গুনজারের ‘তারিখে বুখারা’: হারিয়ে যাওয়া অমূল্য পাণ্ডুলিপি

· Prothom Alo

শহর ও নগরের ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে তারিখে বুখারা গ্রন্থটি একটি বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ কর্ম হিসেবে বিবেচিত। হাদিসবিশারদগণ রাবি বা হাদিস বর্ণনাকারীদের পরিচিতি এবং তাঁদের থেকে বর্ণিত হাদিসের সূত্রসমূহ (সনদ) যাচাই-বাছাই করার উদ্দেশ্যে যে ধারার গ্রন্থাবলি রচনা করেছেন, ‘তারিখে বুখারা’ সে ধারারই আকর গ্রন্থ।

Visit tr-sport.bond for more information.

এই মূল্যবান বইয়ের রচয়িতা হলেন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ আল-বুখারি (৩৩৭-৪১২ হি./৯৪৮-১০২৮ খ্রি.), যিনি ‘গুনজার’ নামে সমধিক পরিচিত।

গুনজারের মূল তারিখে বুখারা গ্রন্থটি আমাদের সময় পর্যন্ত পৌঁছেনি; এখন পর্যন্ত এর কোনো প্রাচীন পাণ্ডুলিপিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর প্রখ্যাত আলেম, মুহাদ্দিস এবং রিজালশাস্ত্রের (হাদিস বর্ণনাকারীদের জীবনচরিতবিষয়ক বিদ্যা) পণ্ডিতেরা বইটি থেকে ব্যাপক উদ্ধৃতি দিয়েছেন।

তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইবনে মাকুলা, আস-সামানি, আজ-জাহাবি এবং তাঁদের সমসাময়িক অন্যান্য মনীষী। তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে এই বই থেকে প্রচুর তথ্য নিয়েছেন। বিশেষ করে বোখারা শহরে বসবাসকারী মুহাদ্দিস ও ওলামা-মাশায়েখের পরিচিতি এবং প্রাচীনকালের ঐতিহ্য অনুযায়ী উচ্চতর হাদিস ও রেওয়ায়েত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যাঁরা বুখারাসহ অন্যান্য শহরে সফর করেছিলেন, তাঁদের বিবরণ সংশ্লিষ্ট উদ্ধৃতিগুলোতে সনাতন নিয়মে সন্নিবেশিত হয়েছে।

বিভিন্ন গ্রন্থে উদ্ধৃত অংশগুলো অধ্যয়নের মাধ্যমে গুনজারের বইটির গুরুত্ব ও বিশালত্ব অনুধাবন করা যায়। উদ্ধৃতিগুলো বিশ্লেষণ করে এটাও অনুমান করা যায় যে লেখক তাঁর বইটিতে নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তেমন আলোচনা করেননি।

ফলে পরবর্তী যুগের আলেমগণ তাঁর লেখার মধ্য থেকে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক উদ্‌ঘাটন করতে পারেননি।

তা যদি না হতো, তবে ইমাম আজ-জাহাবির মতো অত বড় পণ্ডিত বারবার লেখকের জীবন সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকার কথা ব্যক্ত করতেন না, যদিও তাঁর হাতের কাছেই তারিখে বুখারা গ্রন্থটি ছিল। (আজ-জাহাবি, তারিখুল ইসলাম, ২৮/৩০১; তাজকিরাতুল হুফফাজ, ৩/১৭০)

আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ আল-বুখারি ৩৩৭ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। কথাটি তিনি নিজেই তাঁর ছাত্র ইবনে মামা আল-ইস্ফাহানির কাছে ব্যক্ত করেছেন। ইবনে মামা পরবর্তীকালে তারিখে বুখারার একটি সম্পূরক অংশ বা ‘তাকমিলা’ লিখেছিলেন।

