রাইট ব্যাক থেকে যে মানুষ আজীবনের লেফট উইঙ্গার
· Prothom Alo

গোলাম সারোয়ার টিপু তাঁর জন্মের তারিখের সঙ্গে সময়টাও জানেন—১৯৪৪ সালের ২৩ অক্টোবর, সোমবার, সকাল সোয়া ১০টা। তিনি বললেন, ‘এটা আমি জানতে পেরেছি, কারণ আমার বাবা ডায়েরি লিখতেন। আমার ওপরেই শুধু। আমি কখন ঘুমাচ্ছি, কী করছি, সব লেখা থাকত।’
ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো সাক্ষাৎকারগুচ্ছের অংশ হিসেবে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছি সম্প্রতি।
Visit sweetbonanza-app.com for more information.
জন্ম বরগুনায়, নানার বাড়িতে। বাবা এ এম গোলাম মোস্তফা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর চাকরির কারণে শৈশব কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। প্রাথমিক শিক্ষা মানিকগঞ্জের রাধাবল্লভ প্রাইমারি স্কুলে। ছোটবেলায় কী করতেন? টিপুর উত্তর, ‘এমন কিছু নাই যে না করতাম! দৌড়াতাম, সাঁতার কাটতাম, ঘোড়ায় চড়তাম।’
বিশ্বকাপে এবার ইউরোপের কোনো দল চ্যাম্পিয়ন হতে পারে১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকায় আসেন। ভর্তি হন তেজগাঁও পলিটেকনিক হাইস্কুলে। তখনকার ঢাকার কথা বলতে গিয়ে তাঁর স্মৃতিতে ফিরে আসে এক অন্য শহর। ‘ফার্মগেট থেকে দুই আনা দিয়া গুলিস্তান চলে যাওয়া যেত বাসে। আমরা রাস্তার মাঝখানে বসে গল্পসল্প করতাম। ২০ মিনিট পরপর একটা বাস আসত।’
এখন যেখানে সোনারগাঁও হোটেল, সেখানে নৌকা ভিড়ত। মাটির হাঁড়ি, বাঁশ, সবজি নিয়ে নৌকা এসে দাঁড়াত। টিপু বললেন, ‘আমি নৌকা দিয়া ওইখানে গেছি।’
জগন্নাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু তখন ফুটবলই হয়ে উঠেছে তাঁর প্রধান পরিচয়।
১৯৬৩ সালে তেজগাঁও ফ্রেন্ডসের হয়ে সেকেন্ড ডিভিশনে খেলা শুরু। প্রথম ম্যাচের গল্পটি তিনি আজও ভুলতে পারেননি। মাঠে গিয়েছিলেন রাইট ব্যাক খেলতে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অন্য একজন খেলোয়াড় না আসায় তাঁর হাতে দেওয়া হলো ১১ নম্বর জার্সি।
‘আমি রাইট ব্যাক খেলতে গেলাম, সেইখানে আমার লেফট উইং।’
খেলা শেষে এক প্রবীণ দর্শক তাঁকে ১০ টাকার একটি নোট দিয়ে বলেছিলেন, ‘বাবা, তুমি নিজেকে সুস্থ রাইখো, চরিত্রটা ঠিক রাইখো।’ এরপর তাঁর কোচ সোনা ভাই বলেছিলেন, ‘টিপু, তোমার পার্মানেন্ট পজিশন হয়ে গেল। তুমি এখানেই খেলবা।’
সেই লেফট উইঙ্গার পজিশনই তাঁর স্থায়ী পরিচয় হয়ে যায়।
১৯৬৪ সালে ফার্স্ট ডিভিশনে বিজি প্রেসে যোগ দেন। এরপর জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসা। ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে অল পাকিস্তান দলে সুযোগ পান। তিনি বললেন, ‘আমার ব্লেজারে কিন্তু সিক্সটি সেভেন লেখা আছে।’
পাকিস্তানের করাচিতে প্রথম ম্যাচে খেলতে না পারলেও মুলতানে খেলেছেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রতাপ শংকর হাজরা, জাকারিয়া পিন্টু, হাফিজউদ্দিন ও শাহিদুর ইসলাম শান্টু। ১৯৬৯ সালে ইরানে ফ্রেন্ডশিপ কাপে খেলতে যান।
খুব বেশি মানুষ জানেন না, ফুটবলের বাইরে তাঁর আরেকটি পরিচয়ও আছে। ছোটবেলায় মঞ্চে অভিনয় করেছেন, চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। ফতেহ লোহানী পরিচালিত আকাশ আর মাটি ছবিতে শিশু অভিনেতা ছিলেন তিনি।
