দিনমজুর মায়ের মেয়ের হাতে এখন দেশসেরা খেলোয়াড়ের ট্রফি
· Prothom Alo
ভোরে ঘুম থেকে উঠেই মায়ের সঙ্গে সংসারের কাজে হাত লাগায়। কখনো খালে নেমে মাছ ধরে, কখনো গৃহস্থালির ছোটখাটো কাজ সেরে নেয়। এরপর স্কুল। বিকেলে স্কুল ছুটি হলে ভাঙা সাইকেল নিয়ে ছুটে যায় আট কিলোমিটার দূরের অনুশীলন মাঠে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে পড়াশোনা শেষ করে আবার ঘুম। পরদিন আবার একই রুটিন।
এভাবেই দিন কাটে নাটোরের লালপুর উপজেলার নান্দ গ্রামের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের (ফারিহা মনি)। দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই এবার নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে মেয়েদের ফুটবলে দেশসেরা খেলোয়াড় হয়েছে সে। বাক্প্রতিবন্ধী বাবা ও দিনমজুর মায়ের সংসারে এখন সবচেয়ে বড় স্বপ্নের নাম ফারিহা।
Visit moryak.biz for more information.
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের চূড়ান্ত পর্বে রাজশাহী বিভাগ সাতটি গোল করে। এর মধ্যে পাঁচটিই আসে ফারিহা মনির পা থেকে। সেই নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে সে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পায়। অবশ্য টুর্নামেন্টের ফাইনালে ফারিহার দল রাজশাহী বিভাগ রংপুরের কাছে হেরে যায়।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মেয়েদের ফুটবলে সেরা খেলোয়াড় ফারিহা মনিপুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফারিহার হাতে ট্রফি তুলে দেন। পরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
যেভাবে ফুটবলের প্রেমে
ফারিহার ফুটবলের গল্প শুরু টেলিভিশন দেখে। ছোটবেলায় প্রতিবেশীদের বাড়ি গিয়ে ফুটবল ম্যাচ দেখত সে। কোনো খেলোয়াড় গোল করলেই আনন্দে চিৎকার করে উঠত। তখনই মনে হতো, একদিন যদি সে–ও এমন গোল করতে পারে, মানুষও তাকে নিয়ে উচ্ছ্বাস করবে। সেই ছোট্ট স্বপ্নই একসময় তাকে নিয়ে আসে ফুটবলের মাঠে।
শুরুর গল্প
তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় আন্তস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় প্রথম অংশ নেয় ফারিহা। খেলার দক্ষতায় সবার নজর কাড়লেও গ্রামের স্কুলে নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ ছিল না।
একদিন ফুটবল প্রশিক্ষক মোহাম্মদ জুয়েলের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি লালপুরের নর্থবেঙ্গল ফুটবল একাডেমিতে ভর্তির প্রস্তাব দেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবার।
ফারিহা বলছিল, মা–বাবা বলতেন, তিন বেলা খেতে পাই না, ফুটবল খেলব কীভাবে? গেঞ্জি গায়ে খেলব, কেউ বিয়ে করবে না। তাকে নিয়ে পরিবার বিপদে পড়বে।
শেষ পর্যন্ত প্রশিক্ষক জুয়েল নিজেই ফারিহার বাড়ি গিয়ে পরিবারকে বোঝান। নিজের উদ্যোগে এক জোড়া বুট, জার্সি ও প্যান্ট কিনে দেন। এমনকি অনুশীলনে যাতায়াতের জন্য ৩০ টাকা ভাড়াও দিয়ে দেন।
সেই শুরু। এরপর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে গ্রামের মাঠ থেকে উপজেলা, জেলা ও বিভাগ হয়ে জাতীয় পর্যায়ে নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছে ফারিহা।
পথটা সহজ ছিল না
ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নের প্রতিটি ধাপেই লড়াই করতে হয়েছে ফারিহাকে। সংসারের অভাব মেটাতে কখনো ধান রোপণ, কখনো পাট কাটা, কখনো খালে মাছ ধরা, আবার কখনো ছাগল পালনের কাজও করতে হয় তাকে। অনুশীলনে যেতে প্রতিদিন ভাঙা সাইকেল চালিয়ে আট কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। অনেক দিন অর্ধাহারে কিংবা অনাহারেও কাটাতে হয়েছে।
ফারিহার মা আজেলা বেগম দিনমজুরের কাজ করেন। বাক্প্রতিবন্ধী হওয়ায় বাবা মুকুল মণ্ডল নিয়মিত কাজ পান না; পেলেও অন্যদের তুলনায় কম মজুরি দেওয়া হয়। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ছেলে এখনো পড়াশোনা করছে।
ফারিহার বাড়িতে
গত শুক্রবার সকালে নাটোর শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের নান্দ গ্রামে গিয়ে দেখা হয় ফারিহা মনির সঙ্গে। কর্দমাক্ত মেঠোপথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় তাদের ভাঙাচোরা কাঁচা বাড়িতে। পাশের বাড়ি থেকে একটি প্লাস্টিকের চেয়ার এনে অতিথিকে বসতে দেন ফারিহার মা।
সাংবাদিক এসেছেন শুনে আশপাশের মানুষ জড়ো হন। সবার মুখে একটাই কথা, ফারিহার মতো মেয়ের জন্য একটি পাকা ঘর ও বাড়ি পর্যন্ত একটি পাকা রাস্তা হলে ভালো হতো।
মা আজেলা বেগম বলেন, ‘টেকার অভাবে বড় মেয়াডারে পড়াতে পারিনি। বিয়া দিয়া দিসি। ছোটটাক (ফারিহা মনি) লিয়াও একই রকম ভাবছিনু। কিন্তু মেয়াডা ফুটবল ছাড়া কিছুই বুঝে না। প্রধানমন্ত্রী ওর খেলা দেখি খুব খুশি হয়ছে। মাথায় হাত দিয়া দুয়া করছে। খেলার মন্ত্রীও নাকি ওকে ঢাকায় লিয়া যাওয়ার কথা বুলছে। তাই যেন হয়। আমি তো ওর জন্যে কিছুই করতে পারব না।’
সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলনে ফারিহা মনি। শুক্রবার লালপুর উপজেলার গোপালপুরের নর্থবেঙ্গল সুগার মিল স্কুল মাঠেখেলাধুলা করে স্কুলের জন্য সুনাম বয়ে আনায় ফারিহাকে নিয়ে গর্বিত নান্দ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, ফারিহা মনি শুধু খেলাধুলায় নয়, লেখাপড়ায়ও ভালো। ক্লাসে সেরা ১০ জনের মধ্যে আছে সে।
যা বলছেন প্রশিক্ষক
শুক্রবার বিকেলে ফারিহার সঙ্গে উপজেলার গোপালপুরের নর্থবেঙ্গল সুগার মিল স্কুল মাঠে গিয়ে দেখা হয় নর্থবেঙ্গল ফুটবল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা কোচ মোহাম্মদ জুয়েলের সঙ্গে। জুয়েলের কাছে ফুটবল খেলা নেশার মতো। তবে ইনজুরির কারণে তাঁর নিজের খেলা বেশি দূর এগোয়নি। তাই ভালো খেলোয়াড় তৈরির চেষ্টা করছেন তিনি।
মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, ২০১৭ সালে নর্থবেঙ্গল ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর তিনি এ অঞ্চলে মেয়েদের ফুটবল প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন। বর্তমানে ২৬ খেলোয়াড় থাকলেও নিয়মিত প্রশিক্ষণে আসে ১৮ জন। এখানকার মেয়েদের অনেকেই নিয়মিত আন্তক্লাব, আন্তস্কুল, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে খেলে।
‘আমি এগিয়ে যেতে চাই’
পারিবারিক জীবন অভাব–অনটনে ঘেরা হলেও ফুটবল নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখে ফারিহা মনি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনতে চায় সে।
ফারিহা মনি বলল, ‘আমি বিশ্বমানের খেলোয়াড় হতে চাই। আমার আদর্শ ঋতুপর্ণা আপু। উনি নানা প্রতিকূলতা ছাপিয়ে সাফল্য পেয়েছেন। আমিও ভালো খেলোয়াড় হতে চাই। দেশের প্রধানমন্ত্রী, ক্রীড়ামন্ত্রী যখন আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করেছেন, তখন আমার পিছিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। আমি এগিয়ে যেতে চাই।’