উন্নয়ন-বর্ণবাদের চাদর সরিয়ে ‘বাদাবনের বিজ্ঞান’
· Prothom Alo

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হলেও এই বন নিয়ে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শনগত অবস্থান অস্পষ্ট। বেশির ভাগ গবেষণা ও প্রকল্প সুন্দরবনকে দেখেছে ঔপনিবেশিক আয়নায়। বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস উপলক্ষে লিখেছেন পাভেল পার্থ
আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশের বনের বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য। পাতাঝরা, জলাবন, কাশবন, পাহাড়ি বন, বৃষ্টিবন, গ্রামীণ বন, পাড়াবন, উপকূল বন কিংবা ম্যানগ্রোভ—কী নেই এ বদ্বীপে? উপকূলের খণ্ডবিখণ্ড ক্ষয়িষ্ণু কিছু টুকরো আর সৃজিত ম্যানগ্রোভ থাকলেও মূলধারায় বেশি আলোচিত ‘সুন্দরবন’।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
সুন্দরবনসহ দেশের প্রতিটি ম্যানগ্রোভ বন বিপুল কার্বন শোষণ করে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙনের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে দাঁড়ায়। বহু স্থলজ ও জলজ প্রাণপ্রজাতির আবাস ও প্রজননস্থল। উপকূলের ১০ লাখ মানুষের জীবন–জীবিকা এই বনের ওপর নির্ভরশীল। বাংলা বাঘ, ইরাবতী ডলফিন, শ্বাসমূলীয় বৃক্ষ, বহু পাখি ও কুমিরের বিচরণস্থল।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হলেও এই বন নিয়ে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শনগত অবস্থান অস্পষ্ট। বেশির ভাগ গবেষণা ও প্রকল্প সুন্দরবনকে দেখেছে ঔপনিবেশিক আয়নায়। এক খণ্ডিত বিচ্ছিন্ন বন্য প্রাণীর বাস্তুতন্ত্র হিসেবে। অন্যায়ভাবে ম্যানগ্রোভ ইতিহাসের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নির্দয় রক্তপাত ও নিখোঁজের খতিয়ান। নয়া উদারবাদী ব্যবস্থা ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলগুলোকে কাঠামোগতভাবে খুন করে চলেছে।
চকরিয়া সুন্দরবনের টেকসই পুনর্জাগরণ যেভাবে সম্ভবনোয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বহু এলাকায় এখনো কিছু খণ্ডবিখণ্ড ম্যানগ্রোভ বনের চিহ্ন আছে। গড়ে উঠেছে সৃজিত কিছু ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র।
সুন্দরবনসহ দেশের সব ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের লোকায়ত জ্ঞান, লোকবিজ্ঞান, বনজীবীদের সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রের দার্শনিক ও উৎপাদনমূলক প্রতিবেশগত সম্পর্ককে আমরা বুঝতে চাইনি।
উন্নয়ন-বর্ণবাদের চাদর সরিয়ে সুন্দরবনসহ দেশের ম্যানগ্রোভ বনগুলোকে পাঠ করা জরুরি। বনজীবীদের লোকায়ত বিজ্ঞান ও দর্শন এ ক্ষেত্রে জাতীয় ম্যানগ্রোভ নীতি ব্যবস্থাপনার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
শের ম্যানগ্রোভ জীবনব্যবস্থা নিয়ে আমাদের জানা–বোঝা প্রবলভাবে পরস্পরবিরোধী এবং খণ্ডিত। কারণ, বনজীবীদের বিচ্ছিন্ন ও আড়াল করে আমরা জোয়ার–ভাটার বনভূমির ব্যাকরণ বুঝতে চেয়েছি। সুন্দরবনসহ দেশের সব ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের লোকায়ত জ্ঞান, লোকবিজ্ঞান, বনজীবীদের সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রের দার্শনিক ও উৎপাদনমূলক প্রতিবেশগত সম্পর্ককে আমরা বুঝতে চাইনি।
