প্রযুক্তির ফাঁদে প্রতারণা ও মানব পাচার: করণীয় কী
· Prothom Alo
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইজারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহায়তায় ইউএনওডিসি, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে ‘প্রযুক্তির ফাঁদে প্রতারণা ও মানব পাচার: করণীয় কী?’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২২ জুলাই ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
অংশগ্রহণকারী:
আলি আকবর খান, অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ পুলিশ;
Visit bettingx.club for more information.
রেবেকা খান, যুগ্ম সচিব (রাজনৈতিক-১ অধিশাখা), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়;
তানভীর হাসান জোহা, প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল;
ড. বি এম মইনুল হোসেন, পরিচালক ও অধ্যাপক, তথ্য ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়;
সালমা আলী, চেয়ারপারসন, অ্যাটসেক দক্ষিণ এশিয়া ও উপদেষ্টা, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি;
নুরুল কাদের, প্রোগ্রাম ম্যানেজার (অভিবাসন), মানবসম্পদ উন্নয়ন সেক্টর, বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল;
দীপ্তা রক্ষিত, কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ও প্রকল্প পরিচালক, আশ্বাস, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ;
শরিফুল ইসলাম হাসান, সহযোগী পরিচালক, মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম, ব্র্যাক
তাসনীম বিনতে করিম, ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর, ইউএনওডিসি, দক্ষিণ এশিয়া;
শাকিরুল ইসলাম, চেয়ারপারসন, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম, ওকাপ;
মাহমুদুল হাসান, লিগ্যাল কোঅর্ডিনেটর, রামরু;
মো. আল-আমিন নয়ন, সভাপতি, অনির্বাণ সারভাইভার্স ভয়েস;
মন্নান ছৈয়াল, কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশি;
নাজনীন আক্তার, মালয়েশিয়া ফেরত বাংলাদেশি;
সঞ্চালনা: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
আলি আকবর খান, অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ পুলিশ
মানব পাচারের তদন্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আন্তদেশীয় তথ্য সংগ্রহ, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থ লেনদেন শনাক্ত করা। ক্রিপ্টোকারেন্সি, হুন্ডি ও অনলাইন লেনদেনের তদন্তে আধুনিক সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। একই সঙ্গে তদন্তকারীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক তথ্য আদান–প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কম্বোডিয়ার সাইবার প্রতারণাকেন্দ্র, লিবিয়া হয়ে ইতালিতে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ পথ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রলোভন—সবই এখন আন্তদেশীয় অপরাধী চক্রের অংশ। অনেকেই পর্যটক ভিসায় গিয়ে পরে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, আবার কেউ কেউ ভুক্তভোগী থেকে পরে পাচারকারীও হয়ে যাচ্ছেন। এসব অপরাধের মূল চালিকা শক্তি দেশের বাইরে থাকায় শুধু দেশের ভেতরে ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
বিদেশে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের অনেকেই দেশে ফিরে আপস করে ফেলেন বা সাক্ষ্য দিতে চান না। এতে বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শুধু তদন্তকারী সংস্থার নয়, কূটনৈতিক মিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আমার বিশ্বাস, নিয়মিত অভিবাসনকে আরও শক্তিশালী করা, অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রচার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাচারকারীদের অপপ্রচারের জবাব দিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আস্থাভিত্তিক সহযোগিতা কার্যকর ফলাফল নিশ্চিত করবে।
রেবেকা খান, যুগ্ম সচিব (রাজনৈতিক-১ অধিশাখা), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
মানব পাচারের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে; প্রযুক্তির ব্যবহার এ অপরাধকে আরও জটিল করেছে। তাই সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। ২০২৬ সালের নতুন আইনে মানব পাচারের পাশাপাশি অভিবাসী পাচার এবং অনলাইনে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতারণাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় প্রতারণা প্রতিরোধ।