যদিও প্রাপ্ত তথ্যসূত্রগুলোতে তাঁর জন্মস্থানের কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবু প্রবল সম্ভাবনা এই যে তিনি বুখারা শহরেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সে যুগে বুখারা ছিল খোরাসানের অন্যতম প্রধান শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র। বিশেষ করে এ কারণে যে হাদিসবিশারদদের বিভিন্ন সিলসিলা ও পাঠচক্র সেখানে সক্রিয় ছিল এবং বহুসংখ্যক ফকিহ (আইনবিদ) ও আলেম সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন।

কারাবন্দী মুসলিম মনীষীদের কালজয়ী রচনা

তারিখে বুখারার রচয়িতার ব্যক্তিপরিচয়ের ক্ষেত্রে একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো তাঁর ‘গুনজার’ উপাধি। শব্দটির অর্থ লাল রং বা রুজ, যা নারীরা তাঁদের গালে মাখার জন্য ব্যবহার করতেন। অধিকাংশ আরবি ও ফারসি অভিধানে এই অর্থটির উল্লেখ রয়েছে।

আবু আবদুল্লাহ গুনজারই যে এই উপাধিতে বিখ্যাত প্রথম ব্যক্তি ছিলেন তা নয়; তাঁর আগে আবু আহমাদ ইসা ইবনে মুসা (মৃ. ১৮৬ হি.) নামে বুখারার একজন সুপরিচিত মুহাদ্দিস ছিলেন, যাঁকে গুনজার উপাধি দেওয়া হয়েছিল। কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে যে তাঁর গাল দুটি ছিল গোলাপি বা লালচে আভাযুক্ত।

এই ব্যাখ্যার সত্যতা কতটুকু, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। তবে তারিখে বুখারার লেখকের এই উপাধিতে বিখ্যাত হওয়ার কারণ ভিন্ন। তিনি তাঁর যৌবনকালে ইসা ইবনে মুসা গুনজার থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েত ও হাদিস সংগ্রহ করার কাজে এতটাই মশগুল ছিলেন যে একপর্যায়ে তিনি নিজেও এই উপাধিতে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

এই তথ্যটি ইবনে মামা আল-ইস্ফাহানি থেকে বর্ণিত হয়েছে।

আল-সামানি উল্লেখ করেছেন যে গুনজার একজন ‘ওয়াররাক’ বা অনুলিপিকার ছিলেন এবং অনুলিপির পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ তিনি বইপত্র ও লেখালেখির কাজ করতেন এবং সম্ভবত এই পেশার মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।

আবু আবদুল্লাহ গুনজার তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময় বুখারাতেই বসবাস করেছেন এবং দূরবর্তী সফর খুব একটা পছন্দ করতেন না। তিনি শুধু মার্ভ শহরে সফর করেছিলেন এবং সেখানকার শায়খদের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ করেছিলেন। অবশ্য তাঁর থেকে বর্ণিত একটি উদ্ধৃতি ইঙ্গিত করে যে তিনি বুখারার নিকটবর্তী কারমিনিয়া শহরে নাসের ইবনে মুহাম্মদ আল-আযদির কাছ থেকেও হাদিস শুনেছিলেন। (আস-সামানি, আল-আনসাব, ৪/৩১১)

গুনজারের কাছাকাছি সময়ের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ইলমুর-রিজাল বিশেষজ্ঞ—যেমন ইবনে মাকুলা ও আস-সামানি, যাঁদের কাছে তারিখে বুখারা গ্রন্থটি ছিল—গুনজারের বর্ণনা-সূত্রের ওপর ভিত্তি করে তাঁর শায়খদের নাম উল্লেখ করেছেন। এই তালিকা থেকে বোঝা যায় যে গুনজার বুখারা শহরে বসবাসকারী কিংবা সেখানে আগমনকারী পণ্ডিতদের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।

তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: আবু মনসুর মুহাম্মদ আল-তুনকাসি, আবু আহমাদ আলী আল-হাম্মাদ, আবু মুহাম্মদ আল-কাসিম আল-মারওয়াজি, খালফ ইবনে মুহাম্মদ আল-খাইয়াম, আবুল ফাদল আহমাদ আল-কাগিজি, আবু মুহাম্মদ ইয়াহমিয়া আল-বালখি, আবু আবদুল্লাহ ইবনে মান্দাহ আল-ইস্ফাহানি এবং সামানি শাসক আবুল হাসান আল-ফাইক আল-আমির।

বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিসও গুনজারের কাছ থেকে হাদিস শুনেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আবু মুহাম্মদ আবদুল আজিজ আল-বুখারি (মৃ. ৪৬১ হি.), আবু আল-ওয়ালিদ আল-হাসান আল-বালখি (মৃ. ৪৫৬ হি.), আবুল মুজাফফর হান্নাদ ইবনে ইব্রাহিম আল-নাসাফি (মৃ. ৪৬৫ হি.) এবং আবুল আব্বাস আল-মুস্তাগফিরি (মৃ. ৪৩৬ হি.)।

আবু আবদুল্লাহ গুনজার ৪১২ হিজরির ২২ শাবান, রোজ শুক্রবার ভোরে বুখারায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে বুখারার একটি অঞ্চলে সামানি সুলতানদের সমাধিস্থলের দক্ষিণ পাশে দাফন করা হয়। 

অষ্টম-নবম হিজরি শতকে আহমাদ মুল্লাজাদাহ যখন মাজারাতে বুখারা (বোখারার মাজারসমূহ) বইটি রচনা করছিলেন, সেই সময় পর্যন্ত গুনজারের কবরটি বেশ সুপরিচিত ছিল। তারিখে বুখারা ছাড়াও গুনজারের ফাজায়িলু আস-সাহাবাহ আল-আরবাআ (চার সাহাবির ফজিলত) নামে একটি বই ছিল, তবে বইটির সন্ধান মেলেনি।

তারিখে বুখারার বিন্যাস ও প্রকৃতি

গুনজারকে বিখ্যাত করে তুলেছিল বুখারার হাদিসবিশারদ ও পণ্ডিতদের স্মরণে রচিত তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ। গুনজার এই গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন হাদিসশাস্ত্রের পণ্ডিতদের প্রচলিত পদ্ধতি ও ধারা অনুসরণ করে। ইসলামি সাম্রাজ্যের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর ইতিহাস নিয়ে বিশেষায়িত গ্রন্থ রচনা ছিল সে আমলের ইতিহাস-লিখনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

এ ধরনের ঐতিহাসিক কাজগুলোকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে।

প্রথম ভাগে রয়েছে সেসব শহরের ইতিহাস যা হাদিস গবেষক ও মুহাদ্দিসগণ রচনা করেছিলেন। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে সেসব শহরের ইতিহাস, যা সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বা রাজবংশের রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে ধারণ করে; যেমন তারিখে কোম বা তারিখে তাবারিস্তান। আল-বাইহাকি রচিত তারিখে বাইহাক অবশ্য উভয় ভাগের বৈশিষ্ট্যই ধারণ করে।

হারিয়ে যাওয়া মাজহাবগুলোর কথা

মুহাদ্দিসগণ শহরের ইতিহাসবিষয়ক রচনাবলিতে যা কিছু লিখেছেন, তা ছিল নির্দিষ্ট শহরের হাদিস বর্ণনাকারী ও বাহকদের চেনার জন্য একেকটি নির্দেশিকাবই বা ‘গাইডবুক’। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকত প্রতিটি শহরের স্থায়ী বাসিন্দা ও পরিভ্রমণকারীদের নাম, তাঁদের বংশপরিচয় এবং হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁদের সূত্র বা সনদ।

এ ধরনের বই রচনার নির্দিষ্ট নিয়মকানুন ছিল এবং যাঁরা হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতেন, তাঁরা ছাড়া অন্য কেউ এ ধরনের গ্রন্থ রচনায় হাত দিতেন না। কোনো শহরের ইতিহাসগ্রন্থের ভূমিকায় সাধারণত ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক তথ্য স্থান পেত। এরপর বর্ণমালার ক্রমানুসারে কিংবা কোনো সময়ের স্তর বা প্রজন্ম অনুযায়ী মুহাদ্দিসদের নাম আসত এবং সংশ্লিষ্ট মুহাদ্দিসের হাদিস বর্ণনার সিলসিলা উল্লেখ করা হতো।