চার বিভাগে বিন্যস্ত সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কাজের অভিজ্ঞতা থেকে দাঁড় করাই ‘বাদাবনের বিজ্ঞান’, প্রতিচিন্তা জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। ২০১০ সালে এই গবেষণার কিছু অংশ উপস্থাপনকালে বন বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা কপাল কুঁচকেছিলেন। মানুষ খায় এমন কোনো গাছের পাতা নেই সুন্দরবনে, এই বনের কিছু ফল কাঁচা খাওয়া গেলেও পাকলে খাওয়া যায় না, এক ফোঁটা মধুর জন্য একটি মৌমাছি ৮০টি ফুলে যায়—এসব তথ্য অনেকের প্রথম জানা হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর বন বিভাগ সুন্দরবন থেকে গোলপাতা আহরণ নিষিদ্ধ করে। প্রথাগতভাবে এই পাতা আহরণ না করলে শুকিয়ে মারা যায়। বনজীবীদের নিয়ে বহু দেনদরবারের পর বন বিভাগ বিজ্ঞানটি বুঝতে পেরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
সুন্দরবনকে ‘পোড়ামহল’ বানাচ্ছে কারানৃবিজ্ঞানী আন্নু জালাইসের ফরেস্ট অব টাইগারস: পিপল, পলিটিকস অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ইন দ্য সুন্দরবনস বইটি প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। বাঘ ও বনের সঙ্গে বনজীবীদের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে আলোচনার ভেতর দিয়ে লেখক সুন্দরবনের এক বিঔপনিবেশিক বয়ান হাজির করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বনজীবী ও বননির্ভর জনগণের চোখে ম্যানগ্রোভ বন দেখার তৎপরতা রাষ্ট্র এখনো শুরু করেনি। তাই দেশের ম্যানগ্রোভ বনগুলো ক্ষতবিক্ষত ও নিরন্তর নিখোঁজ হচ্ছে। একটা সময় ম্যানগ্রোভ বনকে ‘বাণিজ্যিক চিংড়িঘেরের’ জমি হিসেবে দেখা হয়েছে, সম্প্রতি হট্টগোল তোলা হচ্ছে ‘কার্বন শোষণাগার’ হিসেবে।
২০১৫ সালে ইউনেসকোর সাধারণ সম্মেলনে ২৬ জুলাইকে বিশ্ব ম্যানগ্রোভ দিবস ঘোষণা করা হয়। ২০১৬ থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। সুন্দরবনসহ দেশের ম্যানগ্রোভ বনের ‘লাশগুলো’কে নয়া উদারবাদী উন্নয়ন-বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে হাজির করার পাশাপাশি লোকায়ত জ্ঞাননির্ভর সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা ও বন-দর্শনকে বিঔপনিবেশিক নীতি হিসেবে প্রস্তাব করছি চলতি আলাপে।
মাতামুহুরী নদী ও মহেশখালী চ্যানেলের জোয়ার–ভাটায় গড়ে ওঠা এই প্রাচীন বনটিকে নির্দয়ভাবে খুন করা হয়েছে। ফাসিয়াখালীতে একটিমাত্র সুন্দরীগাছ রাজসাক্ষী হয়ে টিকে আছে।‘খুন’ হওয়া চকরিয়া সুন্দরবন
সুন্দরবনের পর কক্সবাজারের চকরিয়ায় ছিল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। গোলপাতা, কেওড়া, ধুন্দল, বাইন, গরান, গেওয়া, হারগোজা, সুন্দরী, টাইগারফার্নের বিস্তার ছিল চারধারে। প্রায় ২১ হাজার একরজুড়ে বিস্তৃত এই বনকে ১৯০৩ সালে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়েছিল। মাতামুহুরী নদী ও মহেশখালী চ্যানেলের জোয়ার–ভাটায় গড়ে ওঠা এই প্রাচীন বনটিকে নির্দয়ভাবে খুন করা হয়েছে। ফাসিয়াখালীতে একটিমাত্র সুন্দরীগাছ রাজসাক্ষী হয়ে টিকে আছে।
