ঘন কালো গায়ের রং, নাম তাই পোড়া বেলে

· Prothom Alo

হাত থেকে পিছলে পড়ার আগেই মাছটা শরীর মুচড়ে নিল। কালচে দেহ। পিঠে কাঁটার মতো খাড়া পাখনা। লেজে কমলা ছোপ। চেনা কোনো মাছের সঙ্গে মিলছে না কিছুতেই। জেলেরা তবু চেনে, নাম দিয়েছে পোড়া বেলে। গায়ের রং এতটাই ঘন কালো যে দেখে মনে হয় সবে আগুন থেকে তুলে আনা হয়েছে। তুমি যদি কখনো নদীর পাড়ে এমন একটা মাছ হাতে পাও, প্রথম দেখায় ভয় পেয়ে যেতেই পারো।

Visit newssport.cv for more information.

বিজ্ঞানের খাতায় নাম বুটিস মেলানোস্টিগমা (Butis melanostigma)। ইংরেজিতে ব্ল্যাকস্পটেড গাজিয়ন। নদী, খাল, বিল, লোনাপানির মোহনা—সবখানেই মেলে এই মাছ। বেলে মাছের সঙ্গে চেহারায় মিল থাকলেও সম্পর্ক নেই কোনো। প্রজাতি আলাদা, স্বভাব, এমনকি পরিবারও আলাদা।

শরীরের গঠনে শিকারির ছাপ

সাধারণ বেলে মাছ লম্বাটে, সরু গড়নের। পোড়া বেলে পুরো বিপরীত। মোটাসোটা শরীর, সামনের দিকটা গোলগাল, পেছনে গিয়ে চাপা হয়ে এসেছে। মাথা দেখলে একবার চমকে উঠতে হয় বটে, একদম সাপের মাথার মতো চ্যাপটা। চোখ দুটো বসানো মাথার ওপরের দিকে। ভাবো একবার, কাদার নিচে পুরো শরীর ডুবিয়ে রেখেও এই চোখ দুটো বাইরে রাখা যায়। শিকারের জন্য এমন গঠন তো দরকারই।

ইলিনয় নদী বাঁচাতে ধরা হয়েছে ২৫ হাজার টন কার্প মাছ

বুটিস গণের সব মাছ মূলত রাতের শিকারি। দিনে কাদার মধ্যে, শিকড়ের আড়ালে, ডুবন্ত গাছের ফাঁকে গা ঢাকা দিয়ে থাকে। শরীরের রং বদলে নিতে পারে চারপাশের সঙ্গে মিলিয়ে। কখনো হালকা হয়ে যায়, কখনো গাঢ়। শিকার কাছে এলে চোখের পলকে ছুটে গিয়ে ধরে ফেলে ফিরে যায় আগের জায়গায়, নিঃশব্দে। তুমি পুকুরপাড়ে বসে এমন একটা মাছ খুঁজতে গেলে সহজে চোখেই পড়বে না। এত দক্ষ এরা আড়াল করার কৌশলে।

একটা মজার অভ্যাস আছে এই মাছের। উল্টো হয়ে সাঁতার কাটে প্রায়ই। মাথা নিচে, লেজ ওপরে। পাতা বা ডালপালার সঙ্গে শরীর লাগিয়ে এমন স্থির হয়ে থাকে যে মরে গেছে বলে ভুল হতে পারে কারও। জেলেরা অনেক সময় এই মাছকে মরা ভেবে পানিতে ফেলেও দেন, পরে দেখেন সাঁতরে পালাচ্ছে। আসলে এটাই এর লুকোচুরির খেলা, ফাঁদ পেতে বসে থাকা।

পাখনায় কাঁটা, লেজে আগুনের আভা

পিঠের পাখনায় সাত-আটটা শক্ত কাঁটা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। সাজের জন্য নয় শুধু, আত্মরক্ষাতেও কাজে লাগে। বড় মাছ বা পাখি শিকার করতে এলে কাঁটা ফুলিয়ে দিলে গলায় বিঁধে যাওয়ার ভয় থাকে। মুখে নিয়ে আবার ছেড়ে দেয় অনেক শিকারি, দ্বিতীয়বার চেষ্টা করে না। তুমি যদি কখনো এই মাছ হাতে নাও, একটু সাবধানে ধরবে। কাঁটার গুঁতো খেতে নিশ্চয়ই তোমার ভালো লাগবে না!

লেজের পাখনা একদম কালো, কিনারায় কমলা-বাদামি রেখা। পোড়া কাঠের গায়ে ছাইয়ের নিচে যেন এখনো জ্বলছে আগুনের শেষ ফোঁটা। সম্ভবত এই রংটা থেকে পোড়া বেলে নামটা এসেছে।

এযাবৎকালে ধরা পড়া ৫টি দানবীয় মাছ

ছোট মাছ হলেও কাজ বড়

আকারে বেশি বড় হয় না এই মাছ। পূর্ণবয়স্ক হলেও লম্বায় ১৮ সেন্টিমিটার পার হয় কমই। বাস্তুতন্ত্রে এর জায়গাটা তবু ছোট নয়। ছোট চিংড়ি, পোকামাকড়ের লার্ভা, ক্ষুদ্র মাছ খেয়ে পানির নিচের ভারসাম্য রক্ষা করে। বড় মাছ আর পাখিরা আবার একে খেয়ে খাদ্যশৃঙ্খলের পরের ধাপে ওঠে। একটা ছোট মাছ, কিন্তু চক্রটা একে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ হয় না। তুমি যখন পরেরবার পুকুরে বা খালে মাছ ধরতে যাবে, এই ছোট্ট শিকারিটার কথা মনে রেখো।

মিঠাপানি, লোনাপানি, সমুদ্রের পানি—তিন জায়গাতেই বাঁচতে পারে এই মাছ। বিজ্ঞানের ভাষায় এমন মাছকে বলে ইউরিহ্যালাইন। নদীর মোহনায় মিঠা আর লোনাপানি মিশে গেলেও এর কোনো অসুবিধা হয় না। এই খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই বহু বছর ধরে একে টিকিয়ে রেখেছে।

নামটা যেভাবে এসেছে

বাংলাদেশের গ্রামে মাছের নামকরণের একটা নিজস্ব রীতি চলে আসছে বহুদিন ধরে। রং দেখে নাম হয়, আকার দেখে নাম হয়, স্বভাব দেখেও কখনো নাম বদলে যায়। পোড়া বেলে নামটাও তেমনই এক লোকজ পরিচয়। বিজ্ঞানের খাতায় নাম বুটিস মেলানোস্টিগমা, কিন্তু নদীর পাড়ে বসে থাকা জেলে বা ডিঙি বাইতে থাকা কিশোরের কাছে এটা পোড়া বেলে। গায়ের রং দেখে দেওয়া সহজ এক নাম।

এটা পোড়া বেলে। কাদার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক রাতজাগা শিকারি, যার শরীরের রংই বলে দেয় এর নামের কারণ।

তথ্যসূত্র: ফিশবেস, সিরিয়াসলি ফিশবিড়াল কেন টুনা মাছ এত পছন্দ করে

Read full story at source