বাংলাদেশে গ্রেপ্তার ও আটক: আইনি কাঠামো ও জবাবদিহি
· Prothom Alo
রিড্রেসের সহযোগিতায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও প্রথম আলো আয়োজিত ‘বাংলাদেশে গ্রেপ্তার ও আটক: আইনি কাঠামো ও জবাবদিহি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২৩ মে ২০২৬, ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
Visit catcrossgame.com for more information.
অংশগ্রহণকারী:
সানজিদা ইসলাম তুলি, সংসদ সদস্য, নারী আসন ১৬ ও আহ্বায়ক, মায়ের ডাক ;
মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান, সংসদ সদস্য, ঢাকা-১৪;
ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;
মো. বদিউজ্জামান তপাদার, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ;
নূর খান লিটন, মানবাধিকার কর্মী;
ইলিরা দেওয়ান, মানবাধিকার কর্মী;
তাসনিম জারা, রাজনৈতিক কর্মী;
হুমায়রা নূর, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং যুগ্ম সদস্যসচিব, জাতীয় নাগরিক পার্টি; আবু সাঈদ খান, সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক;
ড. কাজী জাহেদ ইকবাল, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও প্যানেল আইনজীবী, ব্লাস্ট;
প্রিয়া আহসান চৌধুরী, অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ, এবং উপদেষ্টা, ব্লাস্ট;
শাহরিয়ার সাদাত, নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়;
মো. বরকত আলী, পরিচালক (লিগ্যাল), ব্লাষ্ট।
সঞ্চালনা: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো
সানজিদা ইসলাম তুলি
সংসদ সদস্য, নারী আসন ১৬ ও আহ্বায়ক, মায়ের ডাক
বাংলাদেশে গ্রেপ্তার, আটক ও আইনি কাঠামোতে জবাবদিহির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। গ্রেপ্তার ও আটক অনেক সময় আইনবহির্ভূতভাবে করা হয় এবং এতে রাষ্ট্র নাগরিককে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ভয়াবহ নির্যাতনের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি। এসব ঘটনার পেছনে অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসেস বা এসওপির সীমারেখা না থাকার বিষয়টি কাজ করে। এক যুগের বেশি সময় ধরে এমন চর্চা চলে এসেছে, যেখানে মোবাইল ট্র্যাক, নজরদারি ও কাউকে তুলে নেওয়া স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
অনেক ভুক্তভোগীর পরিবার বছরের পর বছর প্রিয়জনকে খুঁজে বেড়ায়, অথচ রাষ্ট্র শুরু থেকেই তা অস্বীকার করে। র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ বারবার এসেছে, যেখানে তুলে নেওয়ার পর আর ফেরত পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রের অস্বীকার ও জবাবদিহির অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। এ অবস্থায় প্রতিটি সংস্থার জন্য স্পষ্ট এসওপি, সীমারেখা ও নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। মানবাধিকার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট আইন নিয়ে চলমান আলোচনায় স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহির নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া যেকোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। তবেই জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠা পাবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন কমানো সম্ভব হবে। আমরা সবাই মিলে এই কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য কাজ করলে একটি মানবাধিকারসম্মত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।
মীর আহমাদ বিন কাসেম
সংসদ সদস্য, ঢাকা-১৪
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এমন অনেক সদস্য রয়েছেন, যাঁরা গুম ও বিচারহীনতার শিকার হয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। তাই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এই সংসদকে ঘিরে অনেক বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকার দুটি উদ্যোগ নিয়েছিল—গুম কমিশন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, যা আমাকে একজন ভুক্তভোগী হিসেবে আশাবাদী করেছিল। ২০২৫ সালে প্রণীত এই দুই আইন মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে বড় সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু এগুলো বাতিলের সুপারিশ অত্যন্ত হতাশাজনক। আইনগুলো বাতিল না করে প্রয়োজনে সংশোধন করার দাবি আমরা সংসদে জানিয়েছি।
অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে আরও শক্তিশালী আইন যেন এসব আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। বিদ্যমান আইনে সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত করতে সরকারের অনুমতির বিধান রাখা হয়েছে, যা কার্যত প্রতিকারকে বাধাগ্রস্ত করবে। ওপক্যাটের চুক্তির (জাতিসংঘের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, যার লক্ষ্য আটকস্থলে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ প্রতিরোধ করা) আওতায় প্রতিটি দেশকে এনপিএম (NPM) নামে একটি স্বাধীন জাতীয় সংস্থা গঠন করা যেতে পারে। মালদ্বীপসহ অনেক দেশ এটি ব্যবহার করে সফল হয়েছে।
