মধ্যপন্থা: রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত বাজেটে কোরআনের মৌলিক দর্শন

· Prothom Alo

জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ ঘাটতি থাকার অন্যতম কারণ অনুৎপাদনশীল খাতে অতিরিক্ত ব্যয়, সরকারি ক্রয়ে অস্বচ্ছতা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অর্থের অপচয়। অর্থনীতির এই টানাপোড়েনের প্রভাব যখন ব্যক্তি জীবনে এসে পড়ে, তখন সাধারণ নাগরিককেও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

Visit betsport24.es for more information.

রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত—উভয় পর্যায়ের বাজেট ব্যবস্থাপনায় অপচয়, বিলাসিতা রোধ এবং মিতব্যয়িতা অবলম্বনের ব্যাপারে ইসলামে নির্দেশনা রয়েছে।

অপব্যয়ে কোরআনের সতর্কতা

ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদকে স্রেফ ব্যক্তিমালিকানাধীন বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি মনে করা হয় না; বরং একে আল্লাহর দেওয়া একটি পবিত্র ‘আমানত’ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই খরচের ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বাধীন নয়, বরং প্রতিটি পয়সা ব্যয়ে মিতব্যয়িতা ও যুক্তিসংগত কারণ থাকার বিধান দেওয়া হয়েছে।

ইসলাম মনে করে, জনগণের করের টাকায় গঠিত রাষ্ট্রীয় তহবিল বা রাজকোষের একটি পয়সাও অহেতুক বিলাসিতায় খরচ করার অধিকার শাসকের নেই।

ইসলামে সম্পদ অনর্থক নষ্ট করা বা সীমালঙ্ঘন করে খরচ করা অপরাধ।

কোরআনে অপচয়কারীদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, “তোমরা আহার করো ও পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)। আবার বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শায়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের বড় অকৃতজ্ঞ।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭)

লক্ষণীয় যে অপচয়কারীকে অন্য কোনো অপরাধীর সঙ্গে নয়, সরাসরি শয়তানের ভাই সাব্যস্ত করা হয়েছে। কারণ, শয়তান আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে, অপচয়কারী ব্যক্তি বা রাষ্ট্রও তেমনি আল্লাহর দেওয়া সীমিত সম্পদের অপব্যবহার করে সমাজের ওপর জুলুম করে।

বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন: ইসলাম কী বলে

রাষ্ট্রীয় খরচে অপচয় রোধ

ইসলাম মনে করে, জনগণের করের টাকায় গঠিত রাষ্ট্রীয় তহবিল বা রাজকোষের একটি পয়সাও অহেতুক বিলাসিতায় খরচ করার অধিকার শাসকের নেই।

খলিফা আলী (রা.) তাঁর প্রদেশের গভর্নর ও লেখকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করে লিখেছিলেন, “তোমরা যখন রাষ্ট্রীয় হিসাব বা চিঠি লিখবে, তখন কলমের নিব বা মুখটি সূক্ষ্ম করো, লাইনের মধ্যবর্তী দূরত্ব কমিয়ে আনো এবং অহেতুক অতিরিক্ত কথা লেখা পরিহার করো। কেননা আমি মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় অর্থের (বায়তুল মাল) সামান্যতম অপচয়ও সহ্য করব না।” (কুদামা ইবনে জাফর, আল-খরাজ ওয়া সিনাআতুল কিতাবাহ, পৃষ্ঠা: ৪৩, দারুর রশিদ, বাগদাদ, ১৯৮১)

ড. ইউসুফ আল-কারজাভি (রহ.)জাতীয় সংকটের সময় বিলাসী পণ্য আমদানির পেছনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ বা বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় করা ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী। রাষ্ট্রকে আগে জনগণের জীবনরক্ষাকারী মৌলিক চাহিদাগুলোর বাজেট নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সামান্য কলম ও কাগজের ব্যবহারে যদি এই পরিমাণ সতর্কতার নির্দেশ থাকে, তবে বর্তমান যুগে উন্নয়ন প্রকল্পের পেছনে জনঅর্থের অপচয় ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা বড় খেয়ানত, তা সহজে অনুমেয়।

বাজেটে ‘মধ্যপন্থা’র দর্শন

জাতীয় বাজেটের চাপ এসে পকেটে লাগলে তখন সাধারণ মানুষের পারিবারিক বাজেট কাটছাঁট করা ছাড়া উপায় থাকে না। ইসলাম মানুষকে কৃপণ হতে বলেনি, আবার হাতখুলে সবকিছু উড়িয়ে দিতেও নিষেধ করেছে; বরং ইসলাম শিখিয়েছে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে।

কোরআনে প্রকৃত মুমিনদের চিত্রায়িত করে বলা হয়েছে, “এবং যারা ব্যয় করার সময় অপচয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং তাদের পন্থা এই দুইয়ের মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ হয়।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)

হাদিসে সুদের বিধান ও তার শ্রেণিবিভাগ

মহানবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি পরিমিত ব্যয় অবলম্বন করে, সে কখনো অভাবগ্রস্ত হয় না।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৪২৬৯)

সংকটের বছরে বিলাসিতা বর্জন

সাধারণ পরিবারের উচিত ধর্মীয় অনুশাসন মেনে বিলাসিতা বর্জন করা এবং অতিপ্রয়োজনীয় খাতের বাইরে কৃত্রিম ও লোকদেখানো খরচ থেকে নিজেদের বিরত রাখা। দেশে সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান কিংবা মূল্যস্ফীতি বাড়লে জাতীয়ভাবে বিলাসিতা বর্জন করা রাষ্ট্রের প্রধান নীতি হওয়া উচিত।

হিজরি ১৮ সনে মদিনায় এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়, যা ‘আমুর রামাদাহ’ (ছাইয়ের বছর) নামে পরিচিত। খলিফা ওমর (রা.) রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিলাসিতা বর্জনের নজির স্থাপন করেন।

ইসলাম মানুষকে কৃপণ হতে বলেনি, আবার হাতখুলে সবকিছু উড়িয়ে দিতেও নিষেধ করেছে; বরং ইসলাম শিখিয়েছে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে।

তিনি শপথ করেন, যতদিন ঘি ও দুধের দাম নাগালের মধ্যে না আসছে, তিনি নিজে ঘি, চর্বি বা সুস্বাদু খাবার স্পর্শ করবেন না। তিনি রুটি আর সাধারণ তেল খেয়ে দিনাতিপাত করতেন, যার ফলে তাঁর গায়ের রং কালচে হয়ে গিয়েছিল। (ইবনে জারির তবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ৪/৯৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৮৭)

ইসলামি অর্থনীতি বিশষেজ্ঞ ইউসুফ আল-কারজাভি লিখেছেন, জাতীয় সংকটের সময় বিলাসী পণ্য আমদানির পেছনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ বা বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় করা ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থী। রাষ্ট্রকে আগে জনগণের জীবনরক্ষাকারী মৌলিক চাহিদাগুলোর বাজেট নিশ্চিত করতে হবে। (ড. ইউসুফ আল-কারজাভি, ফিকহুজ জাকাত, ২/৯৮২-৯৮৫, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৭৩)

সম্পদের অপচয় রোধ এবং রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত বাজেটে ইনসাফ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল একটি আত্মনির্ভরশীল, সংকটমুক্ত ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

সম্পদ যেভাবে পরিশুদ্ধ করবেন

Read full story at source