গারো পাহাড়ঘেরা হারিয়াকোনা যেন জীবন্ত ক্যানভাস
· Prothom Alo

সবুজ পাহাড়, উঁচু টিলা, নির্জন লাল মাটির পথ, ঢেউফা নদীর জলধারা আর পাখির কলরবে মুখর পরিবেশ—সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গারো পাহাড়ঘেরা সীমান্তবর্তী গ্রাম হারিয়াকোনা ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্র।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পুরাখাসিয়া এলাকার পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢেউফা নদী হারিয়াকোনা ও বাবেলাকোনা গ্রাম হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীর তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ পাহাড় ও টিলাগুলো এ জনপদের সৌন্দর্যকে দিয়েছে অনন্য মাত্রা। ব্যস্ত নগরজীবনের ক্লান্তি দূর করে প্রকৃতির কাছে ফিরতে চাইলে হারিয়াকোনা হতে পারে এক দারুণ গন্তব্য।
Visit newsbetsport.bond for more information.
শেরপুর জেলা সদর থেকে হারিয়াকোনার দূরত্ব প্রায় ৪৪ কিলোমিটার। শ্রীবরদী উপজেলার মেঘদল বাজার পর্যন্ত যেতে হবে। সেখান থেকে দক্ষিণে প্রায় দুই কিলোমিটার এগোলেই শুরু হয় আঁকাবাঁকা মাটির পথ। ঢেউফা নদীর পাড় ধরে এগোলে দেখা যাবে হারিয়াকোনা ও বাবেলাকোনার পাহাড়ি জনপদ। পথে চোখে পড়ে আদিবাসী উচ্চবিদ্যালয়, খেলার মাঠ ও গারো সম্প্রদায়ের উপাসনালয়। এরপরই শুরু হয় পাহাড়ি টিলা, রাবারবাগান ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ছোট ছোট বসতঘরের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
আরও কিছু দূর এগিয়ে হেঁটে উঠতে হয় পাহাড়চূড়ায়। সমতল ভূমি থেকে টিলায় উঠলেই চোখের সামনে সবুজে মোড়া বিস্তীর্ণ পাহাড়ি প্রান্তর। কোথাও ছোট টিলা, কোথাও বড় টিলা, কোথাও ঘন ঝোপঝাড়, আবার কোথাও পাহাড়ি ছড়া নেমে গেছে নিচের দিকে। বর্ষাকালে এই স্থান আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আর শীতে পাহাড়ের গা বেয়ে নামা মেঘ ও কুয়াশা পুরো এলাকাকে এনে দেয় অন্য রকম এক আবহ। ভোর ও বিকেলে হারিয়াকোনা হয়ে ওঠে আরও মোহনীয়। পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো পড়ার দৃশ্য আর চারপাশের নিস্তব্ধতা যে কাউকে মুগ্ধ করবে।
পর্যটকেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। সম্প্রতি শ্রীবরদীর হারিয়াকোনা গ্রামের গারো পাহাড়েএ এলাকায় প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ গারো সম্প্রদায়ের। তাঁদের সহজ-সরল জীবনযাপন, পাহাড়ি সংস্কৃতি, কৃষিকাজ ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারা পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ। পাহাড়ের ঢালে চাষ করা নানা ফল ও শাকসবজিও নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের। পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে চোখে পড়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের সীমানাখুঁটি। দেখা যায় ভারতের মেঘালয়ের ছোট-বড় পাহাড়, সীমান্ত সড়ক ও কাঁটাতারের বেড়া। সীমান্তঘেঁষা ৮৮৭ একর বনভূমিজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ২০–৩০ মিটার উচ্চতার কয়েকটি টিলা।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, একসময় হারিয়াকোনার নাম খুব কম মানুষ জানতেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখানকার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ভ্রমণপ্রেমীদের আগ্রহ বেড়েছে।
হারিয়াকোনা ঘুরে এসে নালিতাবাড়ী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, গারো পাহাড়ের কথা অনেকেই জানেন, কিন্তু হারিয়াকোনার পাহাড় ও টিলার সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ। সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি ময়মনসিংহ বিভাগের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
কোথাও ছোট টিলা, কোথাও বড় টিলা, কোথাও ঘন ঝোপঝাড়। সম্প্রতি শ্রীবরদীর হারিয়াকোনা গ্রামের গারো পাহাড়েময়মনসিংহ থেকে বেড়াতে আসা সাকিবুল হাসান বলেন, এখানে নদী, পাহাড় ও প্রকৃতিকে একসঙ্গে উপভোগ করা যায়। পাশাপাশি গারোদের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখার সুযোগ রয়েছে। পাহাড়ে উঠতে কিছুটা কষ্ট হলেও চূড়ায় পৌঁছে সবুজের যে অপার সৌন্দর্য দেখা যায়, তাতে সব কষ্ট মুহূর্তেই ভুলে যেতে হয়।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা সুমন মিয়া বলেন, হারিয়াকোনা সংরক্ষিত বনভূমিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রায় ৮০০ একরজুড়ে রয়েছে রাবার বাগান। তবে এখানে তাঁবু স্থাপন করে অবস্থান করতে হলে বন বিভাগের অনুমতি নিতে হবে।