচ্ছবি। ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের যে কিংবদন্তি ছাত্রনেতাকে মানুষ দেখেছিল, পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতা, দলীয় আনুগত্য এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে তিনি আর সেই উচ্চতায় ফিরে যেতে পারেননি। তবু বাংলাদেশের ’৬৯–এর গণ–অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি এবং সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।