অনেক ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসের জন্মসাল ও মৃত্যুর তারিখ অন্তর্ভুক্ত থাকত, কখনো কখনো সংশ্লিষ্ট শহরের কোন মহল্লায় তিনি বসবাস করতেন, তাঁর বিশেষ কর্মতৎপরতার মতো অন্যান্য তথ্যও যুক্ত করা হতো।

শহরভিত্তিক ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে মুহাদ্দিসদের বিস্তারিত জীবনচরিত বর্ণনা করা লেখকদের উদ্দেশ্য থাকত না, বরং তাঁর সনদের ধারাবাহিকতা বর্ণনাই বিশেষ গুরুত্ব পেত।

যদিও এ ধরনের রচনাগুলোতে সংক্ষিপ্ততা বজায় রাখাই ছিল মূল ব্যাপার, তবু শহরের আকার ও গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে এই গ্রন্থগুলো কখনো কখনো একাধিক খণ্ডে রচিত হতো।

যেমন খতিব আল-বাগদাদি রচিত তারিখে বাগদাদ, ইবনে আসাকিরের তারিখে দিমাশ্ক কিংবা আল-হাকিম আল-নিশাপুরীর তারিখে নিশাপুরতারিখে বুখারা গ্রন্থটি আমাদের পর্যন্ত না পৌঁছলেও অন্যান্য গ্রন্থে এর যেসব উদ্ধৃতি রয়েছে, তা প্রমাণ করে যে এটিও বেশ কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত ছিল।

গুনজারের তারিখে বুখারা গ্রন্থটি রচনা করার পূর্বে আবু বকর মনসুর আল-বারসাখি নামে অপর এক পণ্ডিত বুখারার ইতিহাস নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন, তাতে ঐতিহাসিক দিকটিই প্রাধান্য পেয়েছিল।

এই বই বা অনুরূপ একটি বই পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে আবু বকর আন-নারশাখির দিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল, যা ফারসি ভাষায় ‘তারিখে নারশাখি’ নামে বহুবার মুদ্রিত হয়েছে। এর ফারসি অনুবাদটি ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, পাশাপাশি বইটির প্রকৃত লেখক কে, তা নিয়েও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

গুনজার কর্তৃক রচিত তারিখে বুখারা গ্রন্থটি সম্ভবত এই শহরের বিভিন্ন দিক ও গুণাবলি বর্ণনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এটাই ছিল মুহাদ্দিসদের অনুসৃত রীতি। আহমাদ মুল্লাজাদাহ তারিখে বুখারা থেকে হজরত আইয়ুব (আ.)-এর মাজারসংক্রান্ত যে বিবরণটি উদ্ধৃত করেছেন, তা থেকে এই ধারণা জোরালো হয়। এরপর নিয়ম অনুযায়ী মুহাদ্দিস ও উলামাদের নামগুলো বর্ণমালার ক্রমানুসারে ধারাবাহিকভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছিল।

তারিখে বুখারার উদ্ধৃতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রত্যেক মুহাদ্দিস ও রাবির নামাধীন তাঁর নাম ও বংশপরিচয় উল্লেখ করার ক্ষেত্রে গুনজারের অনুসৃত তথ্যকাঠামো সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করা যায়। 

বিশেষ করে যখন ইবনে মাকুলার কাছে গ্রন্থটির লেখকের স্বহস্তে লিখিত মূল পাণ্ডুলিপিটি ছিল এবং তিনি তা থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন। যে অধ্যায়ে লেখক ইমাম আল-বুখারির জীবনচরিতের বর্ণনা দিয়েছেন, তা ‘তারিখে বুখারা’র একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ; পরবর্তীকালের রিজালশাস্ত্রের গ্রন্থগুলো এই অংশ থেকে ব্যাপকভাবে তথ্য গ্রহণ করেছে। অনেক উদ্ধৃতিতেই গুনজারের সনদের ধারাবাহিকতা সংরক্ষিত রয়েছে, যা তাঁর হাদিস বর্ণনার সূত্র ও মাধ্যমগুলোকে চেনার অন্যতম উপায়।