আমি একজন ভুক্তভোগী হিসেবে বলছি, মানবাধিকার কমিশন হতে হবে স্বাধীন, যেখানে তদন্তে সরকারের অনুমতির প্রয়োজন থাকবে না এবং যেকোনো অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা যাবে। তবেই আমার মতো আর কেউ একই পরিস্থিতির শিকার হবে না।
ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আজকের আলোচনা মূলত বাংলাদেশে গ্রেপ্তার, আটক, রিমান্ড এবং নির্যাতন–সংক্রান্ত আইনি কাঠামো ও তার প্রায়োগিক অসংগতি নিয়ে। ব্লাস্টের একটি গবেষণার অংশ হিসেবে আমরা ‘অ্যারেস্ট অ্যান্ড ডিটেনশন ইন বাংলাদেশ: লিগ্যাল অ্যান্ড কনটেক্সচুয়াল অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক স্টাডিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের আলোকে বাংলাদেশের আইন ও বর্তমান বাস্তব চর্চা পর্যালোচনা করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আইন ও প্রয়োগের মধ্যে কোথায় কোথায় বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে তা চিহ্নিত করা।
আমরা দেখেছি, ২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বাস্তব প্রয়োগের ঘাটতি। গত ১৩ বছরে উচ্চ আদালত পর্যন্ত মাত্র একটি নির্যাতন মামলায় সাজা নিশ্চিত হয়েছে, সেটিও এখনো আপিল বিভাগে বিচারাধীন। বাস্তবে নির্যাতনের ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও ভুক্তভোগীদের আস্থা না থাকায় তাঁরা আইনের আশ্রয় নিতে আগ্রহী হন না। এটি কেবল আইনি নয়, বরং গভর্ন্যান্স ও আস্থার সংকট।
আমাদের আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুলিশের কাছে দেওয়া দোষ স্বীকারোক্তি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, তবে সেই বক্তব্যের ভিত্তিতে যদি কোনো তথ্য বা আলামত উদ্ধার হয়, তবে তা সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাক্ষ্য আইনের ২৭ ধারার এই ব্যতিক্রমী বিধানটির ব্যাপক অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় এবং পরে সেটির ভিত্তিতে সাজানো আলামত উদ্ধার দেখিয়ে দোষ স্বীকারোক্তিকে বৈধতা দেওয়া হয়, যা আইনের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার অধীনে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দেওয়া দোষ স্বীকারোক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। বর্তমানে অনেক মামলার শাস্তি কার্যত দোষ স্বীকারোক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই স্বীকারোক্তি সত্যিই কতটা স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়? বাস্তবে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে আসামি শুধু পুলিশ হেফাজত থেকে এসে দোষ স্বীকারোক্তি দেন। বিবেকের তাড়নায় আসামিরা দোষ স্বীকারোক্তি দিলে ব্যাপারটি সব ক্ষেত্রে এমন হওয়ার কথা নয়। অন্যদিকে, ১৬৪ ধারায় রেকর্ডকৃত দোষ স্বীকারোক্তি যদি নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয় তবে তা প্রমাণের দায় আসামির ওপর বর্তায়। বাস্তবে এটি প্রমাণ করা আসামির জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা আরও দেখেছি, গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আইনের গণ্ডির বাইরে ব্যাপক মাত্রায় স্বেচ্ছাচারিতার চর্চা বিদ্যমান। আইন দ্বারা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না। ‘ওপরের নির্দেশে গ্রেপ্তার’ বা ‘জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে আনা’—এ ধরনের ধারণা আইনগতভাবে বৈধ নয়, কিন্তু বাস্তবে তা স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়েছে। এটি মূলত বেআইনি আটক বা রংফুল কনফাইনমেন্টের রূপ।
একইভাবে দণ্ডবিধির ২২০ ধারা অনুযায়ী বেআইনি গ্রেপ্তারের জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও এর প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে আইনের অস্তিত্ব থাকলেও কার্যকর জবাবদিহি অনুপস্থিত। আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার–সংক্রান্ত চুক্তি অনুমোদন করেছে, যেখানে বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী আটক ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও কিছু বিষয়ে সংরক্ষণ আছে, তবে এ–সংক্রান্ত ক্ষতিপূরণের বিষয়ে বাংলাদেশের কোনো সংরক্ষণ নেই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের একটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, কিন্তু দেশীয় আইনে তার প্রতিফলন নেই।
আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা যদি আমরা না–ও মানি, বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী আটক ও গ্রেপ্তারের জন্য একটি ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অন্তত স্বীকার করতে হবে যে নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্য রয়েছে। এটি বড় অঙ্কের না হলেও প্রতীকী অর্থে হলেও বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
টর্চার কনভেনশন অনুযায়ী নির্যাতন প্রতিরোধে একটি জাতীয় প্রতিরোধব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও ২০২৫ সালের মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ কার্যকর না থাকায় বর্তমানে সেই কাঠামো অনুপস্থিত। এটি একটি বড় শূন্যতা তৈরি করেছে।
আমরা আরও দেখেছি, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে থানায় রাখা বা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার বিধান থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় ডিবি বা অন্যান্য সংস্থার হেফাজতে রাখা হয়, যা আইনগতভাবে বৈধ নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিষ্ঠিত বেআইনি চর্চায় পরিণত হয়েছে।
পুলিশ ডায়েরি বা কেস ডায়েরি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে না পাঠানো সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে আসামিকে জেলে পাঠানো হয়, যা একটি গুরুতর আইনি লঙ্ঘন। উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় তা মানা হয় না।
গ্রেপ্তারের সময় অযথা হাতকড়ার ব্যবহার, শারীরিক দমনমূলক আচরণ এবং গণমাধ্যমে আসামিকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা অভিযুক্তকে নির্দোষ ধরে নেওয়ার মানবাধিকার নীতির লঙ্ঘন। একইভাবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আগেই দোষী ঘোষণা করাও মানবাধিকারের পরিপন্থী।
আমি মনে করি, পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির জন্য একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন, যা গ্রেপ্তার ও আটক প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে এবং তথ্য প্রকাশ করবে। বর্তমানে এই ধরনের স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।
সবশেষে আমি বলেছি, এই সমস্যাগুলো শুধু পুলিশের নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রকাঠামোর সমস্যা। বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ এবং নাগরিক সমাজ—সবাই এর সঙ্গে যুক্ত। তবে চূড়ান্ত নজরদারির দায়িত্ব বিচার বিভাগের হলেও বাস্তবে সেই ভূমিকা অনেক সময় কার্যকর হয়নি। এই সংকট আইনের নয়, বরং প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির।
মো. বদিউজ্জামান তপাদার
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ
বিচারিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক আটক কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। এই প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো, বিশেষ করে ব্লাস্ট এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বড় ভূমিকা ছিল। তারা বিনা খরচে আইনি সহায়তা দিয়ে হাজারো মানুষকে প্রতিরোধমূলক আটক ও নির্যাতন থেকে মুক্ত হতে সহায়তা করেছে।
কিন্তু নব্বই–পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, পুলিশের দলীয়করণ বেড়েছে এবং ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি তাদের আনুগত্য তৈরি হয়েছে। এর ফল হিসেবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়নে পুলিশকে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা গেছে। আমি দুটি উদাহরণ দিতে চাই। প্রথমত, একসময় প্রকাশ্য সড়কে একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল। পরে আমরা দেখেছি, সংসদ ভবনের সামনে বিরোধীদলীয় নেতা হুইপকে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাকে পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তারা আগের সরকারকে প্রতিপক্ষ ভেবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়নে পুলিশকে ব্যবহার করে, ফলে এই পরিস্থিতির বদল হয় না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে পুলিশকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা ফাইল করা হয়।
এই অবস্থার পরিত্রাণে, অনতিবিলম্বে একটি স্বাধীন পুলিশ অভিযোগ কমিশন গঠন করা হোক। এই কমিশনের প্রধান থাকবেন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা বা তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধি। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত পুলিশ নিজে করবে না; স্বাধীন কমিশন করবে। তাহলেই পুলিশ জবাবদিহির কাঠামোয় আসবে।