১৯৭৭ সালের দিকে কৃষি মন্ত্রণালয় এই বন বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষের জন্য ইজারা দেওয়া শুরু করে। পরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং বিশ্বব্যাংক চিংড়ি চাষে বিনিয়োগ শুরু করে। দিনে-দুপুরে প্রাচীন বনটির ওপর উন্নয়নের জুলুম শুরু হয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং বিশ্বব্যাংক ১৯৮৬ সালে মাছ চাষের আরেক বিশাল প্রকল্প শুরু করে। দশাসই বাণিজ্যিক মাছের খামারের মুনাফার তলায় নিখোঁজ হয়ে যায় এক প্রাচীন ম্যানগ্রোভ। এই বন হত্যার কারণে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড়ে এক লাখ মানুষ নিহত হয়। কারণ, আর কোনো প্রাকৃতিক ঢাল ছিল না চারধারে।
সোনাদিয়া দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন
কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বনকেও হত্যা করা হয়েছে বাণিজ্যিক মাছ চাষের ছুতায়। ধ্বংস হয়েছে মহিষের চারণভূমিগুলোও। ২০১৬ সালে সোনাদিয়া দ্বীপের প্রায় ৯ হাজার ৪৬৬ একর জমি কক্সবাজার জেলা প্রশাসক বেজার কাছে হস্তান্তর করেন। ২০১৮ সালে আরও প্রায় ১২ হাজার একর। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পর্যটন এলাকা গড়ে তোলার জন্য জমি হস্তান্তর হলেও বাণিজ্যিক চিংড়িঘেরই প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। সোনাদিয়ার প্রায় ৮ হাজার একর বনকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
সিডরের পর সুন্দরবন থেকে ফিরে একটা লেখা লিখেছিলাম: ‘বীর সুন্দরবন: জীবন দিয়ে বাঁচাল স্বদেশ’। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে আম্পান ঘূর্ণিঝড়ের পর আবার লিখি, সুন্দরবন আবারও জীবন দিয়ে বাঁচাল স্বদেশ। যে বনের ওপর আমাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে, সেই বনকে আমরা নিস্তার দিইনি কখনো। উন্নয়ন-বর্ণবাদের চাদর সরিয়ে সুন্দরবনসহ দেশের ম্যানগ্রোভ বনগুলোকে পাঠ করা জরুরি। বনজীবীদের লোকায়ত বিজ্ঞান ও দর্শন এ ক্ষেত্রে জাতীয় ম্যানগ্রোভ নীতি ব্যবস্থাপনার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
কুকরিমুকরি, ল্যুমফ্রু বা ঢাল চর ম্যানগ্রোভ
নোয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বহু এলাকায় এখনো কিছু খণ্ডবিখণ্ড ম্যানগ্রোভ বনের চিহ্ন আছে। গড়ে উঠেছে সৃজিত কিছু ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র। ভোলার চরফ্যাশনের চর কুকরিমুকরি ম্যানগ্রোভ অভয়ারণ্য হরিণের এক বৃহৎ বিচরণস্থল। মোহাম্মদ জসিম উদ্দীন ও মো. আবদুল্লাহর এক যৌথ গবেষণায় (২০১৬) চর কুকরিমুকরিতে ২৭৭ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করেছেন। ২০১০ সালে এই বনের ১৫ হাজার গাছ কেটে বাবুগঞ্জ থেকে পাতলিয়ার বুড়াগৌরাঙ্গ পর্যন্ত পাকা সড়ক নির্মাণ করতে চেয়েছিল ইউনিয়ন পরিষদ।
একইভাবে ঢালচরের সৃজিত ম্যানগ্রোভ বনও স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ে ছিন্নভিন্ন হয়েছে বহুবার। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত লাগোয়া ল্যুমফ্রুর বনটি গড়ে ওঠে ল্যুমফ্রু রাখাইনের নামে। ক্ষয়িষ্ণু বনটির নাম পাল্টে বর্তমানে করা হয়েছে ‘লেবুর বন’। বাণিজ্যিক পর্যটনের কারণে নতুন ঝুঁকির সামনে দাঁড়িয়েছে এই টুকরো বন।
২৪ বছরে প্রায় ২৫ বার আগুন লেগেছে সুন্দরবনে।সুন্দরবনে বারবার আগুন আর জাহাজডুবি কেন?