বিদেশে যাওয়ার পর অনেক বাংলাদেশি প্রতারণা, নির্যাতন এবং জোর করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (এনপিএ) ২০২৬–৩০ প্রণয়নে কাজ করছে, যাতে ভুক্তভোগীরা সমন্বিতভাবে সুরক্ষা, আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সেবা পান। একই সঙ্গে অভিবাসন, টেলিযোগাযোগ ও প্রবাসীকল্যাণ–সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করা হচ্ছে। বিমানবন্দরে প্যাসেঞ্জার নেম রেকর্ড এবং অ্যাডভান্স প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন সিস্টেমসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভুয়া ভ্রমণ নথি শনাক্তকরণ, তদন্তকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তসংস্থার সমন্বয় এবং দ্রুত তথ্য বিনিময় নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সাইবার প্রতারণাকেন্দ্র দমনে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সহযোগিতাও আরও জোরদার করা হয়েছে।
মানব পাচারে জড়িত ব্যক্তিরা সরকারি কর্মকর্তা হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই অপরাধ মোকাবিলায় সবার অভিজ্ঞতা, তথ্য বিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত উদ্যোগ আমাদের সক্ষমতা আরও বাড়াবে। এতে ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ও টেকসই সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।
তানভীর হাসান জোহা, প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে পাচারের শিকার ব্যক্তিকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। তবে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভুক্তভোগীকে ফিরিয়ে আনা এবং পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব। তাই মানব পাচার মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ের পুলিশকে আরও কার্যকর ক্ষমতা, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
শুধু কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়ে এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলা সম্ভব নয়। থানার পুলিশ, উপপরিদর্শক ও কনস্টেবলই স্থানীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি তথ্য সংগ্রহ করেন। তাঁদের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও তদন্ত–দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং জাতীয় মানব পাচার গোয়েন্দা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা দরকার।
আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে দেখেছি, প্রযুক্তির চেয়ে সমন্বিত নীতি, দ্রুত তথ্য আদান–প্রদান ও কার্যকর তদন্তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
আমাদের দেশেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত সিদ্ধান্ত, কার্যকর পদক্ষেপ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
আমি মনে করি, পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে বারবার ব্যবহারের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদের পেশাদারত্বের সঙ্গে পেশাগতভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যার সমাধান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষমতায়ন ছাড়া মানব পাচার, সাইবার প্রতারণাসহ সংঘটিত অপরাধ কার্যকরভাবে দমন করা সম্ভব হবে না।
ড. বি এম মইনুল হোসেন, অধ্যাপক ও পরিচালক, তথ্য ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মানব পাচারে দালালের সম্পৃক্ততা এখনো রয়েছে, তবে প্রযুক্তির ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিও, ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার, পরিচয় গোপনকারী প্রযুক্তি ও নিরাপদ বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ ব্যবহার করে পাচারকারীরা আরও সংগঠিতভাবে কাজ করছে। এমনকি অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমও কৃত্রিম ভিডিও শনাক্ত করতে বিভ্রান্ত হয়। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতারণা চিহ্নিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার মানব পাচারকে আরও জটিল আন্তসীমান্ত অপরাধে পরিণত করেছে। শুধু প্রচলিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। যে এলাকাগুলো থেকে মানুষ বেশি পাচারের শিকার হচ্ছে, সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক প্রচার চালাতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ, উন্মুক্ত উৎসের তথ্য ব্যবহার এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রচলিত তদন্তের বাইরে গিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জন করতে হবে। অন্যথা প্রযুক্তিসক্ষম অপরাধী চক্রের সঙ্গে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। মেটাসহ আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়; এর জন্য ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের বিদ্যমান তথ্য ও নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া গেলে প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