১৯৭২ সালে নবগঠিত আবাহনী ক্রীড়া চক্রের প্রথম দলে যোগ দেন। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় দলে খেলার সুযোগও তাঁর সামনে ছিল। কিন্তু হাঁটুর চোটের
কারণে ১৯৭৩ সালের মারদেকা কাপের দল থেকে বাইরে থাকেন। এ নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই।
তিনি বললেন, ‘আই ওয়াজ নট ইন শেপ। এই জন্য এটা আমার কোনো রিগ্রেট নাই।’
১৯৭৪ সালের ১ মার্চ বিয়ে করেন কাজী মমতাজকে। বিয়ের আগে স্ত্রীকে দেখেননি। টিপুর ভাষায়, ‘রুসমতের সময় প্রথম দেখি। এর আগে দেখিও নাই।’
সারা জীবন চাকরি করেছেন সোনালী ব্যাংকে। ১৯৭২ সালে সেখানে যোগ দেন।
বাংলাদেশের সেরা ফুটবলার হিসেবে তিনি বেছে নেন চি হ্লা মং চৌধুরী মারীকে। তাঁর ভাষায়, ‘আমি ওনার থেকে বেটার বাঙালি কোনো প্লেয়ার দেখি নাই।’
সেরা গোলরক্ষক হিসেবে বেছে নেন রণজিত দাসকে। খেলোয়াড় বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের মানুষ কায়কোবাদ। তিনি বললেন, ‘উই কুড রিড ইচ আদার।’
নিজেদের প্রজন্মকে বড় করে দেখার প্রবণতা তাঁর মধ্যে নেই। বরং তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমরা যদি বলি আমরা বেটার ছিলাম, এটা বলা একেবারেই বোকামি।’ তাঁর মতে, পরবর্তী প্রজন্মের খেলোয়াড়েরা তাঁদের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছে, বেশি দৌড়েছে, বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছে। ‘তারা আমাদের থেকে বেটার।’
বাংলাদেশের বর্তমান দল সম্পর্কেও তাঁর মূল্যায়ন ইতিবাচক। বিশেষ করে প্রবাসী খেলোয়াড়দের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা প্রাণটা দিয়া দেয় বাংলাদেশে। এটা আমার ভালো লাগে।’
১৯৭৮ সালে তিনি অবসর নেন। বিদায়ী ম্যাচে কলকাতা মোহামেডানের বিপক্ষে ভালো খেলছিলেন। একটি গোলেও অবদান ছিল তাঁর। পরে তাঁকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়। পরে তিনি শুনেছেন, গ্যালারিতে বসে থাকা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নাকি বলেছিলেন, ‘হি ওয়াজ প্লেয়িং ওয়েল। তাকে উঠাল কেন?’
উত্তরে তাঁকে বলা হয়েছিল, সেটি ছিল তাঁর ফেয়ারওয়েল ম্যাচ।
জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পাওয়ার খবরটিও তিনি পেয়েছিলেন আকস্মিকভাবে। নিজেই জানতেন না। মোহামেডান ক্লাবে বসে ছিলেন। সাংবাদিক মাসুদ আহমেদ রুমী ও ড. নিজাম এসে তাঁকে খবরটি দেন।
সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষে গোলাম সারোয়ার টিপু একটি কথা বলেছিলেন, যা তাঁর ব্যক্তিত্বকে সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরে। তিনি বললেন, ‘আপনি আমাকে অ্যামব্যারেস করছেন। এইভাবে হাইলাইট করছেন। এটা আমি বোধ হয় ডিজার্ভ করি না।’
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস অবশ্য ভিন্ন কথা বলবে। কারণ, দেশের ফুটবলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে গোলাম সারোয়ার টিপুর নাম জড়িয়ে আছে—অল পাকিস্তান দল, আবাহনীর প্রথম দল, দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবন, কোচিং এবং ফুটবল নিয়ে তাঁর সংযত, নিরহংকার দৃষ্টিভঙ্গি।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক