বুলিং নিয়ে তুমি কতটা সচেতন

· Prothom Alo

কয়েক দিন আগের কথা। আমার বন্ধু লিমার সঙ্গে দেখা। দেখা হতেই বলল, ‘তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে।’ ওর মুখটা ভার। চেহারা দেখেই বুঝলাম, কিছু একটা হয়েছে। সবার থেকে একটু দূরে গিয়ে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে। কথা শুরু করার আগেই ও কেঁদে ফেলল।

Visit turconews.click for more information.

কান্নার ফাঁকে ফাঁকে যা বুঝলাম, ফেসবুকে নিজের একটি ছবি আপলোড করেছিল লিমা। ছবিটি পোস্ট করার পর কয়েকজন দল বেঁধে বাজে মন্তব্য করতে শুরু করে। প্রথমে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও পরে বাধ্য হয়ে ছবিটি মুছে দেয়। কিন্তু ছবি মুছে ফেললেও কষ্টটা আর মুছে যায়নি। অপমান আর অন্যায়ের শিকার হয়ে ও মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছে।

এ ধরনের ঘটনাকেই বলা হয় সাইবার বুলিং। কীভাবে এর মোকাবিলা করতে হয়, তা লিমার জানা ছিল না। নিজেরই যেন কোনো ভুল হয়েছে, এমন ভাবতে শুরু করেছিল সে। ধীরে ধীরে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারই বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

আচ্ছা, তুমি কি বুলিং সম্পর্কে সচেতন? লিমার মতো পরিস্থিতিতে পড়লে কী করবে? লিমাকে যেসব কথা বলেছিলাম, সেগুলো তোমাকেও জানিয়ে রাখি। হয়তো কোনো একদিন তোমার বা তোমার বন্ধুর কাজে লাগবে।

কম্পিউটারে না লিখে হাতে লিখলে কেন বেশি দিন পড়া মনে থাকে

বুলিং এখন একটি বৈশ্বিক সামাজিক সমস্যা। সারা বিশ্বেই এর সবচেয়ে বড় শিকার শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা। আমাদের দেশেও দিন দিন এই সমস্যা বাড়ছে। কেমব্রিজ ডিকশনারি অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে ভয় দেখানো, অপমান করা, কষ্ট দেওয়া বা জোর করে এমন কিছু করতে বাধ্য করা, যা সে করতে চায় না—এসব আচরণই বুলিং। যে ব্যক্তি এমন আচরণ করে, তাকে বলা হয় বুলি।

বুলিংয়ের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত দুটি হলো স্কুল বুলিং ও সাইবার বুলিং।

স্কুল বুলিং বলতে বোঝায়, স্কুলে এক বা একদল শিক্ষার্থী যখন নিজেদের শক্তি বা প্রভাব দেখিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কোনো শিক্ষার্থীকে বারবার উত্ত্যক্ত করে, ভয় দেখায়, অপমান করে বা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। অনেক শিক্ষার্থী বুলিংয়ের কারণে স্কুলে যেতে ভয় পায়, পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কেউ কেউ স্কুল ছাড়তেও বাধ্য হয়। এমনকি চরম মানসিক চাপে পড়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।

স্কুলে বুলিং হলে শিক্ষকের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনো সময় স্কুল বুলিংয়ের শিকার হয়। সংখ্যাটি সত্যিই উদ্বেগজনক।

তাই শুধু বুলিংয়ের শিকার ব্যক্তির নয়, আমাদের সবারই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। মনোবিজ্ঞানীরা অনেক সময় ছোটখাটো উসকানিমূলক আচরণকে গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে যেতে বা ক্ষমা করে দিতে বলেন। তবে যখন বুলিং নিয়মিত ঘটে বা কারও নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন অবশ্যই এর প্রতিবাদ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে হবে। যেখানে বুলিং হবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।

চীনে বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ৯০০ বিষধর সাপ

এবার আসা যাক সাইবার বুলিংয়ের কথায়। ডিজিটাল প্রযুক্তি, যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ, অনলাইন গেম বা ই-মেইল ব্যবহার করে কাউকে অপমান, হুমকি, হয়রানি বা বিব্রত করার নামই সাইবার বুলিং। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে এ ধরনের হয়রানিও।

অনেকেই ভুল করে মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে কটু কথা বলা, অপমান করা বা ব্যক্তিজীবন নিয়ে মন্তব্য করা নাকি প্রতিবাদের অংশ। কিন্তু এটি মোটেও প্রতিবাদ নয়। ধরো, কেউ নিজের পছন্দের পোশাক পরে একটি ছবি পোস্ট করল। সেখানে গিয়ে কেউ লিখল, ‘এই পোশাক কেন পরেছ? অমুক পোশাক পরা উচিত ছিল।’ এমন মন্তব্য কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়; বরং বুলিংয়েরই একটি রূপ।

অবশ্যই একজন ব্যক্তি, সে সাধারণ মানুষ হোক বা কোনো সেলিব্রিটি, তার কাজের সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু সমালোচনা আর অপমান এক জিনিস নয়। কাউকে গালিগালাজ করা, হেয় করা বা ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিবাদের ভাষা হতে হবে শালীন, যুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বশীল।

বুলিং শিশুর মানসিক স্থিতিশীলতা ও আত্মবিশ্বাসকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে

দুঃখের বিষয়, অনেক মানুষ সাইবার বুলিং দেখেও চুপ করে থাকেন। অথচ নীরবতা অনেক সময় বুলিংকে আরও উৎসাহিত করে। যদি তুমি নিজে বা তোমার পরিচিত কেউ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়, তাহলে বিষয়টি লুকিয়ে না রেখে মা–বাবা, শিক্ষক বা বিশ্বস্ত কোনো বড় মানুষের সঙ্গে কথা বলো। প্রয়োজনে প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ (রিপোর্ট) করো, প্রমাণ হিসেবে স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করো এবং প্রয়োজন হলে আইনি সহায়তা নাও। বাংলাদেশেও এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমরা যদি নিজেরা কাউকে বুলিং না করি এবং অন্য কেউ বুলিং করলে তার প্রতিবাদ করি, তাহলে এই সমস্যাকে অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, একটি কটু মন্তব্যও কারও মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। তাই অনলাইন বা অফলাইন—সব জায়গাতেই আমাদের আচরণ হোক সহানুভূতিশীল, দায়িত্বশীল এবং সম্মানজনক।

লজ্জা পেলে গাল লাল হয়ে যায় কেন

Read full story at source