সালমা আলী, সালমা আলী, চেয়ারপারসন, অ্যাটসেক দক্ষিণ এশিয়া ও উপদেষ্টা, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি
আইন, নীতি, ভুক্তভোগী সুরক্ষা, বিচারপ্রক্রিয়াসহ অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ভুক্তভোগী সুরক্ষার বিধান, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থাকে অনিরাপদ অভিবাসন ও মানব পাচার মোকাবিলায় প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনিরাপদ অভিবাসন ও মানব পাচার বন্ধ হচ্ছে না। প্রযুক্তিনির্ভর পাচারের ঘটনায় আন্তদেশীয় সহযোগিতা, দক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক মামলায় বিচার দীর্ঘ হয়, আবার গোপনীয়তার প্রশ্নে অনেক ভুক্তভোগী শেষ পর্যন্ত মামলা চালিয়ে যেতে চান না। ফলে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনেক উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে স্থলবন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রপথ দিয়ে অভিবাসনের নামে মানব পাচার এখনো চলছে।
আমি মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, বিমানবন্দরেই কয়েক মিনিটের পর্যবেক্ষণে সন্দেহজনক যাত্রী শনাক্ত করা সম্ভব। সম্প্রতি নেপালগামী এক তরুণীকে সন্দেহ হওয়ায় উদ্যোগ নিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ সদিচ্ছা ও কার্যকর নজরদারি থাকলে অনেক পাচারই প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু সীমান্ত, বিমানবন্দর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহির ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে।
আমার মতে, সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যকর সমন্বয়, আপসহীন অবস্থান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দক্ষ তদন্তকারী, সরকারি কৌঁসুলি ও বিচারক গড়ে তোলা, পুলিশকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও তদারকির আওতায় আনা এবং সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারীদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। তবেই দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে এবং ভুক্তভোগীরা বারবার নির্যাতনের শিকার হবেন না।
নুরুল কাদের, প্রোগ্রাম ম্যানেজার (অভিবাসন), মানবসম্পদ উন্নয়ন সেক্টর, বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল
মানব পাচার, বিশেষ করে দ্রুত বিস্তারমান স্ক্যাম সেন্টারভিত্তিক পাচার এবং সাইবার প্রযুক্তিনির্ভর শোষণ, মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় প্রতিরোধ, সুরক্ষা, বিচার ও শক্তিশালী অংশীদারত্বের সমন্বয়ে একটি সামগ্রিক ও ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এর জন্য ঝুঁকিপ্রবণতার মূল কারণগুলো মোকাবিলা, নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের পথ সম্প্রসারণ, আন্তসীমান্ত সহযোগিতা জোরদার এবং ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের টেকসই পুনর্বাসন ও সমাজে পুনরেকত্রীকরণে কার্যকর সহায়তা দিতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আইনগত ও নীতিগত অগ্রগতিকে স্বাগত জানায়। নিরাপদ অভিবাসন, পুনর্বাসন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত কর্মসূচির মাধ্যমে এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করে। আমাদের বিশ্বাস, মানব পাচারের মতো জটিল ও আন্তদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় সরকার, আন্তর্জাতিক অংশীদার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচারব্যবস্থা, সুশীল সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের অধিকার, সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে পারস্পরিক আস্থা, তথ্য বিনিময়, কার্যকর সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
দীপ্তা রক্ষিত, কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ও প্রকল্প পরিচালক, আশ্বাস, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
কেউ জেনেশুনে মানব পাচারের শিকার হতে সম্মতি দেন না। মানুষ ভালো চাকরি, নিরাপদ জীবন ও ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ঝুঁকি নেন, কিন্তু পাচারের শিকার হওয়ার জন্য নয়। ২০ বছর ধরে এ বিষয়ে কাজ করেও আজ নিজেকে ব্যর্থ মনে হয়। বাংলাদেশ সরকার মানব পাচার প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন, জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়ন করলেও এগুলোর বাস্তবায়নে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের তথ্য বলছে, ৮০ শতাংশই বৈধ অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় বিদেশে গেছেন। তাহলে এই প্রতারণা কীভাবে ঘটছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
