প্রতিটা স্কুলে বিতর্কচর্চার সুযোগ তৈরি করা হোক
· Prothom Alo

ক্লাস নাইনের একটা ছোট বোন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপু, আপনি এত সুন্দর করে কথা বলেন কীভাবে? স্টেজে ভয় লাগে না?’
অথচ ক্লাস এইটে আমি তিনজনের সামনে কথা বলতেও পারতাম না। গলা কাঁপত, হাত ঘামত। দুই লাইন বলার পর সব ভুলে যেতাম।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
আজ আমি স্টেজে দাঁড়ালে মনে হয় দর্শক শুধু আমার যুক্তির জন্যই অপেক্ষা করছে। বিতর্ক করার মাধ্যমে আমি আমার জেলায় একজন সুপরিচিত বিতার্কিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছি। সমকালের আয়োজনে বেশ কয়েকবার বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বিজয়ীও হয়েছি। আমাদের জেলার জেলা প্রশাসক স্যার নিজে আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বলেছেন, ‘তুমি খুব ভালো কথা বলো। জীবনে এগিয়ে যাও।’ সবাই আমাকে এই বিতর্কের জন্যই চেনে। এই বদলটা এনেছে বিতর্ক।
বাইরের দেশ কী করছে
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ভারতের প্রায় সব স্কুলে সপ্তাহে অন্তত একটা করে বিতর্ক ক্লাস হয়। কারণ, তারা জানে পাবলিক স্পিকিং ও সৃজনশীল চিন্তা ছাড়া লিডার হওয়া যায় না। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের রিপোর্ট বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৫০ শতাংশ চাকরিতে যোগাযোগদক্ষতা সবচেয়ে বেশি লাগবে।
তাহলে আমাদের কী করা উচিত
প্রতিটা স্কুলে সপ্তাহে এক ঘণ্টা বিতর্ক ক্লাসের সুযোগ তৈরি করা হোক। প্রতি স্কুলে একটা ডিবেট ক্লাব থাকুক। যে ছাত্র-ছাত্রী চাইবে, সে যেন শিখতে পারে। কারণ, পাবলিক স্পিকিং ও সৃজনশীল চিন্তা করার দক্ষতা না থাকলে আমরা নিজের দেশকে ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারব না। পরবর্তী প্রজন্মকে ঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারব না।
বিতর্ক হলো ভয় ভাঙার মেশিন
ডেল কার্নেগি বলেছেন, ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি স্কিল হলো মানুষের সামনে কথা বলার স্কিল।’
বিতর্কে তোমাকে এক মিনিটে মাথা ঠান্ডা রেখে কথা বলতে শেখায়। যে শিক্ষার্থী এটা পারবে, সে জীবনের সব জায়গায় এগিয়ে থাকবে।
নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই বলেছেন, ‘একটা কলম, একটা বই, একজন শিক্ষক পৃথিবী বদলাতে পারে।’ বিতর্ক হলো সেই কলম ধরার প্রশিক্ষণ। এটা আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়—‘প্রমাণ কী?’, ‘অন্য মত কী?’
শিক্ষা শুধু সার্টিফিকেট নয়, শিক্ষা হলো কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করো। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উদ্যোক্তা—সবাইকে দিন শেষে মানুষকে বোঝাতে হয়।
শেষ কথা
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান।’
সেই নতুন শিশুদের যদি আমরা যুক্তি দিয়ে কথা বলার সুযোগ না দিই, তাহলে তারা স্থান নেবে কীভাবে?
আমরা চাই না আমাদের পরের প্রজন্ম শুধু মুখস্থ করে পাস করুক। আমরা চাই তারা স্টেজে দাঁড়িয়ে বলুক, ‘আমার কথার ওপর মানুষ ভাবতে শিখছে।’
একটা দেশ তখনই এগোয় যখন সেই দেশের তরুণেরা নির্ভয়ে, যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারে। আর সেই সাহসের প্রথম পাঠশালা হোক স্কুলের বিতর্ক ক্লাব।
জামালপুর, ময়মনসিংহ