ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লুটপাট হয়েছে: অর্থমন্ত্রী
· Prothom Alo

বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণসহ নিবিড় নজরদারি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি এবং সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জের (বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভাড়া) নামে বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অর্থ পাচার হয়েছে।
Visit tr-sport.bond for more information.
আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরার সময় জাতীয় সংসদে এ কথাগুলো বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বেশ কিছু মেগা প্রকল্পে বিতর্কিত ও একতরফা শর্ত যুক্ত থাকায় বিদ্যুৎ আমদানি ও ক্রয়ে অতিরিক্ত খরচের বোঝা চেপে বসেছে। ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে এ খাতে আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ আমদানি ও অন-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট; কিন্তু এখনো নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো হবে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে।
প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ আছে ১৬ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ছে ৩৯৩ কোটি টাকা। চলমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট বহুমুখী চাপের চিত্র তুলে ধরা হয় বাজেট বক্তৃতায়।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। সাধারণ জনগণের কষ্টের কথা বিবেচনায় জ্বালানি খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম সামান্য সমন্বয় করা হলেও গ্যাসের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অর্থমন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যেহেতু বাংলাদেশের প্রবাসী জনশক্তির সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য, তাই সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বজায় থাকলে তা ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
সংকট ও অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী পরিকল্পনা এবং সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে আগামী আগস্টে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসতে পারে। আর ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়, দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এখন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। আগামী তিন বছরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের মাধ্যমে ২৭০ কিলোমিটার ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ৭০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৭০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি ভূতাত্ত্বিক জরিপ সম্পন্ন করা হবে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই সময়ের মধ্যে নতুন ৬৯টি কূপ খনন এবং ৩১টি পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার (মেরামত) করা হবে। পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান রিগ কেনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের গতি বাড়াতে পিএসসি–কাঠামো সংশোধন করে নতুন করে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড’ ঘোষণা করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, জ্বালানি আমদানিতে একক কোনো উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকার কৌশলগত বহুমুখীকরণ নীতি গ্রহণ করেছে। মহেশখালীতে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের পাশাপাশি নতুন আরও একটি টার্মিনাল স্থাপনের বিষয় এখন সরকারের পর্যালোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে। জ্বালানি খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা হচ্ছে। জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে ৩০ লাখ টন সক্ষমতার একটি শোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়লা উত্তোলনে বড়পুকুরিয়ায় দ্বিতীয় ধাপ ও দীঘিপাড়া কোল ফিল্ড স্থাপনের লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।