এখন মানব পাচার প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধে পরিণত হয়েছে। তাই পুরোনো পদ্ধতিতে সচেতনতা বাড়িয়ে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ মিথ্যা প্রলোভনের শিকার হচ্ছেন, সেখানেই পাল্টা প্রচারণা চালাতে হবে। শুধু উঠান বৈঠক, স্কুল–কলেজে কর্মসূচি বা ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে বিকাশ, নগদ, হুন্ডি, ক্রিপ্টোকারেন্সিসহ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমগুলোর কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। মানব পাচারের অর্থের প্রবাহও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।
মানব পাচার প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। বাস্তব ঘটনার ভিত্তিতে মানুষকে সচেতন করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি সব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার মোকাবিলায় কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব।
শরিফুল ইসলাম হাসান, সহযোগী পরিচালক, মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম, ব্র্যাক
অনিয়মিত অভিবাসনের কারণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর শীর্ষে। এভাবে যেতে গিয়ে অসংখ্য মানুষ লিবিয়ায় ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার, অসংখ্য মানুষ সাগরে প্রাণ হারাচ্ছে। এদিকে আবার বঙ্গোপসাগর দিয়ে অনেক বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছেন। গত এক সপ্তাহে প্রায় ৫০০ রোহিঙ্গার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এমনকি মালয়েশিয়ায় থাকা অনেককে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ ক্ষেত্রে পাচারকারীদের বড় হাতিয়ার। মানব পাচারের কৌশল দিন দিন আরও জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের ৮২ শতাংশ তরুণ সুযোগ পেলে দেশ ছাড়তে চান। মরিয়া হয়ে বিদেশে যেতে গিয়ে নানা বিপদে পড়ছেন। সাইবার স্ক্যামের শিকার অনেকে। শুধু জুন মাসেই কম্বোডিয়া থেকে ৫৮৩ জন এবং ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০ জন সাইবার প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। তাঁদের ৯৮ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি, ৮৮ শতাংশকে বন্দী করে রাখা হয়েছে, ৮৭ শতাংশের কাগজপত্র জাল ছিল, ৬৬ শতাংশ দালালের মাধ্যমে গেছেন, ৩৮ শতাংশ গুরুতর মানসিক আঘাত পেয়েছেন এবং ২৭ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বন্ধে সরকার নতুন আইন করেছে, জাতীয় কর্মপরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সচেতনতা বাড়ানো, সাইবার প্রতারণা–সম্পর্কিত আইনি সুরক্ষা জোরদার, অপরাধী চক্রকে বিচারের আওতায় আনা, দেশে কর্মসংস্থান তৈরি, বৈধভাবে বিদেশে পাঠানো এবং পাচার বন্ধে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। কারণ, এ ধরনের আন্তদেশীয় অপরাধ মোকাবিলা বাংলাদেশের পক্ষে একা করা কঠিন।
তাসনীম বিনতে করিম, ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর, ইউএনওডিসি, দক্ষিণ এশিয়া;
স্ক্যাম সেন্টারভিত্তিক মানব পাচার বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ও দ্রুত বিস্তৃত অপরাধপ্রবণতা। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকেরা ক্রমবর্ধমানভাবে এর শিকার হলেও দেশে এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার, গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণের ঘাটতি রয়েছে। ফলে প্রতারণামূলক নিয়োগের মাধ্যমে কতজন বাংলাদেশি পাচারের শিকার হচ্ছেন, দেশে ফিরে আসছেন, পুনর্বাসন ও বিচার পাচ্ছেন এবং এই অপরাধ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি কতটা—এসব বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক তথ্য কার্যকর নীতিনির্ধারণ, প্রতিরোধ এবং পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়নের জন্য অপরিহার্য।
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। বিশেষ করে সিআইডিসহ বিশেষায়িত সংস্থাগুলোর সক্ষমতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার মোকাবিলায় শুধু প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতি যথেষ্ট নয়; ক্রিপ্টোকারেন্সি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও উন্মুক্ত তথ্য বিশ্লেষণসহ আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক তদন্তসক্ষমতা গড়ে তোলার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