আরেকটি বিষয় হলো, গ্রেপ্তার করা থেকে আদালতে তোলা পর্যন্ত পুরো ঘটনায় পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেটসহ সবারই জবাবদিহি প্রয়োজন কাঠামোগত সমস্যা সমাধানের জন্য।
নূর খান লিটন
মানবাধিকারকর্মী
আমাদের দেশে গ্রেপ্তার, আটক বা তুলে নেওয়ার শুরুতেই ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। অনেক সময় আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সামনেই এই নির্যাতন করা হয়। বাস্তবে কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, পুলিশের ভেতরে অর্থ আদায়ের প্রবণতার সঙ্গেও অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে। নির্যাতনের মাধ্যমে ভয় সৃষ্টি ও প্রভাব বিস্তারের চর্চাও এখানে কাজ করে।
সাধারণত কাউকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেওয়ার কথা। তবে বাস্তবে এর ব্যতিক্রমও ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে থানার বদলে পুলিশ কর্মকর্তাদের বাসায় আটক রেখে নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। বিগত বছরগুলোতে আমরা আরও দেখেছি, পুলিশ লাইনের ভেতরে নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আলাদা কক্ষ তৈরি করা হয়েছে।
উগ্রবাদের নামে যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের অনেকের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে যেন তাদের জন্য দেশের আইন প্রযোজ্য নয়। শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো পরিবারকে মাসের পর মাস আটকে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। পরে তিন মাস, ছয় মাস কিংবা এক বছর পর আদালতে হাজির করা হলেও ম্যাজিস্ট্রেটরা অনেক ক্ষেত্রে জানতে চাননি, কবে বা কোথা থেকে তাদের আটক করা হয়েছিল।
আমার মনে হয়, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার সময় এ প্রশ্ন করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। গুম কমিশনে কাজ করতে গিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে এমন ঘটনাও জেনেছি, যেখানে তাদের বক্তব্য পুলিশের বর্ণনার সঙ্গে না মেলায় ম্যাজিস্ট্রেট উল্টো পুলিশকে ডেকে প্রশ্ন করেছেন। এতে ভুক্তভোগীরা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আকস্মিক পরিদর্শন জরুরি। গারদখানা, নথিপত্র, বন্দীদের অবস্থা, মাঠপর্যায়ের পরিবহনব্যবস্থা ও বাস্তব পরিস্থিতিও নিয়মিত তদারকি করতে হবে।
সবশেষে বলব, গুম বা নির্যাতনের ঘটনা যদি সংসদে আলোচনা না হয়, তাহলে রাজনীতিবিদেরা শুধু সংসদের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন না; তাঁদের দাবি আদায়ে রাজপথে নামতে হবে। আলোচনার ধারাবাহিকতাও বজায় রাখতে হবে।
ইলিরা দেওয়ান
মানবাধিকারকর্মী
আইনে যা আছে, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না। আইনকে পাশে সরিয়ে রেখে অন্যভাবে পুরো প্রক্রিয়া চালানো হয়। আমার কাছে এটি একধরনের ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ বলেই মনে হয়। বছরের পর বছর ধরে এই চর্চা চলতে চলতে আমরা যেন এটাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছি। বিচার বিলম্বের কারণে দীর্ঘ সময় আটক থাকার প্রসঙ্গ এলেই বারবার বম জনগোষ্ঠীর কথা মনে পড়ে।
৫ আগস্টের পর বহু খুনের মামলার আসামি, এমনকি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও কারাগার থেকে বের হয়েছেন। কিন্তু আজ ৭০০ দিনের বেশি সময় পার হয়ে গেছে বম জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষ এখনো আটক রয়েছেন। সম্প্রতি কয়েকজন নারী জামিন পেয়েছেন। এমন ঘটনাও আছে, যেখানে বুকের দুধ খাওয়া শিশু মায়ের সঙ্গে কারাগারে গিয়ে সেখানেই বড় হয়েছে এবং পরে মায়ের সঙ্গেই কারাগার থেকে বের হয়েছে। কয়েক দিন আগে চারজনের জামিন হয়েছে। কিন্তু এত দিন ধরে তাঁরা কেন জামিনের বাইরে থাকবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগ ছিল। আমরা অবশ্যই চাই, যাঁরা অপরাধে জড়িত তাঁদের বিচার হোক। কিন্তু যদি কয়েকজন এতে জড়িত থাকেন, তাহলে পুরো বম জনগোষ্ঠী—গৃহবধূ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ—একইভাবে এর দায় বহন করবে কেন? সবার প্রতি একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁদেরও জামিন পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
পাহাড় ও ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের প্রতি দীর্ঘদিনের একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি এখনো বদলায়নি। ফলে তাঁরা সমাজে চলমান বৈষম্যের পাশাপাশি আরও বিশেষ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া সঠিক বিচার সম্ভব হবে না।
মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, আগের আইনে তারা শুধু সুপারিশ করতে পারত, কার্যকর জবাবদিহির সুযোগ ছিল না। নতুন অধ্যাদেশে জবাবদিহির একটি সুযোগ তৈরি হলেও তা আইনে রূপ পায়নি। এতে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি।
সবশেষে বলব, বর্তমান কাঠামোর পরিবর্তন দরকার, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা—যেই দায়িত্বেই থাকুন না কেন, সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তা না হলে বিচারহীনতার অন্ধকার থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে না।
তাসনিম জারা
রাজনৈতিক কর্মী
রাষ্ট্র নিজে যখন নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন তার ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি হয়। আমরা ভুক্তভোগীর মুখ থেকেই সেসব অভিজ্ঞতা শুনেছি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি প্রতিকারমূলক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর গঠনপ্রক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধতা আছে। বাছাই কমিটিতে সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা থাকেন। ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। সংসদও পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, কারণ সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তাই শুধু গ্রেপ্তার বা আটক নিয়ে আলোচনা করলে পুরো সমাধান পাওয়া যাবে না। ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক চরিত্রকে সামনে আনে। তাই বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
একটি বেআইনি গ্রেপ্তার শুধু একজন ব্যক্তির অধিকার ক্ষুণ্ন করে না, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রকেও সংকুচিত করে। বাস্তবায়নের ঘাটতি দূর করতে হলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণব্যবস্থা দরকার। কতজনকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, কত সময় পর আদালতে তোলা হচ্ছে, কতটা বেআইনি আটক হচ্ছে—এসব তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি।
একই সঙ্গে গ্রেপ্তার ও আদালতে হাজির করার নির্দিষ্ট পর্যায়ে শারীরিক চিকিৎসা বাধ্যতামূলক করা দরকার, যাতে নির্যাতনের প্রমাণ নথিভুক্ত করা যায় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
হুমায়রা নূর
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং যুগ্ম সদস্যসচিব, জাতীয় নাগরিক পার্টি
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বা নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা নিয়ে যত কথাই বলা হোক, যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, তারা সব প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়। ফলে ভালো আইন বা প্রস্তাব থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ হয় না।
মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা তা দেখেছি। মানবাধিকার কমিশনকে আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বাহিনীর কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল, কারণ গুমের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কমিশনকে কার্যকরভাবে ক্ষমতায়ন করা হয়নি। থানায় মামলা করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, অনেক সময় মামলা নেওয়া হয় না। মামলা হলেও তদন্ত দীর্ঘ হয়, ফলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বাংলাদেশে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট আইন না থাকার কারণে মানুষ নিরাপদ বোধ করে না। রিমান্ডে কাউকে নির্যাতন করা আইনসম্মত নয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা নির্যাতনের নানা ঘটনা দেখি। কাউকে গ্রেপ্তার করলে তাকে কেন নেওয়া হচ্ছে, কোন আইনে নেওয়া হচ্ছে—তা জানানো বাধ্যতামূলক। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও এগুলো মানা হয় না। কাউকে গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর পরিবারকে জানাতে হবে। থানায় আনার পর থেকে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। থানায় কার্যকর সিসিটিভি থাকতে হবে, ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, রিমান্ডের সময়ও ভিডিও ধারণ রাখতে হবে। ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং গ্রেপ্তার, আটক ও রিমান্ড প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
আবু সাঈদ খান
সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক
বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও হেফাজতে নির্যাতনের পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে আগে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়, পরে তার বিরুদ্ধে মামলা ঠিক করা হয়। রাজনৈতিক নির্দেশে কাউকে আটক করার পর এমন মামলা খোঁজা হয়, যাতে তাকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায়। নির্যাতনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। পরে এতে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে, দালাল চক্র সক্রিয় হয় এবং বিভিন্ন ধরনের মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়।
আমার মতে, এই সমস্যার মূলে শুধু আইনের ত্রুটি দায়ী নয়; রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবও বড় কারণ। ত্রুটিপূর্ণ আইন থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে ভালো শাসন সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া এ অবস্থার পরিবর্তন হবে না। মুক্তিযুদ্ধ, গণ-আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পরও মানুষের প্রত্যাশার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।
একই সঙ্গে রাজনীতিবিদ পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেটের একটি ত্রিপক্ষীয় যোগসাজশ তৈরি হয়েছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন চক্র গড়ে ওঠে। এই চক্র ভাঙতে হলে রাজনীতিকে ঠিক করতে হবে। নিম্ন আদালতের জন্য আলাদা সচিবালয় গঠনের যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা বাতিল হওয়ায় বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিয়েও নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আইনের ফাঁকফোকর বন্ধের পাশাপাশি, চর্চার পরিবর্তনও জরুরি। ব্রিটিশ আমলের পুলিশি সংস্কৃতি এখনো রয়ে গেছে। সেই সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে কেবল আইন সংশোধন করে খুব বেশি ফল পাওয়া যাবে না। শুধু সামান্য জরিমানা যথেষ্ট নয়; বড় অঙ্কের জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে, যাতে পুলিশ কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে জবাবদিহির বাস্তব চাপ তৈরি হয়।
ড. কাজী জাহেদ ইকবাল
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও প্যানেল আইনজীবী, ব্লাস্ট
আমাদের মূল সংকট ক্ষমতার কাঠামো ও আইন প্রয়োগের সংস্কৃতির। সংবিধানে ক্ষমতার যে কাঠামো আছে, তা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। এই কাঠামো রেখে আইনের শাসন বা বহুমাত্রিক রাষ্ট্র গড়া খুব কঠিন। সামনে সাংবিধানিক সংস্কারের যে সুযোগ এসেছে, সেখানে জনমুখী ক্ষমতাকাঠামো নিয়ে ভাবার সুযোগ আছে।
ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া আইনি ধারা আমরা এখনো অনুসরণ করছি, যা বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় মানানসই নয়। ফলে শুধু আইন পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ও ১৬৭ ধারার সংশোধনের পরও বাস্তব পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি। কেস ডায়েরি বা প্রমাণ যাচাই যথাযথভাবে না করেই পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার দেখানোর পক্ষে রয়েছে। তাই শুধু পুলিশের নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন দরকার। একই সঙ্গে একটি কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা প্রণয়ন প্রয়োজন। বিচার বিভাগ, বিশেষ করে ম্যাজিস্ট্রেটদের ভূমিকাও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
১৬৪ ধারার জবানবন্দির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষার আইন প্রণয়ন জরুরি। গুম কমিশনের জন্যও আলাদা আইন থাকা উচিত। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও মানবাধিকার কমিশন আইন থেকে পৃথক হওয়া দরকার।
প্রিয়া আহসান চৌধুরী
অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশ, এবং উপদেষ্টা, ব্লাস্ট
আমাদের হেফাজতীয় সুরক্ষাব্যবস্থা—যেমন দ্রুত আদালতে হাজির করা, গ্রেপ্তারের তথ্য পরিবারকে জানানো, আইনজীবীর সহায়তা এবং আটকের কারণ জানার অধিকার—কিছু সংবিধানে বলা আছে, বাকিগুলো আইন, আপিল বিভাগের নির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক সনদেও আছে। কিন্তু মূল সমস্যা বাস্তবায়ন, জবাবদিহি ও প্রতিকার নিশ্চিত করা। অভিযোগ করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে মামলা নেওয়া হয় না; মামলা হলেও পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ পুলিশই তদন্ত করে, আর বিচারিক তদন্ত বাধ্যতামূলক নয়। ফৌজদারি কার্যবিধির সুরক্ষা ভঙ্গ হলেও রিট ছাড়া কার্যকর প্রতিকার নেই। ২০১৩ সালের নির্যাতনবিরোধী আইনে ইশতিয়াক হোসেন জনি হত্যা মামলাই এখন পর্যন্ত একমাত্র রায়প্রাপ্ত মামলা; সেটিও আপিলে রয়েছে এবং বিচারাধীন থাকার কারণে ১১ বছরেও জনির ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এক টাকা ক্ষতিপূরণ পায়নি। এই আইনে মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২ লাখ ও অন্য ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত, যা বাস্তবসম্মত নয়। সমন্বিত ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকায় ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার হয়রানির শিকার হয়। তাই প্রতিরোধ ও জবাবদিহি জোরদার করা জরুরি। থানায় ও আদালতে অধিকার–সংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শন, আটকের সময় বডি ক্যামেরা, আটককেন্দ্রে সিসিটিভি, রিমান্ডে আইনজীবীর উপস্থিতি এবং অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি স্বাধীন পরিদর্শন, বাধ্যতামূলক চিকিৎসা পরীক্ষা এবং সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড—ইস্তাম্বুল ও মিনেসোটা প্রটোকল গ্রহণ করা জরুরি। ক্ষতিপূরণের সীমা বাড়িয়ে মামলাভিত্তিক ও পুনর্বাসনভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়নও জরুরি।
শাহরিয়ার সাদাত
নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
রাষ্ট্রের দুটি বড় ভূমিকা রয়েছে—সুরক্ষা দেওয়া ও সহায়তা করা। কিন্তু সহায়তা ও সুরক্ষার উভয় জায়গাতে আমাদের উল্লেখযোগ্য সফলতা নেই। পুলিশিং অত্যন্ত কঠিন কাজ। একদিকে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে মানুষের অধিকার রক্ষা—এই সূক্ষ্ম সীমারেখা মেনে চলতে হয়।
কিন্তু আমাদের দেশে ভালো তদন্তের বদলে স্বীকারোক্তিনির্ভর পদ্ধতি যেন একধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনি সুরক্ষা লাভের কথা স্পষ্টভাব উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যায় না। তাই একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে এসব তথ্য যাচাই ও প্রকাশের উদ্যোগ নিতে হবে।
এর ফলে তথ্যনির্ভর নীতি ও কাজের সমন্বয় করা যাবে। রাষ্ট্র দখলের প্রবণতা বাড়ায় আইনের শাসনের অবস্থাও খারাপ হয়েছে। এ অবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ জরুরি। বডি ক্যামেরা, নজরদারি ক্যামেরার মতো ব্যবস্থা কার্যকরভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।
মো. বরকত আলী
পরিচালক (লিগ্যাল), ব্লাস্ট
আমাদের দেশে বিদ্যমান পুলিশ আইন, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং দণ্ডবিধি ঔপনিবেশিক আমলের। বাস্তবতার নিরিখে আমরা অদ্যাবধি এ আইনগুলো সংশোধন কিংবা নতুন আইন তৈরি করতে পারিনি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ফৌজদারি কার্যবিধিতে ভালো কিছু সংশোধন আনা হয়েছে। বিশেষ করে ১৬৭ ধারায় বেআইনি আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেটের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এখনো দেখি, এক মামলায় জামিন পাওয়ার পর আরেক মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আটক রাখা হচ্ছে। এ অবস্থায় শুধু পুলিশ নয়; বরং ম্যাজিস্ট্রেট, প্রসিকিউশন, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট সবারই আরও অধিক দায়িত্বশীল হতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে গ্রেপ্তার ও আটকের সুরক্ষার কথা বলা আছে এবং নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষার কথা বলা আছে, কিন্তু এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নেই। আমাদের মূল সমস্যা হলো আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারা।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পুলিশ সংস্কার কমিশনসহ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল এবং সব কমিশনের পক্ষ থেকে নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত বেশ কিছু সুপারিশ প্রদান করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার কোনো প্রতিফলন আমরা দেখতে পাইনি। আমরা এমন পুলিশ চাই, যাঁরা নৈতিকভাবে দৃঢ় হবেন এবং নির্ভয়ে আইনসম্মত দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন। চাকরি হারানোর ভয় বা বদলির আশঙ্কায় সত্য গোপন করবেন না।
বেআইনিভাবে আটক বা গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের আইনি বিধান থাকা জরুরি এবং একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখা দরকার, ক্ষতিপূরণ নির্দিষ্ট কোনো অ্যামাউন্ট হতে পারে না। এটা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির বয়স, আয়ের সক্ষমতা, তাঁর ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তির সংখ্যা ইত্যাদি বিষয়াদি বিবেচনা করে নির্ধারণ করতে পারে। আমাদের দেশে শ্রম আইন এবং নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইনের মধ্যে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্দিষ্ট ও স্বল্প করে দেওয়া হয়েছে, যা আদৌ যৌক্তিক নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বিলোপ করা হয়েছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই, সরকার আনুষঙ্গিক সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দ্রুতই এ দুটি বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করবেন।