কাঁঠাল খেলে কেন দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে

· Prothom Alo

জাতীয় ফল কাঁঠাল শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়, এটি বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক অনন্য সম্পদ। বাংলা ভাষা ও লোকজ সংস্কৃতিতেও কাঁঠালের বিশেষ স্থান রয়েছে। ‘গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল’ কিংবা ‘পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া’—এ ধরনের বহুল প্রচলিত প্রবাদ-প্রবচন আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও ভাষায় কাঁঠালের উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। বর্ষার আগমনী বার্তায় যখন প্রকৃতি নতুন রূপে সেজে ওঠে, তখন গ্রামবাংলার উঠান, বাগান ও বাড়ির আঙিনায় ঝুলে থাকা বিশাল বিশাল কাঁঠাল এক অনন্য সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে। মিষ্টি সুবাস, রসালো কোয়া এবং বিচির নানাবিধ ব্যবহার বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়।

Visit extonnews.click for more information.

পরিচিতি ও ধরন
কাঁঠালের বৈজ্ঞানিক নাম আর্টোকার্পাস হেটেরোফিলাস (Artocarpus heterophyllus)। এটি মোরেসি (Moraceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি উষ্ণমণ্ডলীয় ফলগাছ। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ গাছে জন্মানো ফল হিসেবে কাঁঠাল বিশেষভাবে পরিচিত। বাংলাদেশে কাঁঠাল সাধারণত তিন ধরনের—রসা, খাজা ও চাউলা। রসা কাঁঠাল নরম, রসালো ও সুগন্ধযুক্ত। খাজা কাঁঠাল তুলনামূলক শক্ত ও কম রসালো। চাউলা কাঁঠালের কোয়ার পরিমাণ কম এবং গঠন শক্ত। এ ছাড়া অঞ্চলভেদে আরও বিভিন্ন স্থানীয় জাত দেখা যায়। আধুনিক কৃষি গবেষণার মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল ও উন্নত জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যা কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।

কাঁঠালগাছ

কোথায় জন্মে
উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু কাঁঠাল চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে এর ব্যাপক চাষ হয়।

বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই কাঁঠাল জন্মালেও গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, জামালপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে উৎপাদন তুলনামূলক বেশি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কাঁঠাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ অন্যতম। উৎপাদনের বড় অংশ দেশীয়ভাবে ভোগ করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সীমিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কাঁঠালের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কাঁচা কাঁঠাল ‘ভেজিটেবল মিট’ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও মানসম্মত বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে কাঁঠাল বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য হয়ে উঠতে পারে।

টিফিনের বিরতিতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের গাছ থেকে নামানো পাকা কাঁঠাল খেয়ে আনন্দে মেতেছে একদল শিক্ষার্থী। ভাঙ্গামুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান

পুষ্টিগুণ
কাঁঠাল একটি অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল। এতে রয়েছে শর্করা, খাদ্যআঁশ, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ভিটামিন এ দৃষ্টিশক্তি ও ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষা করে, ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, খাদ্যআঁশ হজমপ্রক্রিয়া উন্নত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম হৃদ্‌যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কাঁঠালের বিচিও অত্যন্ত পুষ্টিকর। এতে প্রোটিন, খনিজ ও খাদ্যআঁশ রয়েছে; যা ভাজি, ভর্তা ও তরকারিতে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্রীষ্মকালে কাঁঠাল পাকতে শুরু করলে এর পুষ্টিগুণ আরও বৃদ্ধি পায়। এক কাপ কাঁঠালে প্রায় ১৫৭ ক্যালরি শক্তি, ৩৮ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ৩ গ্রাম প্রোটিন, ৩ গ্রাম ফাইবার, ২ গ্রাম ফ্যাট এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। এ ছাড়া এতে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, কপারসহ একাধিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি ও শক্তি জোগাতে সহায়তা করে।

স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও কাঁঠালের উপকারিতা বহুমাত্রিক। এতে বিদ্যমান ভিটামিন সি শরীরকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। প্রচুর খাদ্যআঁশ হজমশক্তি উন্নত করে এবং অন্ত্রের কার্যকারিতা সচল রাখে। প্রাকৃতিক শর্করার কারণে এটি দ্রুত শক্তি জোগায়, ফলে শরীর সতেজ থাকে। পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং হৃদ্‌যন্ত্রকে সুস্থ রাখে। ভিটামিন এ চোখ ও ত্বকের জন্য উপকারী; এটি দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম হাড় ও দাঁত মজবুত করতে সহায়তা করে।

কাঁঠাল স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য

যে কারণে কাঁঠাল খেলে দীর্ঘ সময় ক্ষুধা লাগে না
কাঁঠালে উচ্চ মাত্রার খাদ্যআঁশ ও কার্বোহাইড্রেট থাকে। খাদ্যআঁশ হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়, ফলে পাকস্থলী দীর্ঘ সময় ভরা থাকে। অন্যদিকে, কার্বোহাইড্রেট ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে, যার ফলে দ্রুত ক্ষুধা অনুভূত হয় না। এ ছাড়া কাঁঠালের প্রাকৃতিক শর্করা শরীরে শক্তির জোগান বজায় রাখে এবং দীর্ঘ সময় তৃপ্তি অনুভব করতে সাহায্য করে। তাই পরিমিত পরিমাণে কাঁঠাল খেলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে এবং অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতাও কমে।

তবে অনেকেই লক্ষ করেন, পাকা কাঁঠাল বেশি খেলে শরীরে অলসতা বা ঘুমঘুম ভাব আসে। এর কারণ, এতে থাকা প্রাকৃতিক শর্করা ও উচ্চ মাত্রার কার্বোহাইড্রেট। হজমপ্রক্রিয়ায় তুলনামূলক বেশি সময় লাগায় শরীরের শক্তির একটি অংশ খাদ্য পরিপাকে ব্যয় হয়। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার পর ক্লান্তি বা তন্দ্রাভাব অনুভূত হতে পারে।

সাবেক সভাপতি, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা

Read full story at source