নতুন আইনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এর কার্যকর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিচারক, সরকারি কৌঁসুলি ও তদন্ত কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার এবং মাঠপর্যায়ের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতা সম্প্রসারণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে বৈধ অভিবাসনের পথ সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতে সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
শাকিরুল ইসলাম, চেয়ারপারসন, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম, ওকাপ
প্রযুক্তির প্রসঙ্গ থেকে আলোচনা শুরু হলেও আমি মূলত রাষ্ট্রের সমন্বয়হীনতার বিষয়টি তুলে ধরতে চাই। যখন রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় থেকে বলা হয়, অনেক অভিবাসী জেনে–বুঝেই ঝুঁকিপূর্ণ পথে যান, তখন সেই বার্তাই সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। অথচ আমরা শুধু অভিবাসীদের সচেতন করার কথা বলি, কিন্তু গ্রামের দালাল থেকে শুরু করে মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারি না। এটিই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। সম্প্রতি মাদারীপুরে এক মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসকও বলেছেন, পাচারকারীদের তিনি চেনেন, কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই। অথচ তাঁদের আইনের আওতায় আনতে পারলে সমাজে শক্ত বার্তা যেত। ২০১৯ সালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরে আসা এক নির্যাতিত নারীর মামলায় আমরা সহায়তা করেছিলাম।
দীর্ঘ তদন্তে মানব পাচারের উপাদান মিললেও ২০২৫ সালে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারক আদালতের বাইরে সমঝোতার প্রস্তাব দেন। ভুক্তভোগী স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, তিনি টাকা নয়, বিচার ও মর্যাদা চান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চার লাখ টাকার কিছু বেশি অর্থ দিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করা হয়। মানব পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে এমন দৃষ্টান্ত অত্যন্ত হতাশাজনক।
আমার বিশ্বাস, সমস্যার মূল জায়গা রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর সমন্বয়ের অভাব। বিএমইটির ছাড়পত্র দিয়েই কর্মীরা বিদেশে যাচ্ছেন, তাই সেই প্রক্রিয়ার দায়ও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। শুধু সভা-সেমিনারে সমন্বয়ের কথা বললে হবে না, সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে।
মাহমুদুল হাসান, লিগ্যাল কোঅর্ডিনেটর, রামরু
মানব পাচার প্রতিরোধে নতুন আইন হয়েছে। সেখানে অভিবাসন ও অবৈধভাবে মানুষ পাচারের বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, বিচারব্যবস্থাকে এখনো যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। একটি মানব পাচারের মামলা তদন্ত থেকে বিচারপর্যায়ে যেতে দুই–তিন বছর লেগে যায়। এ সময় অনেক ভুক্তভোগী মামলা চালিয়ে যেতে পারেন না। বিদেশে যেতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে নিঃস্ব হওয়ার পর দীর্ঘদিন মামলা চালানোর সামর্থ্যও তাঁদের থাকে না। আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে অনেকের এক দিনের আয়ও নষ্ট হয়। দ্রুত বিচারের জন্য মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলেও এখনো মামলা তদন্তে বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে।
ট্রাইব্যুনালের জন্য নির্ধারিত বা পৃথক কোনো তদন্ত সংস্থা নেই। ফলে সময়মতো তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে না, অনেক ক্ষেত্রে সঠিক তদন্তও হয় না। এতে মামলার মূল বিষয় উঠে আসে না এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আমরা বিচার নিশ্চিত করতে পারছি কি না। বিচার নিশ্চিত হলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে। আরও উদ্বেগের বিষয়, ঢাকার মানব পাচার ট্রাইব্যুনালে পাঁচ মাস ধরে কোনো বিচারক নেই। এমন সংবেদনশীল ট্রাইব্যুনালে বিচারক না থাকায় বিচারপ্রার্থীরা সময়মতো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মো. আল-আমিন নয়ন, সভাপতি, অনির্বাণ সারভাইভার্স ভয়েস,
