সংসারের কাজ সামলে আম সংগ্রহ, খাগড়াছড়িতে নারীদের বাড়তি আয়

· Prothom Alo

ভোরের আলো ফোটার আগেই দলবেঁধে বেরিয়ে পড়েন তাঁরা। কারও হাতে বাঁশের ঝুড়ি, কারও কাঁধে ক্রেট। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে পৌঁছে যান আমবাগানে। এরপর শুরু হয় তাঁদের ব্যস্ততা। কেউ গাছ থেকে আম পাড়েন, কেউ ঝুড়ি ভর্তি করেন, আবার কেউ মাথায় সেই ঝুড়ি বাজারজাতের উদ্দেশ্যে নিয়ে যান বাগানের বাইরে। আমের মৌসুমে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় এমন দৃশ্য এখন নিত্যদিনের।

বছরের অধিকাংশ সময় গৃহস্থালি কাজেই ব্যস্ত থাকেন অধিকাংশ পাহাড়ি নারী। তবে আমের মৌসুম এলেই বদলে যায় চিত্র। সংসারের কাজ সামলে এসব নারীর অনেকেই যুক্ত হন আমবাগানের কাজে। এতে পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ হয় তাঁদের।

Visit turconews.click for more information.

হ্লামংচিং মারমা, বাগানমালিক, মানিকছড়ি উপজেলা।স্থানীয় নারীরা শুধু আম সংগ্রহ নয়, বাছাই ও প্যাকেটজাত করার কাজেও দক্ষ। তাঁদের কারণে আমাদের ব্যয় কিছুটা কমে এবং আমের গুণগত মানও বজায় থাকে।

সম্প্রতি পানছড়ি উপজেলার দুদুকছড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা আমবাগানগুলোতে চলছে ফল সংগ্রহের ধুম। গাছে গাছে ঝুলছে পাকা আম। একদল নারী হাসি-আড্ডার মধ্যেই ব্যস্ত রয়েছেন আম সংগ্রহে। তাঁদেরই একজন অনিতা চাকমা। তিনি বলেন, ‘আমের মৌসুমে ঘরে বসে থাকি না। প্রতিদিন বাগানে কাজ করে প্রায় ৪০০ টাকা আয় হয়। সংসারের খরচ চালাতে এই টাকা অনেক সাহায্য করে। অন্য সময় শুধু ঘরের কাজ করি, কিন্তু এই সময়ে সবাই মিলে আম পাড়তে এসে ভালোও লাগে।’

মিতা ত্রিপুরা নামে আরেক নারী বলেন, ‘আমবাগানের কাজ খুব একটা সহজ নয়। অনেক সময় গাছে উঠতে হয়, আবার ক্রেটভর্তি আম বহন করতে হয়। তবু পরিবারের জন্য কিছু করতে পারছি, সেটাই বড় আনন্দ।’

আম সংগ্রহ করছেন পাহাড়ি এক নারী

পাশের আরেকটি বাগানে কাজ করছিলেন নুনুমা মারমা ও বিউটি বড়ুয়া। তাঁরা জানান, অনেক সময় পাড়ার নারীরা দলবদ্ধভাবে কোনো বাগানে কাজ করেন। ১০ থেকে ১২ জন নারী একসঙ্গে বাগানমালিকের সঙ্গে চুক্তি করে নির্দিষ্ট পরিমাণ আম সংগ্রহের দায়িত্ব নেন। এতে দৈনিক মজুরির পাশাপাশি অতিরিক্ত আয় করার সুযোগও তৈরি হয়।

খাগড়াছড়ি সদরের গাছবান এলাকার শান্তি ত্রিপুরা বলেন, ‘আমরা কয়েকজন মিলে বাগানমালিকের সঙ্গে চুক্তি করে কাজ নিয়েছি। ভোর থেকে কাজ শুরু করি। সংসারের কাজ সামলে আম সংগ্রহ করা অনেক কঠিন। কারণ, অনেক সময় সন্ধ্যা পর্যন্তও কাজ করতে হয়। বিশ্রাম নেওয়ারও তেমন সুযোগ থাকে না।’

স্থানীয় আমবাগানের মালিক মংপ্রু মারমা বলেন, আমের মৌসুমে শ্রমিকের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। এ সময় স্থানীয় নারীরা এগিয়ে আসায় শ্রমিকসংকট হয় না। তাঁরা অত্যন্ত দায়িত্বশীলভাবে কাজ করেন। যত্ন নিয়ে আম সংগ্রহ করায় ফলের ক্ষতিও কম হয়।

খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া এলাকার আমচাষি সুজন চাকমা বলেন, ‘আগে আম সংগ্রহের সময় শ্রমিকের অভাব দেখা দিত। এখন নারীরা এগিয়ে আসায় সেই সমস্যা অনেকটাই কমেছে। তাঁরা সময়মতো কাজ শেষ করে দেন। ফলে দ্রুত বাজারে আম পাঠানো সম্ভব হয়।’

মানিকছড়ি উপজেলার বাগানমালিক হ্লামংচিং মারমা বলেন, ‘স্থানীয় নারীরা শুধু আম সংগ্রহ নয়, বাছাই ও প্যাকেটজাত করার কাজেও দক্ষ। তাঁদের কারণে আমাদের ব্যয় কিছুটা কমে এবং আমের গুণগত মানও বজায় থাকে।’

খাগড়াছড়িতে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে আমের আবাদ। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে উঠেছে নতুন নতুন বাগান। এর ফলে আমের মৌসুমে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ। বিশেষ করে পাহাড়ি নারীদের জন্য এটি বাড়তি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে আমসহ বিভিন্ন ফল উৎপাদন ও সংগ্রহে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। এটি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ইতিবাচক উদাহরণ। তিনি বলেন, মৌসুমি ফল সংগ্রহের মাধ্যমে নারীরা পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তাঁরা আরও বেশি লাভবান হবেন। কৃষিভিত্তিক কাজে নারীদের অংশগ্রহণও আরও বাড়বে।

Read full story at source