ইয়েনের দরপতন ঠেকাতে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ পদক্ষেপ, কী কারণ

· Prothom Alo

জাপানের মুদ্রা ইয়েনের টানা দরপতন ঠেকাতে গত সপ্তাহে যৌথভাবে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করেছে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র। ইয়েনের বিনিময় হার ৪০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর উভয় দেশ যৌথভাবে এ পদক্ষেপ নেয়।

Visit saltysenoritaaz.org for more information.

২০১১ সালের পর এই প্রথম টোকিও ও ওয়াশিংটন যৌথভাবে মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করল। সে সময় পূর্ব জাপানের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর ইয়েন অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। মূলত তা ঠেকাতে দুই দেশ একসঙ্গে বাজারে নেমেছিল। এবার অবশ্য লক্ষ্য ঠিক উল্টো—দুর্বল ইয়েনকে সামলে নেওয়া। খবর বিবিসির

জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও যৌথভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করা হবে।

এ পদক্ষেপ শুধু ইয়েনের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার জন্য নয়, এর পেছনে আরও বড় আর্থিক কারণ আছে। ইয়েনের মান বেশি পড়ে গিয়ে জাপানের সরকারি বন্ড বিক্রির চাপ বেড়ে গেলে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণ নেওয়ার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এ হস্তক্ষেপ।

ইয়েন দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মুখে আছে। এর প্রধান কারণ, বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর তুলনায় জাপানে সুদের হার অনেক কম। কম সুদের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ইয়েনভিত্তিক বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী নন। বরং তুলনামূলক বেশি সুদ পাওয়া যায়—এমন মুদ্রা ও সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন তাঁরা। ফলে ইয়েনের চাহিদা কমছে।

গত জুনে ব্যাংক অব জাপান নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১ শতাংশ করেছে, ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বরের পর যা সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ ফেডের তুলনায় ব্যাংক অব জাপানের সুদহার তুলনামূলকভাবে কম।

এর বাইরে জাপানের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা আছে। সে কারণে ইয়েনের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। কয়েক দশক ধরে কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমছে, উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি দুর্বল। সেই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যয় করতে হয়।

আজ সোমবার জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে শুক্রবারের যৌথ হস্তক্ষেপের ফলে সম্প্রতি ইয়েনের বাজারে যে অতিরিক্ত অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

একই কথা বলেছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, দুই দেশের সমন্বিত বৈদেশিক মুদ্রাবাজার কার্যক্রম ইয়েনের অস্বাভাবিক ওঠানামা ঠেকাতে পেরেছে।

বেসেন্ট আরও বলেন, ইয়েনের বড় ধরনের অবমূল্যায়ন সংশোধনে জাপান যে দৃঢ় মুদ্রানীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গতকাল রোববার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাপানের মুদ্রা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তারা কিছুটা সহায়তা চেয়েছিল। আমরা সব সময়ই জাপানের পাশে আছি।’

ট্রাম্পের এ মন্তব্যের পর ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর ১৫৭ দশমিক শূন্য ৭-এ নেমে আসে, অর্থাৎ আগের তুলনায় প্রায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে ইয়েন। এরপর জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি প্রকাশের পর ডলারের দর আবার বেড়ে ১৫৭ দশমিক ৭০ ইয়েনে ওঠে। গত মাসে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর ১৬৪-তে উঠেছিল, প্রায় চার দশকের মধ্যে যা সর্বনিম্ন।

ব্যাংক অব জাপানের তথ্য বলছে, বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের বাজারে এককভাবে হস্তক্ষেপ করে টোকিও। সেদিন তারা প্রায় ৫৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে ইয়েন কিনেছে, এমনটাই জানা গেছে। এর পরদিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ হস্তক্ষেপের ঘোষণা আসে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো জানায়নি তারা ঠিক কী পরিমাণ ইয়েন কিনবে। তবে শুক্রবারের মন্ত্রিসভা বৈঠকে স্কট বেসেন্টের সামনে থাকা নোটপ্যাডে লেখা ছিল, ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি ডলারের ইয়েন কেনা হতে পারে। রয়টার্সের সংবাদে বেসেন্টের নোটপ্যাডের সে ছবি ছাপা হয়েছে।

কেন জাপানের মুদ্রা গুরুত্বপূর্ণ

জাপানের ইয়েন বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম রিজার্ভ মুদ্রা। দীর্ঘদিন ধরে জাপানে সুদের হার অত্যন্ত কম। ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা স্বল্প সুদে ইয়েনে ঋণ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শেয়ার, বন্ড ও অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ করে আসছেন। বৈশ্বিক মূলধন প্রবাহের এটা বড় উৎস। খবর ওয়াশিংটন পোস্টের

এ কারণে ইয়েনের বিনিময় হারে বড় ধরনের পরিবর্তন শুধু জাপানের অর্থনীতি নয়, আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারকেও প্রভাবিত করে। ইয়েন হঠাৎ শক্তিশালী হলে বিনিয়োগকারীরা বিদেশি সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধে ইয়েন কিনতে শুরু করেন। এতে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার, বন্ডবাজার ও মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ইয়েনের মান কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণের খরচ বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ দুদিক থেকেই বিপদ।

বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে গেলে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিনিয়োগকারীরা প্রায়ই ইয়েনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাই অর্থনীতিবিদেরা ইয়েনকে শুধু মুদ্রা নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন।

Read full story at source