মানব পাচার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, কূটনৈতিক ব্যর্থতাও এ সমস্যার একটি কারণ। এক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আরেক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। গত দেড় বছরে যে ২৮টি দেশে আমাদের দূতাবাস বা কনস্যুলেট নেই, সেখানে বিএমইটির মাধ্যমে ৫৬ হাজার বাংলাদেশি গেছেন। তাঁরা কেমন আছেন, নিরাপদে আছেন কি না, সে তথ্যই আমাদের জানা নেই। একই সময়ে ১৬ হাজার কর্মী কম্বোডিয়ায় গেছেন। তাঁদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অনেককে কর্মসংস্থানের ভিসা দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে পরে পর্যটক ভিসা দেওয়া হয়েছে এবং প্রতারণার চক্রে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। অথচ তাঁরা সরকারি নিয়ম মেনেই গিয়েছিলেন।
কর্মীরা কর্মস্থলে পৌঁছালেন কি না, বেতন-আবাসন ঠিক আছে কি না, তা তদারকির দায়িত্বও বিএমইটির। রাষ্ট্র চাইলে পর্যটক ভিসায় গিয়ে কতজন ফেরেননি, তা শনাক্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে। এতে মানব পাচারের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফেরা ব্যক্তিদের অপরাধী নয়, বেঁচে ফেরা মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের নিয়মিত তদারকি, পুনর্বাসন ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাঁরা আবার অপরাধী চক্রে জড়িয়ে না পড়েন।
মন্নান ছৈয়াল, কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশি
২০২২ সালে সৌদি আরবে যাই। তিন বছর সেখানে থাকার পর দেশে ফিরে আবার বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এলাকার এক আত্মীয় রেস্তোরাঁয় চাকরির কথা বলে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে আমাকে কম্বোডিয়ায় পাঠান। প্রশিক্ষণ শেষে ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সেখানে যাই। কয়েক দিন পর আমাকে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখি, হাজারো মানুষ কম্পিউটারে কাজ করছে। আমাকে ‘মারিয়া’ নামে পরিচয় দিয়ে ইনস্টাগ্রামে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আদায়ের কাজ করতে বলা হয়। আমি জানাই, এ কাজের কথা আমাকে বলা হয়নি। কিন্তু তখন আমার পাসপোর্ট তাদের কাছে ছিল। কাজ করতে না চাইলে টাকা ফেরত দিয়ে পাসপোর্ট নিতে বলা হয়, যা সম্ভব ছিল না। পরে জোর করে কাজ করানো হয়।
নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে না পারায় মারধর করা হয় এবং ছোট একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হই। পাসপোর্ট না থাকায় দেশে ফিরতে জটিলতা হয়। ব্র্যাকের সহায়তায় ট্রাভেল পাস ও টিকিটের ব্যবস্থা করে দেশে ফিরি। পরে মানব পাচারের মামলার জেরে অভিযুক্ত পক্ষ পাল্টা মামলা করে। এখন আমি নিজেই মামলার আসামি, মামলা চালানোর মতো অর্থও আমার কাছে নেই।
নাজনীন আক্তার, মালয়েশিয়া ফেরত বাংলাদেশি
অর্থসংকটে পড়ে দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। পাঁচ বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে। ঋণের চাপ থেকে মুক্তি পেতে মালয়েশিয়ায় কাজ করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এক পরিচিতের মাধ্যমে রেস্তোরাঁয় কাজের প্রস্তাব পাই। মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা বেতনের কথা বলা হলেও যেতে আড়াই লাখ টাকার বেশি দিতে হয়েছে। গয়না বিক্রি করে ও ঋণ নিয়ে সেই টাকা জোগাড় করি। ৫ হাজার টাকা বাকি রেখে বলেছিলাম, কাজে যোগ দিয়ে পরিশোধ করব। তারা তাতেই রাজি হয়েছিল।
১৫ নভেম্বর ২০২৫ আমাকে ভিজিট ভিসায় মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়। ইমিগ্রেশনে কী বলতে হবে, সেটাও আগে থেকে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর আমার পাসপোর্ট, টিকিট ও কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। বলা হয়, বাকি টাকা না দিলে কাজ দেওয়া হবে না।
পরিবারের কাছ থেকেও টাকা আদায়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়। পরে আমাকে একটি হোটেলে রেখে সেখান থেকে একটি বন্ধ ঘরে নেওয়া হয়। টানা ছয় দিন সেখানে আটকে রাখা হয়েছিল। শুধু নিজের অবস্থান জানতে চেয়েছিলাম বলেই আমাকে নির্যাতন করা হয়। শেষ পর্যন্ত আমার ভাইদের উদ্যোগে ২১ নভেম্বর আমি দেশে ফিরতে সক্ষম হই।
সুপারিশ:
১. মানব পাচারের মামলায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
২. প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ শনাক্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।
৩. বিএমইটি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কূটনৈতিক মিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
৪. আন্তদেশীয় মানব পাচার মোকাবিলায় তথ্য বিনিময় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
৫. ক্রিপ্টোকারেন্সি, হুন্ডি ও অনলাইনে অর্থ লেনদেনের ওপর কঠোর ও কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।