বিভিন্ন আলামত ও প্রমাণ থেকে স্পষ্ট যে আবু আবদুল্লাহ গুনজার নাম, উপাধি ও বংশপরিচয়ের সঠিক ও নিখুঁত উচ্চারণের ব্যাপারে যত্নশীল ছিলেন, পাশাপাশি তিনি মৃত্যুর সালগুলোও উল্লেখ করতেন। এ ছাড়া তিনি জারহ ও তাদিল (হাদিস বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইকরণ শাস্ত্র)-এর নিয়মনীতি অনুযায়ী রাবি ও শায়খদের অবস্থা বা গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের প্রতিও সমানভাবে দৃষ্টি রেখেছিলেন। (ইবনে হাজার, লিসানুল মিজান, ৩/৪৩০)

তারিখে বুখারার খোরাসান ও মা-ওয়ারাউন্নাহর বিভিন্ন এলাকা, শহর এবং গ্রামগুলোর নিখুঁত বিবরণসংবলিত উদ্ধৃতিগুলো অত্যন্ত মূল্যবান ও দরকারি। তবু এটিকে একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ বলে মনে হয় এবং মনে হয় যে ঐতিহাসিক ঘটনাবলির বিস্তারিত আলোচনা লেখকের উদ্দেশ্য ছিল না। সম্ভবত তিনি তাঁর প্রত্যেক শিক্ষকের জীবনচরিত সংক্ষিপ্ত তথ্য যুক্ত করেই ক্ষান্ত হয়েছিলেন।

বইটিতে ইমাম আবু ইসা আত-তিরমিজির স্মরণে নির্দিষ্ট অংশটি তাঁর এই পদ্ধতিকে স্পষ্ট করে তোলে: ‘মুহাম্মদ ইবনে ইসা ইবনে সাওরা ইবনে মুসা ইবনে আল-দাহহাক আল-সুলামি আত-তিরমিজি আল-হাফিজ: তিনি বুখারাতে প্রবেশ করেছিলেন এবং সেখানে হাদিস বর্ণনা করেছিলেন। তিনি “আল-জামে” এবং “আত-তারিখ” গ্রন্থের রচয়িতা। তিনি ২৭৯ হিজরির ১৩ রজব, সোমবার রাতে তিরমিজ শহরে মৃত্যুবরণ করেন।’ (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়া আন-নিহায়া, ১১/৭৭)

তারিখে বুখারা থেকে উদ্ধৃত কিছু বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে আবু আবদুল্লাহ গুনজার তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্ব পর্যন্ত রেওয়ায়েত ও ওলামা-মাশায়েখের বিবরণ লিপিবদ্ধ করার কাজ অব্যাহত রেখেছিলেন। 

গুনজারের অন্যতম ছাত্র ইবনে মামা নামে পরিচিত আবু হামিদ আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ আল-ইস্ফাহানি (মৃ. ৪৩৬ হি.) গুনজারের মৃত্যুর পর গ্রন্থটির একটি ‘তাকমিলা’ বা পরিশিষ্ট রচনা করেন। আল-সামানি এই পরিশিষ্টকে ‘আল-জিয়াদাত’ (অতিরিক্ত অংশ) নামে অভিহিত করেছেন। ইবনে মামা এই ‘জিয়াদাত’-এ গুনজার সম্পর্কে একটি আলোচনা লিখেছিলেন, যা ইয়াকুত আল-হামাবি তাঁর কিতাবে উদ্ধৃত করেছেন। (আস-সামানি, আল-আনসাব, ৫/১৮১)

তারিখে বুখারা গ্রন্থটি তার বিশুদ্ধ ও যথাযথ তথ্যাবলির কারণে সে আমলের পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল এবং বড় বড় আলেম তাঁদের কিতাব রচনায় এটির ওপর নির্ভর করেছিলেন।

  • আবদু সাত্তার আইনী: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অনুবাদক

ইমাম বুখারির নিঃসঙ্গ মৃত্যু

Read full story at source