কাঁঠালপাড়া হোক মাদকমুক্তির প্রেরণা
· Prothom Alo

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল তো বটেই, নগরজীবনেও ক্রমবর্ধমান জনঘনত্ব ও পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের ফলে শিশু-কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত খেলার মাঠের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। শৈশব ও কৈশোরের যে স্বাভাবিক বিকাশ খেলাধুলার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা, তার পরিবর্তে তারা ক্রমে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে নিষ্ক্রিয়তা, ভার্চ্যুয়াল নির্ভরতা এবং অনেক ক্ষেত্রে মাদকের অন্ধকার জগতে। মাঠহীনতা কেবল শারীরিক বিকাশকে ব্যাহত করে না; এটি মানসিক ও নৈতিক অবক্ষয়েরও পথ প্রশস্ত করে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের কাঁঠালপাড়া গ্রামের সাম্প্রতিক উদ্যোগ এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। গ্রামে কোনো খেলার মাঠ না থাকায় স্থানীয় তরুণেরা নিজেদের উদ্যোগে তিন বিঘার বেশি জমি লিজ নিয়ে সেটিকে খেলাধুলার উপযোগী করে তুলেছেন। এ জন্য প্রতিবছর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় করা হচ্ছে, যা গ্রামীণ বাস্তবতায় একটি বড় অঙ্ক। ক্লাবের সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ৫০০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দিয়ে এই অর্থসংস্থান করেছেন। এটি এই উদ্যোগের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতার স্পষ্ট প্রমাণ।
Visit freshyourfeel.org for more information.
দুই বছর ধরে এই মাঠে নিয়মিত ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলা হচ্ছে এবং প্রতিদিন বিকেলে ৫০ থেকে ১০০ জনের সমাগম ঘটছে। শুধু খেলোয়াড়ই নয়, দর্শকেরাও এখানে যুক্ত হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, মাঠটি চালু হওয়ার পর গ্রামের তরুণদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং মাদকের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এই উদ্যোগের আরেকটি দিক হলো এর সামাজিক প্রভাব। মাঠটি এখন কেবল খেলাধুলার স্থান নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনটি খেলাধুলার পাশাপাশি শীতবস্ত্র বিতরণ ও অসহায় মানুষের সহায়তায়ও ভূমিকা রাখছে। ফলে এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
এ ধরনের উদ্যোগ এখনো বিরল। দেশের অধিকাংশ গ্রাম ও শহরে খেলার মাঠের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও তা সমাধানে স্থানীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এমন উদ্যোগ খুব বেশি দেখা যায় না। কাঁঠালপাড়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, পরিকল্পনা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে সীমিত সম্পদ নিয়েও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা জরুরি। সরকারি পর্যায়ে স্থানীয় মাঠ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কার্যকর নীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগ ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া গেলে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কাঁঠালপাড়ার এই উদ্যোগ একটি সরল বার্তা দেয়—খেলার মাঠের অভাব অনিবার্য বাস্তবতা নয়; বরং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তা অতিক্রম করা সম্ভব। আর সেই প্রচেষ্টাই পারে তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ ধারায় ধরে রাখতে।