২০০২ থেকে ২০২৪ গত ২৪ বছরে প্রায় ২৫ বার আগুন লেগেছে সুন্দরবনে। প্রায় ৭২ একর ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র অঙ্গার হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে বন বিভাগ বনের সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের হিসাব করে না। শুধু বৃক্ষ ও বড় প্রাণীদের হিসাব করে। অথচ অগ্নিকাণ্ডে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বনতল। বিপর্যস্ত হয় খাদ্যশৃঙ্খল এবং আঘাত লাগে সামগ্রিক খাদ্যজালে। বিগত অগ্নিকাণ্ডে দেখা দেখা গেছে হারগোজা, ধানচি, টাইগারফার্ন, সিংড়া, বলা, কালিলতা, গোলপাতা, কেয়া, হেন্তাল, আঙ্গুরলতা, বাওয়ালিলতা পুড়েছে বিস্তর।
১৯৮৮ সালে জাহাজ ডুবে উচ্চ মাত্রার সালফারযুক্ত তেলে ছড়িয়ে যায় সুন্দরবনে। ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ‘এমটি সাউদার্ন স্টার-৭’ নামের এক কার্গোবোট ডুবে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস তেল ছড়িয়ে পড়ে শ্যালা নদীসহ চাঁদপাই রেঞ্জের প্রায় ২০টি খাল, দুটি ভাড়ানি ও বনস্তরে। অগ্নিকাণ্ড ও জাহাজডুবির মাধ্যমে দূষণ ও দখলের কোনো উত্তর নেই।
অস্বীকৃত ‘বাদাবনের বিজ্ঞান’
ম্যানগ্রোভ বনের লোকায়তবিদ্যাকে অস্বীকার করে বারবার এই বনের ওপর কখনো মার্কিন শেল কোম্পানির জরিপ বা রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপ প্রকল্পের মতো বহিরাগত খবরদারি চাপানো হয়েছে। ক্ষমতাকাঠামোর একতরফা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো তাই সুন্দরবনের বনজীবীদের লোকবিজ্ঞানকে ‘অপর’ করে দেয় এবং এক উন্নয়ন-বর্ণবাদ প্রতিষ্ঠার জুলুম করে।
বনজীবীদের কাছে সুন্দরবন বা ম্যানগ্রোভ হলো ‘বাদাবন’। এই বনের রক্ষাকবচ মা বোনবিবি। যাকে মূলধারায় ‘বনবিবি’ বানানো হয়েছে (তিনি বনের নয়, তিনি বোন)। সুন্দরবন–সম্পর্কিত প্রাচীন দলিল হলো বোনবিবির পুঁথিগুলো। ‘বোনবিবির কেরামতি অর্থাৎ বোনবিবি জহুরানামা ও ধেনামৌলে ও দুঃখের পালা’ পুঁথিতে আছে, বাদাবন এক জেয়ার–ভাটার জঙ্গল এলাকা। এখানে দক্ষিণরায় বাঘের বেশে থাকে। এখানে মধু-মোম হয়, তাই কাটতে মৌয়াল-বাওয়ালিরা চৈত্র মাসে বনে প্রবেশ করেন।
সুন্দরবনের বনজীবীদের কাছে বন এক পবিত্র সত্তা এবং জীবনের আশ্রয়স্থল। বনে থাকার সময় সরাসরি প্রস্রাব করা যায় না মাটিতে, একটা পাতার ওপর করতে হয়। এই বন দিনে চারবার রূপ বদলায়। বাদাবনের সবচেয়ে দূরতম স্থানে যেতে হয় আঠারভাটির পথ পাড়ি দিয়ে। এ অঞ্চলের অধিকাংশ স্থাননাম মাছের নামে বাঘের নামে কোনো স্থাননাম নেই। পারশেখালী, কৈখালী, দাঁতিনাখালী, ভেটখালী, ভেটকীখালী, আমাদি, চিংড়াখালী, জোংড়াখালী।
ম্যানগ্রোভ বন থেকে বাঘ, বনজীবী, বোনবিবি, মৌমাছি, বাইন, মাছ, পাখি কাউকে আলাদা করা যাবে না। অথচ বহু প্রকল্প সুন্দরবনের গ্রামে গিয়ে বনজীবীদের জোর করে ‘বিকল্প কর্মসংস্থানের’ মহড়া দিয়েছিল। যারা কোনো দিন বন ধ্বংসের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কারণ এবং বৈশ্বিক অস্ত্র এবং কার্বন–বাণিজ্যকে প্রশ্ন করেনি। কেওড়ার ফলন বেশি হওয়া মানে বনে ফুলের পরাগায়ন ভালো হয়েছে বোঝা যায়। পরাগায়ন ভালো হয়েছে মানে বৃষ্টিপাত ভালো হয়েছে এবং মৌমাছিদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ আছে। মৌমাছিরা নিরাপদে আছে মানে মধু-মোমের পরিমাণও ভালো হয়েছে। মৌয়ালরা যদি ভালোভাবে মধু আহরণ করেন এবং জেলেরা মাছ ধরতে পারেন, তবে বন বিভাগও ভালো রাজস্ব পায়। বনজীবী পরিবারওগুলোও ভালো থাকে। মাছ, ধান, মৌমাছি, মানুষ, বন বিভাগ সব নিয়ে এক জটিল সংসার বাদাবন।
বাদাবনে গাছের পাতা থেকে মাছ, মাছ থেকে মাটি, মাটি থেকে মানুষ জন্ম নেয়। পুরো বাদাবন যেন পাতার খেলা। ঝরাপাতা, নয়া পাতা, মরা পাতা। রংবেরঙের নানা পাতা। বাদাবনের পাতা দেখেই বলে যায় বনের শরীর কেমন আছে। কি গাছে থাকা পাতা, কি ঝরা পাতা। পাতার বর্ণ ও গন্ধ জানান দেয় বাদাবনের সুস্বাস্থ্য। জোয়ার-ভাটায় ঝরা পাতারা এক খাল থেকে আরেক খালে, এক চর থেকে আরেক চলে জমা হয়।
কাদামাটিতে নানা বয়সী নানা জাতের পাতা জমে জমে স্তূপ তৈরি হয়। কাদাজলে জমে জমে এই স্তূপ রং বদলায়। একসময় ঝুরঝুরে নরম কালচে স্তরীভূত মণ্ড হয়ে ওঠে। ঝরা পাতার এ অবস্থাকে ‘মেথানি’ বলে। এই মেথানিতেই চিংড়ির জন্ম হয়। মেথানি হলো বাদাবনের চিংড়ির আঁতুড়ঘর। ঝরা পাতা থেকে যেমন মেথানি, ঠিক তেমনি জঙ্গলে নতুন পাতা দেখা দিলেই মধু মৌসুমের সূচনা হয়। ম্যানগ্রোভ বনের লোকায়ত বিজ্ঞান ও জীবনকে বুঝতে হবে। খবরদারি ও অপরায়ণের মাস্তানি বাতিল করে ম্যানগ্রোভ বনের পাশে দায় ও দরদ নিয়েই দাঁড়াতে হবে।
উন্নয়ন-বর্ণবাদের চাদর সরিয়ে
বিশেষজ্ঞরা সুন্দরবনের ‘বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্ব’ আবিষ্কার করেছেন। যদিও বনজীবীরা এটি বিশ্বাস করেন না। বাদাবনে বাঘের আক্রমণে মানুষ মারা গেলে কখনোই বলা হয় না বাঘে মেরেছে বা বাঘে খেয়েছে। বলা হয় মানুষটি বাদায় পড়েছে। বনজীবীরা যেমন বাঘের হামলায় নিহত হয়েছেন, খাবারের অভাবে গ্রামে আসা বাঘও অনেক সময় মারা পড়েছে। কারণ, রাষ্ট্র অসহায় বাঘগুলোকে বনে ফিরিয়ে নেয়নি।
সিডরের পর সুন্দরবন থেকে ফিরে একটা লেখা লিখেছিলাম: ‘বীর সুন্দরবন: জীবন দিয়ে বাঁচাল স্বদেশ’। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে আম্পান ঘূর্ণিঝড়ের পর আবার লিখি, সুন্দরবন আবারও জীবন দিয়ে বাঁচাল স্বদেশ। যে বনের ওপর আমাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে, সেই বনকে আমরা নিস্তার দিইনি কখনো। উন্নয়ন-বর্ণবাদের চাদর সরিয়ে সুন্দরবনসহ দেশের ম্যানগ্রোভ বনগুলোকে পাঠ করা জরুরি। বনজীবীদের লোকায়ত বিজ্ঞান ও দর্শন এ ক্ষেত্রে জাতীয় ম্যানগ্রোভ নীতি ব্যবস্থাপনার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।
● পাভেল পার্থ লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী
* মতামত লেখকের নিজস্ব